মালিক আম্বারের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের জন্য সে ঠিক যখন তাকে তার ভূখণ্ডের গভীরে ধাওয়া করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন মাঝ পথে সে তার অভিযান সমাপ্ত করতে চায়নি কিন্তু সে বুঝতে পেরেছে তার সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই। তাকে জানতেই হবে তাঁর আব্বাজানের মনে কি রয়েছে। সে এখন থেকে আর টকটকে লাল তাবু স্থাপনের সম্মান লাভ করবে না বার্তা প্রেরণ করে জানানই ছিল যথেষ্ট অপমানজনক, কিন্তু এই ঘটনার পরে সে যখন জানতে পারে যে জাহাঙ্গীর প্রথমে তাকে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাহরিয়ারকে সেই জমিদারি দান করেছে তার মানসিক শান্তির প্রতি এটা আরো বিব্রতকর আঘাত হানে। কিন্তু অচিরেই–সম্ভবত আর কয়েক ঘন্টার ভেতর–সে তার আব্বাজানের মুখোমুখি দাঁড়াবে এবং তার কাছে জানতে চাইবে সে কীভাবে তাকে অসন্তুষ্ট করেছে। তার আব্বাজান নিশ্চয়ই তাঁর অনুরোধের যথাযথ উত্তর দেবেন যদি সে ব্যক্তিগতভাবে সেটা তার কাছে পেশ করতে পারে।
খুররম যা আশা করেছিল বস্তুতপক্ষে যাত্রার শেষ অংশটুকু সমাপ্ত করতে তার চেয়ে একটু বেশিই সময় লাগে। চম্বল অতিক্রম করার পরেই, কালচে-বেগুনী রঙের মৌসুমী মেঘ, পশ্চিম দিক থেকে তাঁদের দিকে ধেয়ে এসে অঝোর ধারায় বর্ষণ শুরু করে, নিমেষের ভিতরে পায়ের নিচের মাটিকে পিচ্ছিল কাদায় পরিণত করায় তাদের পরিশ্রান্ত ঘোড়া আর মালবাহী প্রাণীগুলো এর উপরে পিছলে যায় এবং আছাড় খায়। কিন্তু সূর্যাস্তের ঠিক আগে আগে খুররম বৃষ্টির ভিতরে তাঁর হাভেলীর সদর দরজার দু’পাশে দপদপ করে জ্বলতে থাকা মশালের আলো দেখতে পায়, তাঁদের স্বাগত জানাতে প্রস্তুত হয়ে দরজার পাল্লা দুটো ইতিমধ্যে খুলে দেয়া হয়েছে। সে অবশ্য আগেই অনেক বিচারবিবেচনার পরে তাঁর আব্বাজানকে একটা ছোট চিঠি লিখেছে যেখানে সে তাঁর আহত অপাপবিদ্ধতার কথা বয়ান করেছে। আপনাকে ক্রুদ্ধ করার মত আমি কি করেছি সেটা না জেনে আমার পক্ষে আর দাক্ষিণাত্যে অবস্থান করা সম্ভব নয়। আমি কেবল আমার দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু আপনি আমার সাথে এমন আচরণ করছেন যেন আমি আপনার বিরোধিতা করেছি। আমি যখন আগ্রা পৌঁছাব আমি যেকোনো অভিযোগ, প্রশ্নের উত্তর দিতে প্রস্তুত থাকবো।
খুররম দুলকি চালে হাভেলীর আঙিনায় প্রবেশ করে এবং ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে মাটিতে নেমে লাগামটা তার কচির উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেয়। আরজুমান্দ আর বাচ্চারা পর্দা ঘেরা যে বিশাল গরুর গাড়িতে রয়েছে সেটা কেবলই মাত্র গড়িয়ে গড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করছে। গাড়িটা থামতে খুররম ভেজা পর্দা তুলে ভেতরে উঁকি দেয়। আরজুমান্দ যদিও কোনোমতে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে তবুও স্পষ্টই সেখানে ক্লান্তি আর কষ্টের ছাপ বোঝা যায় এবং নিজের স্ফীত উদরে সে হাত দিয়ে রেখেছে। সাম্প্রতিক এই গর্ভাবস্থা বেশ কষ্টকর বলে প্রতিয়মান হচ্ছে। চার বছরের জাহানারা এবং তার ছোট বোন রওসোন্নারা যাকে সে কোলে নিয়ে আছে, দু’জনেই তাঁদের আম্মিজানের মতই জেগে রয়েছে কিন্তু তাঁদের দুই ভাই দারা শুকোহ্ আর শাহ শুজা ঘুমিয়ে কাদা, কুকুরের বাচ্চার মত তাদের দেহগুলো পরস্পরের সাথে কুণ্ডলী করে রয়েছে। খুররম তাঁর পরিবারের কচি সদস্যদের দিকে তাকিয়ে থাকার সময় তার মাঝে ক্রোধের সঞ্চার হতে শুরু করে এই জন্য যে তাঁদেরও বাধ্য হয়ে এই ঝটিকা সফরের বিপদ আর কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। সে আগ্রায় গতবার যখন ফিরে এসেছিল সেবারের তুলনায় এবারের ফিরে আসা কত আলাদা, যখন আব্বাজান তার উপরে মোহর আর রত্ন বর্ষণ করে তাকে বরণ করেছিল এবং তাকে ‘শাহ জাহান’ নামে অভিনন্দিত করেছিল।
*
‘যুবরাজ, আপনার কাছে একজন অতিথি এসেছে।
খুররম উঠে দাঁড়ায়। সে আঙিনার মার্বেলের সূর্যঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে যে দুপুর প্রায় হয়ে এসেছে। সে গতরাতে তাঁর আব্বাজানের সাথে দেখা করার অনুরোধ জানিয়ে দূর্গে যে বার্তা প্রেরণ করেছিল সে তার উত্তরের জন্য সারা সকাল অপেক্ষা করেছিল। এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়ে রাখা আরো একটা উপেক্ষাপূর্ণ আচরণ যদিও জাহাঙ্গীরের সাথে দেখা করার জন্য তাকে আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না। কিন্তু অতিথির চেহারা দেখে খুররমের মুখ নামিয়ে নেয়। তাঁর আব্বাজানের উজির মাজিদ খান বা দরবারের অন্য কোনো উচ্চপদস্থ অমাত্যের পরিবর্তে, সে ইংরেজ রাজদূতের কৃশকায়, লম্বা অবয়ব দেখতে পায়। স্যার টমাস রো যখন সামনে এগিয়ে আসে সে তার হতাশার মাঝেও লক্ষ্য করে তাকে দেখতে কতটা আলাদা লাগছে। লোকটা আগের চেয়েও কৃশকায় হয়েছে, তার দাগ টানা ছোট পাতলুনের নিচে দিয়ে বের হয়ে থাকা উরুদ্বয় খুররমের উৰ্দ্ধবাহুর চেয়ে সামান্যই পেষল হবে, এবং তার একদা লালচে মুখাবয়ব ফ্যাকাশে দেখায়। তাঁর চোখের সাদা অংশ প্রায় হলুদ হয়ে আছে এবং খুররম লক্ষ্য করে যে তার সামান্য কাঁপতে থাকা হাতে ধরে থাকা আবলুস কাঠের লম্বা লাঠিটা, যার হাতলে জমকালো ফিতে জড়ানো রয়েছে, মর্যাদা বা আভিজাত্যের জন্য নয় বরং অবলম্বনের কাজ করছে। দূতমহাশয় লাঠিটার উপরে ভীষণভাবে ভর দিয়ে রয়েছেন।
‘যুবরাজ, আমার সাথে দেখা করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
