হাতির পাল ইত্যবসরে মালবাহী শকটের দিকে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে। খুররম সহসা মালিক আম্বারের একদল লোককে দুটো অপেক্ষাকৃত ছোট মালবাহী শকট প্রাণপণে ঠেলে একপাশে সরাতে দেখে, তারা সেটা করতে দুটো কামান আর চামড়ার আঁটসাঁট পোষাক পরিহিত তাঁদের তোপচিরা দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়। তোপচির দল গোলাবর্ষণ করতে সাথে সাথে তাঁদের হাতের মোম লাগান জ্বলন্ত সলতে দিয়ে কামানে অগ্নিসংযোগ করে। আগুয়ান হাতির পালের একটা হাতি সামনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, কামানের একটা গোলা তাকে আঘাত করেছে যা তার একটা গজদন্ত একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং শুড় আর মুখের সম্মুখভাগ মাংসের রক্তাক্ত মণ্ডে পরিণত করেছে। কামানের দ্বিতীয় গোলাটা সৌভাগ্যক্রমে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় কিন্তু গোলাটা আরেকটা অতিকায় মোগল রণহস্তির পায়ের কাছে বালিতে আছড়ে পড়ার সময় বৃষ্টির মত আকাশে বালি ছিটিয়ে দেয়। অতিকায় দানবটা সাথে সাথে থমকে দাঁড়িয়ে যায়, ধূলিকণার কারণে সম্ভবত মুহূর্তের জন্য অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, এবং বৃংহিতের শব্দে চারপাশ মুখরিত করে তুলে। অন্য হাতিরা অবশ্য, তাদের মাহুতের নির্দেশে সাড়া দিয়ে, সুবোধ ভঙ্গিতে তাকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে থাকে ভাবটা এমন যেন কুচকাওয়াজ ময়দানে কসরত করছে। একটা হাওদা থেকে তার গজনলগুলোর একটা গোলাবর্ষণ করতে খুররম আগুনের ঝলক দেখতে পায় এবং সাদা ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখে। গোলাটা মালিক আম্বারের সবচেয়ে কাছের কামানে আঘাত করে, এর ধাতু দিয়ে বাধান কাঠের চাকার একটা গুঁড়িয়ে দিয়ে দুটো চাকাকে সংযুক্তকারী অক্ষদণ্ড ভেঙে দেয়ায় কামানের নলটা আকাশে দিকে এক উদ্ভট নতি করে উঁচু হয়ে আছে। অন্য আরেকটা হাওদায় অবস্থানরত তবকিরা দ্বিতীয় কামানের দু’জন তোপচিকে ঘায়েল করে, আহত তোপচিদের একজন চিৎ হয়ে মাটিতে শুয়ে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে বালুর উপরে পায়ের গোড়ালি দিয়ে কষ্টের বোল তুলে। খুররম তাকিয়ে থাকার মাঝেই তাঁর চারজন অশ্বারোহী অবশিষ্ট দু’জন তোপচিকে ঘিরে ফেলে যারা আত্মসমর্পণের স্মারক হিসাবে মুখ মাটিতে দিয়ে উপুড় হয়ে বালিতে শুয়ে পড়ে।
নদীর তীরের দিকে অগ্রসর হবার জন্য খুররম তাঁর লোকদের আদেশ দিতে সে পুলকিত হয়ে লক্ষ্য করে যে মালিক আম্বারের যোদ্ধারা নদী অভিমুখে পশ্চাদপসারণ আরম্ভ করেছে। সে তার লোকদের ইশারায় যখন পলায়নপর শত্রুদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হতে আদেশ দেয়, খুররম তখন অনুধাবন করতে শুরু করে যে একঘন্টারও কম সময়ের ভিতরে সে পুনরায় আবার বিজয় অর্জন করবে, যদিও এই বিজয় নিশ্চিত করতে যখন কামান বিস্ফোরিত হয়েছিল তখন সৌভাগ্যের বিশাল একটা বরাভয় দারুণ ভূমিকা রেখেছে। সে অবশ্য এর মাঝেই আরেকটা বালিয়াড়ি টপকে যায় এবং প্রথমবারের মত নদীর পরিষ্কার একটা চিত্র তার সামনে ভেসে উঠে, সে দেখে যে নদীর অপরতীরে সেখানে অশ্বারোহী যোদ্ধাদের বিশাল একটা দল সমবেত হয়েছে এবং মাঝ নদীতে অন্যান্যদের বহনকারী ভেলা এস্তভঙ্গিতে দূরবর্তীপ্রান্ত অভিমুখে লগি মেরে পরিচালিত করা হচ্ছে। সে নদীর তীরে উপস্থিত হবার এক কি দুই মিনিট পরে ঘুরে দাঁড়াবার আগে একটা ক্ষুদ্রাকৃতি অবয়ব যার বুকের বর্ম আসন্ন মধ্যাহ্নের সূর্যালোকে আয়নার মত দ্যুতি ছড়াচ্ছে ঔদ্ধত্যের ভঙ্গিতে নিজের হাতের তরবারি আন্দোলিত করে এবং নিজের অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে যাত্রা করে। মালিক আম্বার আরো একবার সাফল্যের সাথে তাঁর নাগাল এড়িয়ে গিয়েছে, খুররম ভাবে, কিন্তু এটাও কম নয় যে লোকটা তাঁর পুরো বাহিনীই নদীর তীরে খুইয়েছে এবং–পরিত্যক্ত মালবাহী শকটগুলোয় যদি সে যা ভেবেছে সত্যিই তাই থাকে–সেই সাথে তাঁর লুণ্ঠিত ঐশ্বর্যের অধিকাংশ।
তাঁর আব্বাজান খুশি হবেন যখন খবরটা তাঁর কাছে পৌঁছাবে। তাঁর আম্মিজানও খুশি হতেন, কিন্তু যোধা বাঈ তিনমাস পূর্বে ইন্তেকাল করেছেন। তাঁর কাছে যে খবর রয়েছে সেই অনুসারে তার মৃত্যু অপ্রত্যাশিতভাবে হলেও ঘুমের ভিতরে শান্তিপূর্ণভাবেই হয়েছে। সে এখনও প্রায়ই তাঁর কথা ভাবে এবং তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে আম্মিজান আর নেই।
*
কসরতবাজের নমনীয় দেহ, কমলা রঙের একটা ল্যাঙট ছাড়া একেবারে নগ্ন, জবজব করে তেল মাখার কারণে চকচক করছে, জাহাঙ্গীরের আবাসন কক্ষের শান বাঁধান বারান্দায় পায়ের উপরে শক্ত করে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে সে পেছনের দিকে হেলে পড়ে এবং ডান হাত উঁচু করে দুই ফিট লম্বা ইস্পাতের সরু তরবারি যা জাহাঙ্গীর একটু আগেই নিজে পরখ করে দেখেছে নিজের ভোলা মুখে প্রবিষ্ট করতে। তরবারির ফলা একেবারে বাট পর্যন্ত ভিতরে প্রবেশ করতে জাহাঙ্গীর শ্বাস রুদ্ধ করে তাকিয়ে থাকে, তাঁর মনে হয় যেকোনো মুহূর্তে তরবারির ফলার অগ্রভাগ লোটার পেষল উদর ভেদ করে রক্তের ধারার সাথে বের হয়ে আসবে। কিন্তু লোকটা যত সাবলীলভাবে তরবারির ফলা মুখের ভেতরে প্রবেশ করিয়েছিল ধীরে ধীরে ততটাই সাবলীলভাবে তরবারিগুলো বের করে এনে, মেহেরুন্নিসা আর জাহাঙ্গীরের সামনে মাথা নত করে অভিবাদন জানায় এবং তরবারিগুলো মাটিতে নামিয়ে রাখে। সে হাততালি দিতে আরও দু’জন কসরতবাজ সামনে এগিয়ে আসে, প্রত্যেকের হাতে মাংসের কাবার তৈরির শিক ধরা রয়েছে যার চারপাশে তেলে ভেজান কাপড় শক্ত করে জড়ানো রয়েছে এবং এখন সেটায় আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। সে পুনরায় পিছনের দিকে হেলে যায়, এবার এতটাই যে তার লম্বা কালো চুল বারান্দার পাথর স্পর্শ করে, লোকটা এবার প্রথমে একটা জ্বলন্ত শিক গলধঃকরণ করে তারপরে দ্বিতীয়টা তারপরে দুটো একসাথে। ত্বক বিদীর্ণ যেমন হয়নি তেমনি এবার আগুনে চামড়া পোড়ার গন্ধও পাওয়া যায় না। লোকটা যখন আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে তখনও জ্বলন্ত শিকে ফুঁ দিয়ে আগুন নিভিয়ে দেয়, জাহাঙ্গীর তার দিকে এক মুঠো সোনার মোহর ছুঁড়ে দেয়।
