জাহাঙ্গীরের মুখমণ্ডল এখন তাঁর মতই গম্ভীর দেখায়। বলো।
‘আপনি জানেন আমি খুররমের সেনাছাউনিতে অবস্থানরত আপনার আধিকারিকদের কাছ থেকে প্রেরিত নিয়মিত প্রতিবেদন দেখি। প্রতিবেদনগুলো বেশিরভাগই নতুন তাবু বা মালবাহী শকট কিংবা আরও অধিক খাদ্যের চাহিদা সম্পর্কিত–দৈনন্দিন বিষয়সমূহ যা নিয়ে আপনার চিন্তা না করলেও চলবে। কিন্তু সম্প্রতি আমি অন্যসব বিবরণের মাঝে অন্য কিছু একটা বিষয় আঁচ করতে পারি–কিছু ইঙ্গিত যে খুররম ক্রমশ উদ্ধত হয়ে উঠছে… যে সে তার সামরিক পরামর্শ সভায় অন্যদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ক্রমশ অধৈর্য হয়ে উঠছে, যার ভিতরে তার চেয়ে অনেক অভিজ্ঞ আর বয়োজ্যেষ্ঠ সেনাপতিরাও রয়েছেন, যেমন ওয়ালিদ বেগ, তাঁর গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান। এসব বিষয় হয়ত ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়–এখন পর্যন্ত খুররমের সামরিক অভিযান সফলই বলতে হবে। কিন্তু একেবারে সাম্প্রতিক কয়েকটা প্রতিবেদন থেকে এটাও প্রতিয়মান হয় যে খুররম আপনার সম্বন্ধে তাচ্ছিল্যপূর্ণ মন্তব্য করেছে, উদ্ধত ভঙ্গিতে বলেছে যে আপনার চেয়ে অনেক অল্প বয়সে সে সামরিক সাফল্য অর্জন করেছে…’।
জাহাঙ্গীর তার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে এবং সে খেয়াল করে তার শ্বাসপ্রশ্বাসের বেগ দ্রুততর হয়ে উঠেছে। তুমি নিশ্চিত? তার এমন প্রভৃষ্ট আচরণ করার কথা না…’।
‘এ বিষয়ে সন্দেহের সামান্যই অবকাশ রয়েছে। সে একজন দক্ষ সেনাপতি কিন্তু মুশকিল হল সেটা সে জানে এবং ক্রমশ আত্মগর্বী হয়ে উঠছে। আপনি অবশ্য চাইলে এত বিশাল সাফল্যের অধিকারী এমন একজন তরুণকে ক্ষমা করতেও পারেন। সাফল্যে তার মাথা খানিকটা ঘুরে যেতেই পারে, এটা খুবই স্বাভাবিক। তাঁর শেষ বার্তাটার বাচনভঙ্গিতে পরিষ্কার বোঝা যায় সে নিজের প্রতি কতটা মুগ্ধ। আমি একটা বিষয়ে নিশ্চিত সে খসরুর মত কোনো বোকামি সে করতে যাবে না কিন্তু তারপরেও এমন আচরণ যদি নিয়ন্ত্রণ করা না হয় তাহলে ভবিষ্যতে হয়তো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে…’
‘এসব অভিযোগ কে করেছে? ব্যর্থতার জন্য খুররমের কাছে তিরস্কৃত হওয়া কিংবা যুক্তিসঙ্গত পদোন্নতি উপেক্ষিত হওয়ায় ক্ষুব্ধ লোকজন এসব অভিযোগ করতেই পারে?
‘আমার মনে হয় না। আমি নিজে যাচাই করে দেখেছি। সবাই অনেক নিচু পদস্থ কর্মকর্তা-খুররমের সরাসরি নজরে পড়া কিংবা তাঁদের নাম জানা আপনার জন্য একেবারেই গুরুত্বহীন। তারা যদিও তাদের দায়িত্ব পালন করছে বলেই সম্ভবত ভেবেছে, এসব কথা কাগজে লিখে তারা অবশ্য ভুল করেছে। এসব লেখা যদি ভুল লোকের চোখে পড়ে তাহলে সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে ভেবে… আপনার খাতিরে এবং অবিবেচক সেইসব কর্মকর্তাদের কথা ভেবে, আমি বার্তাগুলো পুড়িয়ে ফেলেছি। মেহেরুন্নিসা একটা ধূপদানির দিকে ইঙ্গিত করে যেখানে কিছু পোড়া কাগজের টুকরো পড়ে রয়েছে।
জাহাঙ্গীরের কানে সহসা মেহেরুন্নিসার পরিবর্তে বহু বছর পূর্বে বৃদ্ধ সেলিম চিশতির উচ্চারিত সতর্কবাণী ভাসতে থাকে: বিশ্বাসের উপর কোনো কিছু ছেড়ে দিবে না, এমনকি যাদের সাথে তোমার রক্তের বন্ধন রয়েছে এমনকি তোমার অনাগত সন্তানেরা…’ খসরুকে অন্ধ করে দেয়ার পরে, সে ভেবেছিল সন্তানদের কাছ থেকে তাঁর আর ভয়ের কোনো কারণ নেই–পারভেজের কাছ থেকে নয় বেশিরভাগ সকালে যার বিছানা ত্যাগ করার কোনো ইচ্ছাই থাকে না বা খুররমের কাছ থেকে, আপাতদৃষ্টিতে এমন দায়িত্বশীল এবং সে যা কিছু চেয়েছে সে পিতা হিসাবে তাই তাকে দিয়েছে–এমনকি আরজুমান্দের সাথে বিয়ে পর্যন্ত–এবং নিশ্চিতভাবেই শাহরিয়ারের কাছ থেকে তো নয়ই। কিন্তু সে সম্ভবত কোথাও ভুল করেছিল। তাঁর পুত্রদের ভিতরে খুররম অনায়াসে সবচেয়ে প্রতিভাবান সারা পৃথিবী সেটা দেখতে পাবে–এবং খুররমও সেটা টের পেয়েছে। মেহেরুন্নিসা তাকে পুনরায় আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করে–সে চায় না জাহাঙ্গীর উদ্বিগ্ন হয়ে উঠুক–কিন্তু সে কীভাবে নিশ্চিত হবে যে খসরুর মত খুররম ইতিমধ্যে বিদ্রোহের বিষয়ে পরিকল্পনা করতে শুরু করে নি?
‘আপনাকে এতটা উদ্বিগ্ন কেন দেখাচ্ছে? আমি আপনাকে সতর্ক করেছি যাতে আপনি সহজেই বিষয়টার পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারেন।’
‘যদি তোমার কথা ঠিক হয়, তাহলে আমার কি করা উচিত?
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।’ মেহেরুন্নিসা যেন এক মুহূর্তের জন্য ইতস্তত বোধ করে। খুররমকে আপনার অবশ্যই বিরত করতে হবে…’
‘আমার সেটাই করা উচিত, কিন্তু কীভাবে?
‘বেশ… আপনি সম্ভবত এখন পেছনের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বুঝতে পারবেন তাকে লাল তাবু স্থাপনের অধিকার দান করে বেশি মাত্রায় উদারতা প্রদর্শন করেছেন। আমি জানি, আপনি এটা করেছিলেন, কারণ আপনি তাকে পুরস্কৃত করতে চেয়েছিলেন কিন্তু এরফলে সম্ভবত তাঁর প্রত্যাশা আর গর্ব মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল… আপনি তাকে এখন কেন অবহিত করেন না যে আগামী কিছু দিনের জন্য আপনি তার এই পদমর্যাদা রদ করছেন। আপনি তাকে জানাতে পারেন যে যদিও আপনি তার বিজয়ে আনন্দিত হয়েছেন কিন্তু আপনি হয়তো একটু বেশিই তাড়াহুড়ো করেছিলেন…’
‘আমি নিশ্চিত–সে এটাকে নিশ্চিতভাবেই অপমান হিসাবে বিবেচনা করবে।
‘হা, কিন্তু একই সাথে তাকে পরীক্ষাও করবে। সে তার দাদাজানের কাছে তার অন্যসব নাতিদের চেয়ে বেশি প্রশ্রয় লাভ করেছিল এবং আপনি তাঁর সমস্ত ইচ্ছাপূরণ করায়, সে ভাবতে শুরু করেছে নিরূপদ্রব অগ্রযাত্রা তাঁর অধিকার এবং সেটা কোনো সম্মান বা উপহার নয় যা আপনিই কেবল তাকে দান করতে পারেন। তাঁর প্রতিক্রিয়া দেখে আপনি বুঝতে পারবেন যে সে এখনও আপনার অনুগত আর বিশ্বস্ত ছেলেই রয়েছে নাকি তার উচ্চাশা এখন তাঁর দায়িত্ববোধকে অতিক্রম করেছে। মনে রাখবেন আপনি একই সাথে তার সম্রাট এবং পিতা। আর খুররমের নিজের মঙ্গলের জন্য আপনি এসব কিছু করছেন। আপনি এখনই একজন আদর্শ পিতার মত উপযুক্ত পদক্ষেপ নিয়ে তাকে আরও বিপথগামী করার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেন।’
