মেহেরুন্নিসা, কবুতরের খোপের কাছে একাকী প্রসন্নচিত্তে দাঁড়িয়ে থাকে। সে ভাবতেও পারেনি বিষয়টা এত সহজে সমাধা হবে। সে জানে শাহরিয়ার জাহাঙ্গীরকে ঠিক কি বলবে। শাহজাদাকে সে এই মুহূর্তের জন্য তিল তিল করে প্রস্তুত করেছে, অকপট আর প্রভাবিত করা সম্ভব এমন এক তরুণকে তার জন্য এবং তাঁর সুদর্শন চেহারার জন্য লাডলির মুগ্ধতার ইঙ্গিত দিয়ে এবং সেই সাথে এটাও নিশ্চিত করেছে বিনিময়ে সে যেন লাডলির সন্দেহাতীত সৌন্দর্য পর্যবেক্ষণ করার যথেষ্ট সুযোগ লাভ করে। শাহরিয়ার তাকে ভালোবাসে এই বিষয়ে যুবরাজকে নিজেকে বিষয়টা বোঝাতে খুব বেশি বেগ পেতে হয় নি। আর তাঁর মেয়ে, সে তাকে আগেই ভাবতে শিখিয়েছে যুবরাজের সাথে বিয়ের চেয়ে ভালো কোনো সম্বন্ধ হতে পারে না।
এই তরুণ দম্পতি সুখী হবে–এবং সে নিজেও, বিশেষ করে যখন শাহরিয়ারকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করতে জাহাঙ্গীরকে সে রাজি করাতে পারবে এবং সেটা করতেও বেশিও দিন সময় লাগবে না। বিপর্যয় কিংবা মতানৈক্যের সাথে অপরিচিত এবং তেজোদীপ্ত, খুররম, তাঁর চরিত্রের সাথে পরিচিত থাকায় সে যেমনটা আশা করেছিল ঠিক সেভাবেই, তাকে লাল তাবু স্থাপনের অধিকার থেকে তাঁর আব্বাজান বঞ্চিত করায় ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। সে আহত আর রুষ্ট হয়ে একটা চিঠি লেখে যেখানে প্রচলিত চমৎকারিত্বপূর্ণ সৌজন্যতা অনুপস্থিত যা মোগল শিষ্টাচারের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। জাহাঙ্গীরকে বিষয়টা ভীষণ ক্রুদ্ধ করে, যে চিঠিতে সৌজন্যতাবোধের অনুপস্থিতিকে নিজের মর্যাদার প্রতি প্রকাশ্য অপমান হিসাবে বিবেচনা করে। তিনি তাঁর একদা প্রিয় পুত্রকে যে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করেছেন সেটা ক্রমেই বাড়তে শুরু করে। সে যদি তাদের ভিতরে একটা প্রকাশ্য বিভেদের জন্ম দিতে পারে তাহলে তার নিজের স্থান দুর্ভেদ্য হয়ে উঠবে। এবং জাহাঙ্গীরের স্বার্থেই সবকিছু হবে। আর সর্বোপরি, সে ছাড়া অন্তরে তাঁর স্বার্থকে আর কে এতটা গুরুত্ব দেয়।
*
জাহাঙ্গীর এক মাস পরে তাঁর ব্যক্তিগত কক্ষে, অনুষ্ঠানের জন্য আজ রঙিন লণ্ঠন চারপাশে ঝুলছে, লাডলির পেলব আঙুলে পান্নার একটা বাগদানের আংটি পরিয়ে দেয় তারপরে তাঁর হাতটা নিয়ে শাহরিয়ারের হাতে দেয়। ‘আমি আজ এই আংটি পরিয়ে তোমাদের আসন্ন মিলনকে আশীর্বাদ করছি। এই বিয়ে তোমাদের জন্য সুখ আর সমৃদ্ধি এবং অসংখ্য সন্তানের সৌভাগ্য বয়ে আনুক। জাহাঙ্গীর বাগদানের নেকাবের আড়ালে লাডলির অভিব্যক্তি দেখতে পায় না কিন্তু মেহেরুন্নিসার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সে তাকে আনন্দিত দেখে। তিনি খুব ভালো করেই জানেন যে তাকে পুত্র সন্তান উপহার দিতে না পারার বিষয়টা তাকে খুব কষ্ট দেয়–এবং বিয়ের এত বছর পরে সেটা হয়ত আর সম্ভব না–কিন্তু সে তাকে বলেছে যে তার একমাত্র সন্তানকে তার একজন পুত্রের সাথে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হতে দেখাটা তার কষ্টের উপশম হিসাবে কাজ করবে। তিনি নিজে অবশ্য বিষয়টা নিয়ে যতই চিন্তা করেন ততই তিনি এই মিলনের কারণে প্রীত বোধ করেন। শাহরিয়ারের যদিও এখনও অনেক কিছু শেখা বাকি আছে, সে সুপুত্র আর ভরসা করা যায় এমন ছেলে, পারভেজের কোনো বদভ্যাস বা খুররমের মত ক্রমশ গর্বিত বা উদ্ধত সে হবে না।
খুররমের কথা মনে পড়তে, জাহাঙ্গীরের মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়। শাহরিয়ারের বাগদানের সংবাদ সে যখন শুনতে পাবে তখন তার কি প্রতিক্রিয়া হবে? আব্বাজান তাকে বিষয়টা লিখিতভাবে জানায়নি বলে কি সে অপমানিত বোধ করবে? বেশ, তার অপমানিত বোধ করাই উচিত। সে তার নিজের শ্রদ্ধার ঘাটতির কারণে এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করতে পারে না। সে যাই হোক, তিনি এখন যে ঘোষণা করতে যাচ্ছেন সেটা অনেক বেশি শীতল আচরণ হবে। শাহরিয়ার, তোমার বাগদানের উপহার হিসাবে আমি তোমাকে বাদাখপুর-জমিদারির–জাগির তোমায় দিচ্ছি এর পূর্ববর্তী জায়গিরদার সম্প্রতি মারা যাওয়া এটা আবারও সম্রাটের কাছে অর্পিত হয়েছে।
‘আব্বাজান, আপনাকে ধন্যবাদ। শাহরিয়ার হাঁটু মুড়ে বসে এবং জাহাঙ্গীর অঙ্গুরীয় পরিহিত হাতে তার মাথা স্পর্শ করে, তার উদারতায় ছেলেকে এতটা আপুত হতে দেখে প্রীত হয়েছে। একজন সন্তানের আচরণ–শ্রদ্ধা আর বিনয়ের সাথে এমন হওয়া উচিত। দাক্ষিণাত্যের উদ্দেশ্যে খুররম যাত্রা করার কিছুদিন পূর্বে জাহাঙ্গীর তাকে বাদখপুরের সমৃদ্ধ আর উর্বর জমিদারি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। জমিদারিটা এখন তার কনিষ্ঠ সৎ-ভাইকে তিনি দিয়েছেন এই সংবাদটা, মেহেরুন্নিসা যেমন বলেছে, আরেকটা হিতকার শিক্ষা বলে প্রতিয়মান হবে এবং সম্ভবত তাকে বাধ্য করবে বশীভূত হতে।
১.১৫ গৃহ প্রত্যাবর্তন
চম্বল নদীর বালুকাময় তীরে দুটো লাল-মাথাঅলা সারস নিশ্চল দাঁড়িয়ে রয়েছে। খুররমের বাহিনী কাছাকাছি পৌঁছালে তারা আকাশে ভাসে, তাদের সরু পা ঘুড়ির লেজের মত ভাসতে থাকে। এক জোড়া চকচকে মসৃণ মাথাবিশিষ্ট লম্বা গলাওয়ালা করমোরান্ট মাছের খোঁজে পানিতে ডুব দেয় কিন্তু দৃশ্যপটের এহেন সমাহিত সৌন্দর্য খুররমকে স্পর্শ করে না। দাক্ষিণাত্য থেকে উত্তরে তার দীর্ঘ ঝটিকা সফরের সময় পুরো চম্বল এলাকা তাঁর কাছে ছিল শেষ প্রতিবন্ধকতা। প্রথম সকালের আলো থেকে চোখ আড়াল করে সে নদীর অগভীর অংশ যাকে প্রতর বলে সেদিকে তাকায় যেখানে পিঠে জ্বালানী কাঠ বোঝাই উটের সারি নিয়ে ইতিমধ্যেই তাদের চালকেরা অতিক্রম করতে আরম্ভ করেছে। বর্ষাকাল যদিও নিকটেই কিন্তু এখনও বৃষ্টি পুরো দমে শুরু না হওয়ায় নদীর পানি বেশ নিচু দেখায়। সে এবং তার লোকজনের নদী অতিক্রম করতে কোনো অসুবিধা হবার কথা না। ভাগ্য সহায় থাকলে রাত নামার আগেই তারা আগ্রা পৌঁছে যাবে।
