জাহাঙ্গীর সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে। মেহেরুন্নিসা যা বলেছে সত্যিই বলেছে। তিনি নিজে যুবক বয়সে যে বিরুদ্ধতার মোকাবেলা করেছেন খুররমকে সেসব কিছুই মোকাবেলা করতে হয়নি। খুররম যদি বিচক্ষণতার সাথে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তাহলে তাকে তার লাল তাবু অচিরেই ফিরিয়ে দেয়া হবে।
*
রঙধনুর সাত রঙে রঞ্জিত আর গলায় রত্নখচিত ক্ষুদ্রাকৃতি ফিতা বাঁধা–পায়রার দল বাতাসে ডানা ঝাপটে রাজকীয় পায়রার খোপে ফিরে আসতে শুরু করে জাহাঙ্গীর যখন মেহেরুন্নিসাকে পাশে নিয়ে তার একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষের বেলেপাথরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে। ছাগল আর উটের পালকে পানি খাওয়াতে নিচে যমুনার তীরে রাখালের দল এসেছে এবং গাধভূমিতে কালচে-ধূসর রঙের মহিষেরা উষ্ণ বাদামি পানিতে দিনের শেষবারের মত গড়াগড়ি দিয়ে নিচ্ছে।
জাহাঙ্গীর তারপরে অস্তগামী সূর্যের দিক থেকে অশ্বারোহীদের একটা ক্ষুদ্র দলকে দূর্গের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে। দলটা আরেকটু কাছে আসলে সে দলের একেবারে সম্মুখে নিজের ছোট ছেলে শাহরিয়ারকে চিনতে পারে এবং তার পেছনে কব্জিতে টোপর পড়ান বাজপাখি নিয়ে রয়েছে দু’জন শিকারী। তৃতীয় আরেক শিকারীর পর্যাণ থেকে ঝুলতে থাকা মৃত পাখির সংখ্যা দেখে বোঝা যায় তাদের পাখি শিকারের অভিযান বেশ সফল হয়েছে।
‘আপনি জানেন যে হেরেমে শাহরিয়ার একটা চিরকুট পাঠিয়ে লাডলিকে গর্ব করে বলেছে যে তাঁর বাজপাখিরা আজ কমপক্ষে এক ডজন পাখি শিকার করবে?’ মেহেরুন্নিসা জিজ্ঞেস করে। আমার মেয়ে উত্তর দিয়েছে সে যদি শিকারের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে না পারে তাহলে খামোখা যেন বড়াই না করে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সে সফল হয়েছে। সে প্রায় আপনার মতই একজন চৌকষ খেলোয়াড় হয়ে উঠছে।
‘বলার অপেক্ষা রাখে না তুমিও…’।
‘আমাকে আর তোষামদ করতে হবে না। মেহেরুন্নিসা হেসে উঠে তারপরে বলে, ‘আমি শীঘ্রই লাডলিকে গাদাবন্দুক দিয়ে গুলি করতে শিখাবো। তাঁর এখন পনের বছর বয়স–শিকারে পর্দা দেয়া হাওদায় আমার সঙ্গী হবার মত তার যথেষ্ট বয়স হয়েছে।
জাহাঙ্গীর অন্ধকার হয়ে আসা আকাশের বুকে তার অবশিষ্ট একটা কবুতরের খোঁজে তাকিয়ে থাকে। শাহরিয়ারের বাজপাখি নিশ্চয়ই তাঁর কবুতর শিকার করে নি, নাকি করেছে? শাহরিয়ারকে তিনি বারবার নিষেধ করেছেন দূর্গের কাছাকাছি কখনও বাজপাখি নিয়ে শিকার না করতে কিন্তু তিনি ঠিক নিশ্চিত নন তার ছোট ছেলে তার নির্দেশের প্রতি কতটা মনোযোগ দেয়। তাছাড়া, কবুতরগুলোও তাদের যতদূর যাওয়া উচিত প্রায়ই সেই সীমা অতিক্রম করে আরো দূরে চলে যায়। তিনি তারপরেই পাখিটা দেখতে পান, পালকগুলো রাঙিয়ে হাল্কা লাইলাক ফুলের রঙে রাঙান, তাঁর কাছেই পাথরের রেলিং এর উপরে নামার জন্য উড়ে আসছে। তিনি যখন বিলম্বে আগত পাখিটিতে আলতো করে কবুতরের খোপে তুলে রাখছেন, মেহেরুন্নিসা তাঁর কথা চালিয়ে যায়, আমি ভাবছিলাম যে আপনাকে জিজ্ঞেস করবো–লাডলি সম্বন্ধে কি শাহরিয়ার আপনার কাছে কখনও কিছু বলেছে?
জাহাঙ্গীর এক মুহূর্ত চিন্তা করেন। শাহরিয়ারের সুদর্শন মাথাটা মনে হয় অন্য কোনো কিছুর চেয়ে শিকার আর বাজপাখি উড়ানো নিয়েই বেশি মেতে থাকে। নাহ্, আমার মনে পড়ে না, কেন?
নাহ্, ব্যাপারটা হয়ত কিছুই না কিন্তু সম্প্রতি বেশ কয়েকবার সে আমার কাছে লাডলি সম্পর্কে মুগ্ধ ভঙ্গিতে কথা বলেছে–বেশ কয়েকবার সে তার সাথে দেখা করেছে এবং নওরোজের উৎসবের সময় তারা একত্রে আলাপও করেছে। সে কথা শেষ করে কাঁধ ঝাঁকায়। সে তাঁর সম্পর্কে এমন কিছু বলেনি কিন্তু ব্যাপারটা হল যেভাবে সে কথাগুলো বলেছে।’
‘তোমার ধারণা লাডলির জন্য তার ভেতরে কোনো অনুভূতি কাজ করছে? ‘আমি জানি না। হয়ত…’
‘আমি তার সাথে কথা বলে দেখতে পারি।’
হা। আপনি আর শাহরিয়ার আজকাল বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। আমি নিশ্চিত, আপনার কাছে সে তাঁর মনে কথা খুলে বলবে… এবং লাডলির জন্য যদি তাঁর মনে কোনো ভালোবাসা কাজ করে থাকে তাহলে তাকে বলবেন এসব ভাবনা যেন সে এখানেই শেষ করে।
জাহাঙ্গীর বিস্ময়ে চোখ পিট পিট করে। শাহরিয়ার তার দিকে কেন মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকাতে পারবে না… এবং তাকে বিয়ে করলেই কি সমস্যা?
কিন্তু আমি মনে করেছিলাম আপনার ইচ্ছা সিন্ধের কোনো রাজপরিবার থেকে আপনি তার জন্য বধূ নির্বাচিত করবেন?
‘আমি তাই চাই। আমি ইতিমধ্যে বিষয়টা নিয়ে আমার পরামর্শদাতাদের সাথে আলোচনাও করেছি, কিন্তু সেটা ভবিষ্যতের বিষয়। শাহরিয়ার সিন্ধ থেকে যেকোনো সময় একজন স্ত্রী গ্রহণ করতে পারে কিন্তু এসব কিছুই তোমার মেয়েকে প্রথমে বিয়ে করা থেকে তাকে বিরত রাখতে পারে না। আর তাছাড়া, আমি তোমার ভাইঝির সাথে খুররমের বিয়ের অনুমতি দিয়েছিলাম পার্সী রাজকন্যাকে বধূ হিসাবে বরণ করার পূর্বে…’
মেহেরুন্নিসার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। শাহরিয়ার যদি সত্যিই লাডলিকে বিয়ে করতে আগ্রহী হয়, আমার কাছে এর চেয়ে আনন্দের আর কিছুই হতে পারে না–আপনি জানেন আমি তাকে কতটা পছন্দ করি।’
‘আমার মনে হয়, সে সবসময়ে তাঁর দাবিদার … গত সপ্তাহেই তাকে আমি তিরষ্কার করেছি আমাদের অশ্বারোহী বাহিনীর জন্য নতুন কতগুলো ঘোড়া কিনতে হবে সে বিষয়ে আমার অশ্বশালার প্রধানের সাথে সে আলোচনা করতে ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু তার বয়স এখন অল্প এবং সময় হলে শিখে নেবে। কে জানে, হয়ত বিয়ে করলে তার ভিতরে দায়িত্ববোধ জন্ম নেবে। আমি এখনই গিয়ে তাকে খুঁজে বের করছি।’
