‘আপনি আজ খুররমের কাছ থেকে একটা বার্তা পেয়েছেন, তাই নয় কি? তাকে তার স্বপ্ন-কল্পনার রেশ থেকে মুক্ত করে, সে জানতে চায়।
‘হা। মালিক আম্বারের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান ভালোই অগ্রসর হচ্ছে। সে একজন দক্ষ সেনাপতি। আমি কৃতজ্ঞ যে যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ আমি তাকে দিয়েছি যা আমার আব্বাজান আমাকে কখনও দিতো না। তাঁর জন্মগ্রহণের সময় জ্যোতিষী যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, সৌভাগ্য মনে হয় তার পক্ষেই আছে। তার পরিবারও বড় হচ্ছে। সে চিঠিতে জানিয়েছে তাঁর সদ্যোজাত কন্যাসন্তান জ্বর থেকে সেরে উঠেছে এবং সুস্থ আছে। তাঁরা তাঁর নাম রেখেছে রওসোন্নারা।
মেহেরুন্নিসা চুপ করে থাকে। দাক্ষিণাত্যের উদ্দেশ্যে খুররমের যাত্রা করার পরে প্রায় নয়মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। জাহাঙ্গীর প্রথম দিকে তাঁর অভাব দারুণ অনুভব করতো এবং তার অনুপস্থিতির জন্য ক্ষোভ প্রকাশ করতো কিন্তু ধীরে ধীরে তার প্ররোচনায় জাহাঙ্গীর ক্রমশ তাঁর কনিষ্ঠ পুত্রের প্রতি অধিকতর আগ্রহী হয়ে উঠছে। সে অনুধাবন করতে পেরেছে যে নিজের বড় দুই ছেলের একজন বিশ্বাসঘাতক আর অন্যজন মাতাল এই বিষয়টা জাহাঙ্গীরকে কষ্ট দেয়… পিতা হিসাবে বিষয়টাকে সে নিজেরই ব্যর্থতা হিসাবে দেখে ঠিক যেমন সে মনে করে যে তার আব্বাজান আকবর তাকে বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল। ঠিক এই কারণেই সে যেমন যোগ্য আর শক্তিমান খুররমের কারণে গর্বিত বোধ করতে আগ্রহী, ঠিক একইভাবে সে সুদর্শন শাহরিয়ারের মাঝে ভালো গুণাবলী দেখে প্রসন্ন। জাহাঙ্গীরের সন্তানদের মাঝে তার অনুগ্রহ লাভের জন্য প্রতিযোগিতার আবহ বিরাজ করাটা একটা ভালো লক্ষণ, মেহেরুন্নিসা ভাবে। তাদের ঈর্ষা আর প্রতিদ্বন্দ্বীতা তাকে তার প্রভাব বিস্তারের আরেকটু সুযোগ করে দেবে যদি না কেবল খুররম তার একমাত্র প্রিয় পুত্র হতো।
১.১৪ ঘরের শত্রু বিভীষণ
‘জাঁহাপনা, আপনাকে বিরক্ত করার জন্য আমায় মার্জনা করবেন। জাহাঙ্গীরের কক্ষে প্রবেশ করার সময় মজিদ খান মুষ্ঠিবদ্ধ হাত দিয়ে বুক স্পর্শ করে। দাক্ষিণাত্য থেকে আরেকটা বার্তা নিয়ে রাজকীয় এক বার্তাবাহক এসেছে। আমি সেটা নিয়ে এসেছি।’
রওসোন্নারার আরোগ্য লাভের খবর নিয়ে আগত বার্তার পরে গত কয়েক সপ্তাহ জাহাঙ্গীর খুররমের কাছ থেকে কোনো সংবাদ পায় নি এবং তিনি জানতে উদগ্রীব হয়ে আছেন যে খুররম যেমনটা ধারণা করেছিল তার অভিযান কি আসলেই ততটা সাফল্যের সাথে অগ্রসর হচ্ছে। সে হাত বাড়িয়ে চিঠিটা নেয় এবং সীলমোহর ভাঙে। আমি এখনও যদিও মালিক আম্বারকে বন্দি করতে সমর্থ হই নি আমি তাঁর সেনাবাহিনীকে পরাস্ত করেছি এবং তাঁর সম্পদ কুক্ষিগত করেছি, খুররম তাঁর বলিষ্ঠ হাতে চিঠিতে লিখেছে। নদীর বাঁকে আবিসিনীয় সেনাপতির সৈন্যদের সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করার পরে তার শেষ সর্বশেষ প্রফুল্ল শব্দচয়ন হল, আমাদের শত্রু লাথি খাওয়া কুকুরের মত নিজের এলাকায় পালিয়ে গিয়েছে। আমার বাহিনীকে একত্রিত আর পুনরায় রসদ মজুদ করেই আমি আবার তাকে ধাওয়া করবো। আমার বিজয় নিয়ে আমার ভিতরে কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ নেই।
জাহাঙ্গীর আনন্দিত হয়ে মুচকি হাসে। মাজিদ খান, সুখবর। যুদ্ধক্ষেত্রে আমার পুত্র মালিক আম্বারকে পরাস্ত করেছে এবং পরাস্ত হয়ে মালিক আম্বার পালিয়েছে। সম্রাজ্ঞীকে খবরটা আমার জানাতেই হবে।
তাকে কয়েক মিনিট পরে মেহেরুন্নিসার আবাসন কক্ষে প্রবেশ করতে দেখা যায়। খুররমের কাছ থেকে আমি অবশেষে একটা বার্তা পেয়েছি। এই যে, এখানে…’
মেহেরুন্নিসা সতর্ক ভঙ্গিতে চিঠিটা পড়তে আরম্ভ করে, কিন্তু সে চিঠিটা পুরো পড়া শেষ করার আগেই জাহাঙ্গীর নিজের পুত্রের গুণকীর্তন করা আরম্ভ করে। সে দারুণ বিচক্ষণতা, ভীষণ বিবেচনাবোধের পরিচয় দিয়েছে… সে এবার যখন আগ্রা ফিরে আসবে আমি তাকে আমার সামরিক পরিষদের পূর্ণ সদস্য হিসাবে নিয়োগ দেবে। সে সেখানে নিজের স্থান অর্জন করেছে। জাহাঙ্গীর যখন নিজের উল্লাস প্রকাশ করতে থাকে, মেহেরুন্নিসার ঠোঁটের কোণে ফুটে থাকা হাসির ঝিলিকের চেয়ে তার মনের ভিতরে বইতে থাকা চিন্তাধারা অনেকবেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন। সে ধারণা করতে পারেনি যে খুররম এতটাই সফল হবে এবং অবশ্যই এত দ্রুত। নিজের বিজয়ী বাহিনী নিয়ে সে যখন বিজয়ীর বেশে ফিরে আসবে তখন জাহাঙ্গীর তাঁর উত্তরাধিকারী ঘোষণা করতে বিলম্ব করবে? তার জন্য সেটা করাই একমাত্র যুক্তিসঙ্গত কাজ হবে….
‘আমাদের খবরটা উদ্যাপন করা উচিত। আজ বিকেলের দিকে, আবহাওয়া একটু শীতল হলে, আমি যমুনার তীরে উটের দৌড়ের আয়োজন করার আদেশ দিব। আম্বারের রাজা আমায় যে উটগুলো পাঠিয়েছে আমি তাঁদের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখতে আগ্রহী। তিনি দিব্যি দিয়ে বলেছেন যে দ্রুতগামী রাজপুত উটের কোনো তুলনা হয় না কিন্তু আমি ঠিক ভরসা করতে পারছি না…’
‘এটা দারুণ হবে। আমি আমার বারান্দা থেকে দেখবো।
সে পরবর্তীতে যখন জাহাঙ্গীর আর তাঁর দেহরক্ষীদের দুলকিচালে নদীর তীরের রৌদ্রদগ্ধ কাদার উপর দিয়ে সৈন্যরা দৌড় প্রতিযোগিতার জন্য আধ মাইল লম্বা একটা এলাকা প্রস্তুত করেছে সেদিকে এগিয়ে যেতে দেখে, তার মাথা ব্যাথা শুরু হয় এবং প্রদর্শনীটা তাকে বিন্দুমাত্র আকর্ষণ করে না। সে সচরাচর উটের দৌড় উপভোগই করে–জম্ভগুলোর নাক ডাকতে থাকার দৃশ্য, তাদের সামনের দিকে বাড়িয়ে রাখা গলা, তাদের আরোহীদের দ্বারা তাড়িত হওয়া, দর্শকদের উল্লসিত চিৎকার…তাঁর বিয়ের পরপরই জাহাঙ্গীর নিজে দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিত এবং বিজয়ী হতো। তাঁর মনে আছে সে প্রতিযোগিতা শেষে তাঁর কাছে আসতো, তাঁর দেহ তখনও বিজয়ের ঘামে সিক্ত…
