আপস্তম্ভ ধর্মশাস্ত্রের একটি পরিচ্ছেদে কোন্ কোন্ খাদ্যদ্রব্য ভক্ষণ করা উচিত বা অনুচিত, তার তালিকা আছে। ওই সূত্রটিতে উল্লেখ আছে এক ক্ষুরবিশিষ্ট উট, শূকর, শরভ ও গায়ল নামের এক ধরনের পশু খাওয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু তার পরের ঋষি বলেছেন গোরু ও ষাঁড়ের মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ নয়। আপস্তম্ভ ঋষি ওই অধ্যায়েই পেঁয়াজ, রসুন, মাশরুম এবং মুরগি ভক্ষণে নিষেধ করেছেন।
সংস্কৃতে একটা প্রাচীন শব্দ হল ‘গো-সঙ্খ্য’। এই শব্দটার অর্থ হল ‘গো পরীক্ষক’। কেন গোরু পরীক্ষার প্রয়োজন হত? কারণ যে গোরু বা ষাঁড় বা বলদ কর্তন করা হবে, তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা। অর্থাৎ সব গোরু চোখ বুঝে ভক্ষণ করা যেত না। নিরোগ শরীর হতে হবে। ডাঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদের প্রণীত ‘Beef in Ancient’ ও প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ‘জাতি গঠনে বাধা’ গ্রন্থে বৌদ্ধযুগের আগে হিন্দুরা যে প্রচুর গোমাংস ভক্ষণ করত, তার উল্লেখ আছে। এসব গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বৌদ্ধযুগের আগে গোহত্যা ও গোমাংস ভক্ষণ মোটেই নিষিদ্ধ ছিল না। মধু ও গোমাংস না খাওয়ালে তখনকার সময়ে অতিথি আপ্যায়নই অপূর্ণ থেকে যেত। সেই কারণেই অতিথির আর-এক নাম ‘গোঘ্ন’। রামপ্রসাদের গুরু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ তাঁর ‘বৃহৎ তন্ত্রসার’ গ্রন্থে অষ্টবিধ মহামাংসের মধ্যে গোমাংসের উল্লেখ প্রথমেই আছে।
বৈদিক যুগে বিভিন্ন যজ্ঞে দেবতাদের উদ্দেশ্যে যে পশুবলি উৎসর্গ করা হত, সেখানে অন্যান্য পশুদের সঙ্গে গোরুর কথাও উল্লেখ আছে অনেকবার। ঋগ্বেদে দশম মণ্ডলের ১৬৯ সূক্তটির দেবতাই হচ্ছেন ‘গাবঃ’। কিন্তু সেখানেও এক জায়গায় বলা হয়েছে যে, গোরুরা দেবতাদের যজ্ঞের জন্য নিজেদের শরীর সমর্পণ করে থাকে। দশম মণ্ডলেরই ৮৬ সূক্তে ইন্দ্র বড়াই করে ইন্দ্রাণীকে বলছেন–“আমি পনেরো বা বিশ বৃষের মাংস খেতে পারি।” অষ্টম মণ্ডলের ৪১ সূক্তে ঋগ্বেদের আর-এক মুখ্য দেবতা অগ্নিকে ঘিয়ের সঙ্গে যেসব মাংস আহুতি দেওয়া হত, তার মধ্যে অশ্ব, ঋষভ (বলদ), উক্ষ (ষাঁড়), মেষ এবং ভশা। এই ভশা শব্দটি যে গোরু সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ না-থাকলেও এটি কোন্ ধরনের গোরু তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। অনেক পণ্ডিতদের মতে ভশা হল বন্ধ্যা বা দুগ্ধবতী নয় এমন গোরু।
যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতাতে অশ্বমেধ যজ্ঞের শেষে যেসব প্রাণী উৎসর্গ করার কথা উল্লেখ আছে, তার মধ্যে গোরুও আছে। যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে রাজসূয় ও বাজপেয় যজ্ঞের ‘গোসভ’ নামে যে অংশটি আছে, তাতেও একই কথা লেখা। আরও অন্যান্য যজ্ঞগুলিতেও (অগ্নিষ্টোম যজ্ঞ, দর্শপূর্ণমাস যজ্ঞ, চতুর্মাস্য যজ্ঞ, সৌত্ৰামণি যজ্ঞ) ‘পশুবন্ধ’ অংশে গোরু বা বৃষ উৎসর্গের উল্লেখ পাই। কোনো সন্দেহ নেই যে, বিভিন্ন যজ্ঞে অন্য পশুর সঙ্গে সঙ্গে ঘোড়া, গোরু, বলদ এবং ষাঁড়ের বলি দেওয়া হত।
বৈদিক যুগে শুধুমাত্র যে যজ্ঞের উপলক্ষ্যে গোমাংস ও অন্যান্য পশুমাংস খাওয়া হত তা নয়। ‘গবাময়ন’ নামে একটি সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল, যে অনুষ্ঠানের শেষে বন্ধ্যা গোরু মিত্রবরুণ ও অন্যান্য দেবতাকে উৎসর্গ করা হত। সে যুগে মধুপর্কের প্রচলন ছিল। বাড়ি অতিথিরা এলে তাঁদের অর্ঘ বা মধুপর্ক খেতে দেওয়ার নিয়ম ছিল। প্রাচীনকালে মধুপর্কে দই-মধুর সঙ্গে গোমাংস দেওয়া হত। আপস্তম্ব, সাখ্যায়ণ, গোভিল, খাদির, পারস্কার, হিরণ্যকেশী প্রমুখ ঋষিদের রচনা গৃহ্যসূত্রে মধুপর্কে গোমাংসের কথা স্পষ্ট উল্লেখ আছে। শ্রাদ্ধে পিতৃপুরুষকে তৃপ্ত করতে যে গোমাংস দেওয়া হত তারও উল্লেখ আছে। এ বিষয়ে আরও জানতে ‘ভারতরত্ন’ পণ্ডিত পাণ্ডুরঙ্গ কাণের ‘History of Dharmasastra’ পড়ে দেখতে পারেন।
ঐতরেয় ব্রাহ্মণের সপ্তম অধ্যায়ে বলি দেওয়া পশুটি যজ্ঞের পুরোহিতদের মধ্যে কে, কীভাবে, কোন্ ভাগটা পাবে তারও উল্লেখ আছে। তৈত্তিরীয় সংহিতাতে বলির পশুর শরীর কেমনভাবে কাটা হবে তার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। অথর্ব বেদের গোপথ ব্রাহ্মণে ‘সমিতার’ অর্থাৎ যিনি পশু বলি দেন, তিনি কীভাবে ছত্রিশ ভাগে পশুটি কাটবেন সেই হিসাবও দেওয়া হয়েছে। যজ্ঞে যে পশু বলি বা উৎসর্গ করা হত, তা খাদ্য হিসাবেও ব্যবহার করা হত। যজ্ঞের পশু যে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা হত, সে কথা শতপথ ব্রাহ্মণের তৃতীয় ও পঞ্চম উল্লেখ আছে– “পশ্বে বৈ অনুম” এবং “অন্নম বৈ পশ্বঃ”। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণের তৃতীয় অধ্যায়ের একটি শ্লোকে স্পষ্টভাবে লেখা আছে –“অথো অন্নং বৈ গৌঃ”। অতএব গোমাংস খাদ্যই। শতপথ ব্রাহ্মণের তৃতীয় কাণ্ডে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য বলছেন যে, তিনি গোমাংস খেতে ভালোবাসেন, যদি তা অংসল (নরম) হয়। যজ্ঞের মাংস যে খাওয়া হত এবং গোমাংস খাদ্যবিশেষ ছিল এ বিষয়ে কোনো প্রশ্নচিহ্ন থাকছে না। বৃহদারণ্যক উপনিষদে উল্লেখ আছে– কেউ যদি জ্ঞানী, সর্ববেদবিদ্ ও দীর্ঘ পরমায়ুযুক্ত সন্তান চায়, তাহলে সেই দম্পতি ঘি দিয়ে বৃষমাংস বেঁধে খেতে হবে। তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে ‘পঞ্চশারদীয় সেবা’ নামে একটি ভোজন অনুষ্ঠানের কথা জানা যায়, সেই ভোজনানুষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য হল –১৭টি পাঁচ বছরের নিচে গোবৎস কেটে রান্না করে অতিথিদের পরিবেশন করা। ঋগ্বেদ সংহিতাতেও ‘বিবাহসূক্ত’-এ কন্যার বিবাহ উপলক্ষ্যে সমাগত অতিথি-অভ্যাগতদের গোমাংস পরিবেশনের জন্য একাধিক গোরু বলি দেওয়ার বিধান আছে। (১০ : ৮৫ : ১৩)
