তূর্যবাদকেরা তাঁদের বাজনা নিজেদের ঠোঁটে ঠেকিয়ে প্রথম দৌড় শুরুর সংকেত ঘোষণা করা মাত্র সে নদীর তীর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয় এবং ভিতরে চলে আসে। ‘সাল্লা,’ সে ডাকে, আমার চোখের পিছনে কেমন একটা ব্যাথা করছে। অনুগ্রহ করে আমায় একটু মালিশ করে দাও–যা আমাকে সবসময়ে আরাম দেয়।
মেহেরুন্নিসা একটা লাল স্যাটিনের গড়িতে হেলান দিয়ে আরাম করে বসলে, আর্মেনিয়ান বাদী আলতো ভঙ্গিতে কাজ শুরু করে, তার গলার মাংসপেশী দক্ষতার সাথে মালিশ করতে থাকে। দবদব করতে থাকা ব্যাথাটা ধীরে ধীরে কমে আসে এবং মেহেরুন্নিসার মন আবার খুররমের বার্তা নিয়ে ভাবতে শুরু করে। খুররমকে পুনরায় দক্ষিণে পাঠাতে জাহাঙ্গীরকে প্ররোচিত করে সে সম্ভবত ভুলই করেছে… জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে তাকে দূরে সরাতে চেয়ে সে খুররমকে আরো বিপুল গৌরব অর্জনের সুযোগ করে দিয়েছে। মালিক আম্বারকে বন্দি কিংবা হত্যা করতে যদি খুররম সমর্থ হয়–যা সে করতে পারবে বলে তাকে নিশ্চিত মনে হচ্ছে–সে কয়েক মাসের ভিতরে পুনরায় দরবারে ফিরে আসবে এবং অবশ্যম্ভাবীভাবেই নতুন খেতাব, নতুন দায়িত্বের জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকবে। তার অবশ্যই কিছু প্রত্যাশা রয়েছে…।
তার স্বামীর বয়স যদিও এখনও পঞ্চাশ পূর্ণ হয়নি, ক্রমবর্ধমান আসক্তি ফলে যা তাঁর তৈরি আফিম ও সুরার মিশ্রণে বুঁদ হয়ে থাকতে তাকে আরও আগ্রহী করে তুলছে এবং সম্রাটকে তাঁর দায়িত্ব পালনে তাকে সুযোগ করে দিচ্ছে সেটাই হয়তো তাকে উৎসাহিত করবে সাম্রাজ্য পরিচালনার অধিকাংশ দায়িত্ব যোগ্য পুত্রের হাতে যাকে নিয়ে সে ভীষণ গর্বিত সমর্পিত করতে যাতে করে সে তার অবশিষ্ট দিনগুলোতে আগ্রহের সাথে প্রকৃতির অসামঞ্জস্য অধ্যয়নে মনোনিবেশ করতে পারেন। সম্রাটের ক্ষমতা আর উদ্দীপনা যা তাকে এত আকর্ষিত আর উত্তেজিত করে হ্রাস পাবে। সে নিজেকে বলে, জাহাঙ্গীরের জন্য এটা মোটেই শুভ হবে না। তিনি এর ফলে দ্রুত বার্ধক্যে উপনীত হবেন। আর তারই বা কি হবে? হেরেমের বৃদ্ধ আর বিরক্ত শাসক। তাঁর মানসপটে মুহূর্তের জন্য ফাতিমা বেগমের বিরক্ত, কুঞ্চিত মুখাবয়ব আর পৃথুল অলস দেহ ভেসে উঠে। তাঁর জন্য হেরেম খুব ছোট একটা রাজত্ব। জাহাঙ্গীরের উপরে কেবল তাঁরই অধিকার এবং আর কারো নয়–ঠিক যেমনটা তিনি তাকে প্রায়শই বলে থাকেন। খুররমের উত্থানকে অবশ্যই মন্থর না, বিঘ্নিত করতে হবে, এবং হয়তো এমনকি বাতিল করতে হবে…
‘মালকিন, আমি দুঃখিত, আমি কি আপনাকে ব্যাথা দিয়েছি? আমি আয়নায় দেখলাম সহসা আপনি ভ্রুকুটি করলেন।
‘না, সাল্লা, আমি আসলে চিন্তা করছিলাম।’
মেহেরুন্নিসা যতই বিষয়টা বিবেচনা করতে থাকে, আতঙ্কের মত একটা অনুভূতি সে অনুভব করে। সে কি করবে? সে তাঁর জীবনের সবচেয়ে হতাশাব্যঞ্জক পরিস্তিতিতেও সবসময়ে কোনো না কোনো পথ খুঁজে পেয়েছে। তার আব্বাজান তাকে যখন বায়ু আর নেকড়ের মুখে পরিত্যাগ করেছিলেন তখনও কি সে টিকে থাকেনি? তাঁর ভাইয়ের ষড়যন্ত্রের কারণে তাঁদের পরিবারের সবাই যখন অভিযুক্ত হবার মুখে পড়েছিল তখন কি সে নিজেকে আর তার পরিবারকে রক্ষা করে নি? এটা দ্বিধাগ্রস্থ হবার সময় না…
সে বিছানায় উঠে বসে। সাল্লা, তোমায় ধন্যবাদ, আমার মাথা ব্যাথা অনেকটা কমেছে। তুমি এখন যেতে পারো। আর খেয়াল রেখো আমাকে যেন কেউ বিরক্ত না করে।’ উন্মুক্ত গবাক্ষ দিয়ে ভেসে আসা জনতার উফুল্ল চিৎকার আর তূর্যবাদনের শব্দ তাকে বলে যে উটের দৌড় এখনও শেষ হয়নি, মেহেরুন্নিসা পায়চারি আরম্ভ করে যা সে সবসময়েই করে থাকে যখন সে কিছু চিন্তা করতে চায়। তাঁর দৃষ্টি একটা নিচু মার্বেলের টেবিলের উপরে নিবদ্ধ হয় যেখানে সম্প্রতি জাহাঙ্গীর তাকে যে খেতাব দান করেছে তার প্রতীক উত্তীর্ণ করা হাতির দাঁতের তৈরি সীলমোহরটা রাখা আছে। সে এখন আর নূর মহল নয়, সে এখন নূর জাহান, জগতের আলো। সে কেবল জাহাঙ্গীরের প্রিয় সম্রাজ্ঞীই নয় বরং তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত পরামর্শদাতা… যা তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। তার মস্তিষ্কে অচিরেই একটা পরিকল্পনা দানা বাঁধতে আরম্ভ করে। ভীষণ সাহসী একটা পরিকল্পনা এবং এতে ঝুঁকিও রয়েছে, কিন্তু এটা যদি সফল হয় সে–তাঁর ভাস্তি আরজুমান্দ না–তাহলে হবে সম্রাটের পিতামহী এবং প্রপিতামহী। মেহেরুন্নিসার কক্ষে জাহাঙ্গীর যখন আবার আসে ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে। তাকে উৎফুল্ল এবং শমিত দেখায়। আমিই ঠিক বলেছিলাম- রাজস্থানের এই উটগুলো দেখে যতটা মনে হয় তারা ততটা দ্রুতগামী নয়, এবং জন্তুগুলোকে পোষ মানান কঠিন। তুমি কি দেখেছিলে যে একটা তার আরোহীকে পিঠ থেকে মাটিতে ফেলে দিয়ে তারপরে তাকে লাথি মারতে চেষ্টা করেছিল?
‘আপনাকে সত্যি কথাই বলি আমি আসলে দৌড়টা দেখিনি। খুররমের বার্তাটা আমি দেখার পর থেকেই–সারাটা দুপুর আমার মন অন্য একটা বিষয়ে ব্যস্ত ছিল।
‘সেটা কি?
তার হৃৎপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হয় কিন্তু সে উত্তর দেয়ার সময় নিজের মুখাবয়ব সংযত রাখে, এমনকি সামান্য বিষণ্ণতাও ফুটিয়ে তোলে। আমি বুঝতে পারছি না যে আপনাকে কথাটা আমার বলা উচিত কিনা কিন্তু আমি আপনার কাছ থেকে কিছু লুকিয়েও রাখতে পারি না।’
