‘আমি ভেবেছিলাম তারা আপনাকে আনন্দ দেবে, কসরতবাজেরা চপল পায়ে দৌড়ে বারান্দা থেকে বিদায় নিতে মেহেরুন্নিসা বলে। সুদূর উত্তরপূর্বের পাহাড়ী এলাকা থেকে লোকগুলো এসেছে সেখানে উপজাতীয় লোকেরা এসব করতে পারদর্শী।
‘তাঁরা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সকালে আমি লোকগুলোকে আবার ডেকে পাঠাব এবং তাদের এই কসরতের রহস্য আমি তাদের তাদের ব্যাখ্যা করতে বলবো।
মেহেরুন্নিসা মুচকি হাসে। জাহাঙ্গীরকে ভুলিয়ে রাখতে সে সবসময়ে– কৌতূহল উদ্রেককারী কিছু খুঁজে বের করতে চেষ্টা করে। তাঁর সাথে সে যখন নিজের প্রশান্তি খুঁজতে চেষ্টা করে সে তখন সেটা বেশ পছন্দই করে এবং সন্ধ্যার নির্জনতা কথা বলার জন্য আদর্শ সময়।
সে জাহাঙ্গীরের জন্য গোলাপের সুগন্ধিযুক্ত যে সুরা প্রস্তুত করেছে সে তাতে চুমুক দেয়। শাহরিয়ারের কাছ থেকে আমি একটা চিঠি পেয়েছি। সে এখনও ভাদোরে অবস্থান করছে কিন্তু লিখেছে যে নতুন দূর্গ স্থাপনের জন্য সে একটা ভালো স্থান খুঁজে পেয়েছে। সে যা লিখেছে তাতে মনে হচ্ছে যে পুরো এলাকাটা সে বেশ ভালো করেই পর্যবেক্ষণ করেছে এবং দূর্গটার নির্মাণশৈলী কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শও দিয়েছে।’
‘বেশ।’ মেহেরুন্নিসা মাথা নাড়ে। নিজের ভাইয়ের সাথে আগ্রা অভিমুখি দক্ষিণের প্রবেশপথ সুরক্ষিত করতে নতুন একটা দূর্গ নির্মাণে জাহাঙ্গীরের অভিপ্রায়ের বিষয়ে আলোচনার পরে শাহরিয়ারকে সে নিজে কিছু পরামর্শ দিয়েছিল। সে বুঝতে পেরেছে, শাহরিয়ারকে কাজটার দায়িত্ব দেয়ার–তার অনুরোধে, এমন নয় যে আসাফ খান জানে না–জাহাঙ্গীরের সিদ্ধান্তের শুনে আসাফ খানের চক্ষু ছানাবড়া হয়ে উঠেছিল। আগ্রা সেনানিবাসের সর্বাধিনায়ক হিসাবে তার ভাইয়ের মনে হয়েছিল তার অন্তত যুবরাজের সঙ্গী হওয়া উচিত। সে মেহেরুন্নিসাকে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে প্রস্তাবিত নতুন দূর্গের জন্য সে কতকিছু করতে পারে সব বলেছিল। সে মুখে সহানুভূতিপূর্ণ হাসি নিয়ে মনেযোগ দিয়ে তার কথা শুনেছে এবং সবকিছু মনে রেখেছে। সে তারপরে শাহরিয়ারকে চিঠি লিখে তরুণ মনে নিগূঢ়ভাবে কিছু ধারণা প্রোথিত করেছে যার ভিতরে কিছু অবশ্য তার নিজের।
‘আমি ঠিক নিশ্চিত নই যে শাহরিয়ার এত বড় একটা দায়িত্ব সামলাতে পারবে–ভুলে গেলে চলবে না যে তার মাত্র সতের বছর বয়স–কিন্তু মনে হচ্ছে যে তাকে কাজটা দেয়ার জন্য তোমার পরামর্শ ঠিক ছিল।
‘আর আপনি তাকে একা পাঠিয়ে ঠিক কাজটাই করেছেন। আপনি প্রথমে যেমন প্রস্তাব করেছিলেন সেই অনুযায়ী যদি আমার ভাইকে তার সাথে পাঠাতেন, তাহলে শাহরিয়ারের হয়ত মনে হতো আপনি তার উপরে আস্থা রাখতে পারছেন না।
‘তুমি খুব ভালো মানুষ চিনতে পারো।
‘আপনি আপনাকে আগেই বলেছিলাম শাহরিয়ারের সামর্থ্যকে আপনি ছোট করে দেখছেন।
‘কেবল পারভেজের ব্যাপারে তুমি যদি আমাকে কোনো পরামর্শ দিতে পারতে। বিয়ের পরেও তার ভিতরে কোনো পরিবর্তন আসেনি–সত্যি বলতে কি ঠিক উল্টোটা হয়েছে। সে আমাকে আমার নিজের সৎ-ভাই ডানিয়েল আর মুরাদের কথা মনে করিয়ে দেয়। তাদের সুরাপান থেকে বিরত রাখতে আমার আব্বাজানের সমস্ত প্রয়াস ব্যর্থ করে তারা শেষে সুরাপানের কারণেই মারা গিয়েছে। আমার মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তা হয় যে এটা আমাদের পরিবারের জন্য একটা অভিশাপ।
‘পারভেজ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। নিজের দূর্বলতা অতিক্রম করা তাকেই শিখতে হবে। সে যে কদাচিৎ অপ্রমত্ত অবস্থায় থাকে সেটা আপনার দোষ না। আপনার উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন কিছুর অনুমতি আপনি দিতে পারেন না।
জাহাঙ্গীর আপন মনে ভাবে, আমি কি করি না। তার বয়স যখন বিশের কোটায় ছিল তখন সে আফিম আর সুরার দাসে পরিণত হয়েছিল, তাকে দায়িত্বপূর্ণ কোনো পদ প্রদানে তার আব্বাজানের অনীহার জন্য নিজেকে সান্ত্বনা দিতে সে এসবের আশ্রয় নিত। সে নিজেও হয়ত এই আসক্তির কারণে মৃত্যুবরণ করতো যদি সে তার দুধ-ভাই সুলেমান বেগের ভালোবাসা না পেতো, সেই তাকে সাহায্য করেছিল আসক্তির কবল থেকে বের হয়ে আসতে। সুলেমান বেগের মুখটা তার মানসপটে মুহূর্তের জন্য ভেসে উঠে–সে শেষবার জ্বরের আক্রমণে বিপর্যস্ত অবস্থায় যেমন দেখেছিল তেমন না বরং প্রাণবন্ত আর আত্মবিশ্বাসী। সে ছিল তাঁর সত্যিকারের বন্ধু এবং এতগুলো বছর পরেও সে অনুভব করে এখনও সে তার অভাব কতটা বোধ করে। সুলেমান বেগ এখন তার সম্বন্ধে কি মন্তব্য করতো? তাঁর এই ক্রমশ বাড়তে থাকা আলস্য, সাম্রাজ্যের কাজে তার অনীহা, ইংরেজ রাজদূতের সাথে তাঁর উদ্দাম পানাহারের আসর–যদিও আক্ষেপের বিষয় আজকাল এসব পানাহারের আসর অনেকটাই কমে গিয়েছে স্যার টমাস আজকাল প্রায়ই কেমন অসুস্থ বোধ করেন–আর আফিমের প্রতি তার আসক্তি যার কবল থেকে সে আসলে কখনও পুরোপুরি নিজেকে মুক্ত করতে পারেনি এবং এখন আবার সেটা প্রবল হয়ে উঠেছে।
আফিম আর সুরা সে কেন এত পছন্দ করে? তাঁর বয়স যখন অল্প ছিল তখন সে হৃদয়ের তিক্ততার উপশম ঘটাতে এসবে আসক্ত হয়েছিল জীবনের হতাশা ভুলে থাকতে। সে এখন যখন সমৃদ্ধ আর স্থায়ী একটা সাম্রাজ্যের অধিকারী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ এবং দুই পুত্রের জনক যাঁদের নিয়ে সে গর্ববোধ করতে পারে, আনন্দের জন্য সে এখন কেন এসব উপকরণ ব্যবহার করতে পারবে না? আফিম আর সুরা তাকে শমিত করে, এমনকি এগুলো তাঁর মনকে প্রসারিত করে। আফিম আর সুরা একত্রে তাকে যে সুখাবহ ভাব সমাধিতে পৌঁছে দেয় তখনই তাঁর পারিপার্শ্বিক পৃথিবীর প্রকৃতি সম্বন্ধে তাঁর সবচেয়ে অন্তদৃষ্টিসম্পন্ন ভাবনাগুলো তাঁর কাছে ধরা দেয়… এবং রো’র সাথে চিত্রকলা থেকে শুরু করে খৃস্টান ধর্মের খামখেয়ালিপনা সবকিছু নিয়ে সে সবচেয়ে উদ্দীপক আলাপচারিতায় মেতে উঠতো। মেহেরুন্নিসা এইমাত্র মন্তব্য করেছে সে আসক্তির অনুসঙ্গগুলোকে তার উপর প্রভাব বিস্তার করতে দেয় না, কিন্তু সে নিজের বুকে হাত দিয়ে এত নিশ্চিতভাবে এই কথাটা বলতে পারবে না। সে যদি এসব অনুসঙ্গ ছাড়া অর্ধেক দিন অতিবাহিত করে তাহলেই এসবের জন্য ব্যাকুলতা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং সে কদাচিৎ দীর্ঘ সময় তাঁদের আসক্তি এড়িয়ে থাকতে পারে। তার সাম্রাজ্যের প্রাত্যহিক কর্মকাণ্ড থেকে এসব যদি আদতেই তাকে দূরে সরে থাকতে প্ররোচিত করেই, এতে কি এমন ক্ষতি বৃদ্ধি হবে? তাঁর অনুগত অসংখ্য বিশ্বস্ত লোক রয়েছে যারা তাঁর এই দায়িত্ব গ্রহণের জন্য উদ্গ্রীব হয়ে রয়েছে, এঁদের ভিতরে মেহেরুন্নিসাও রয়েছে। তার ক্রমাগত নতুন দায়িত্ব গ্রহণের আকাঙ্খা দেখে সে মুগ্ধ হয়, প্রতিবারই তাকে আশ্বস্ত করতে ভুল হয় না যে সে কেবলই তাঁর সাহায্যকারী হতে আগ্রহী। সে নিশ্চিত, বিয়ষটা সত্যি, কিন্তু সে এটাই জানে যে বিষয়টা মেহেরুন্নিসা কতটা উপভোগ করে। তাকে আগলে রাখার জন্য মেহেরুন্নিসা যতক্ষণ তাঁর পাশে রয়েছে তার হয়ত সুরা আর আফিমের আসক্তির সাথে লড়াই করার ততটা প্রয়োজন নেই।
