‘ফিরে এসো! আমাদের সাথে আক্রমণ করো!’ খুররম কতিপয় ভগ্নমনোরথ অশ্বারোহীদের প্রতি যুদ্ধের হট্টগোলের মাঝে তার পক্ষে যতটা জোরে সম্ভব চিৎকার করে বলে। বামে নিচু বালিয়াড়ির পেছনে সবচেয়ে কাছের কামানগুলোকে আক্রমণ করো। দূরত্ব অনেক কম থাকায়–আমরা তাদের কাছে পৌঁছাবার পূর্বে তাঁরা যথেষ্ট দ্রুততার সাথে কামানগুলোকে গোলাবর্ষণের উপযোগী করতে না পারায় একবারের বেশি গোলাবর্ষণ করতে পারবে না।’ খুররম, তাঁর ঘোড়ার গলার কাছে মাথা নুইয়ে এনে তরবারি ধরা ডানহাত সামনের দিকে প্রসারিত করে, তাঁর বাহন বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে নিয়ে মালিক আম্বারের সৈন্যসারির কেন্দ্রে নিচু বালিয়াড়ির দিকে সরাসরি তাঁদের সাথে নিয়ে এগিয়ে যায় যার পেছনে দুটো কামানের নল মুখব্যাদান করে রয়েছে।
সে অর্ধেক পথ অতিক্রম করার আগেই, সে বিকট একটা বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনতে পায় প্রায় সাথে সাথেই দ্বিতীয় আরেকটা গর্জন ভেসে আসে এবং তার চারপাশে কাঁকড় আর বালির সাথে ধাতুর টুকরো বৃষ্টির মত আছড়ে পড়তে উষ্ণ বাতাসের একটা ঝাপটা সে অনুভব করে এবং বালিয়াড়ির পেছন থেকে ঝাঁঝালো ধোয়ার কুণ্ডলী উঠতে থাকে। তাঁর পাশের এক যোদ্ধার খয়েরী রঙের ঘোড়া গলায় ধাতুর এবড়ো-থেবড়ো একটা টুকরো বিদ্ধ অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আর এর পিঠে উপবিষ্ট কমলা রঙের পোষাক পরিহিত দীর্ঘদেহী রাজপুত যোদ্ধা মাথা নিচের দিকে দিয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে এবং স্থির হয়ে থাকে, বেচারার ঘাড় ভেঙে গিয়েছে। খুররম তার ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, তার কান ভোঁ ভোঁ করে, মাথা ঠিকমত কাজ করে না এবং ধোয়া আর কাকড়ে তার চোখ মুখ জ্বালা করতে থাকে। সে যদিও হতভম্ভ বোধ করে তারপরেও বুঝতে পারে যে কামানের স্বাভাবিক গোলাবর্ষণের ফলে এমন ভীষণ বিস্ফোরণ হওয়া অসম্ভব। নিমেষের জন্য তাঁর চিন্তায় নতুন কোনো অস্ত্রের সম্ভাবনা উঁকি দিয়ে যায় কিন্তু তারপরেই যখন তার কালো ঘোড়াটা নিচু বালিয়াড়ি টপকে পার হয় এবং বোয়াও খানিকটা সরে যায় সে দেখে যে বালিয়াড়ির পিছনে বিশাল কামান দুটোর ভিতরে একটা বিস্ফোরিত হয়েছে। কামানের নল কলার ছিলকার মত পিছনের দিকে গুটিয়ে গিয়েছে। বিস্ফোরিত কামানের বেশ কয়েকজন তোপচির ছিন্নভিন্ন আর দুমড়ে যাওয়া নিথর দেহ চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে। বালির উপরে কাছেই আরেকটা বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে যার চারপাশে সাদা কাপড় আর টিনের টুকরো পড়ে রয়েছে। দ্বিতীয় বিস্ফোরণটার কারণ নিশ্চিতভাবেই কাছেই মজুদ করে রাখা বারুদ এবং প্রথম বিস্ফোরণের ফলে যা প্রজ্জ্বলিত হয়েছে।
প্রথম কামানের বিস্ফোরণ দ্বিতীয় কামানের লম্বা নলটাকে কাঠের ভারি কাঠামো থেকে ছিটকে ফেলায় এর নিচে কামানের দু’জন তোপচি চাপা পড়েছে। তৃতীয় আরেকজন ছিন্নভিন্ন বাম পা নিয়ে বিস্ফোরণ স্থল থেকে হামাগুড়ি দিয়ে সরে যেতে চেষ্টা করছে যা তাঁর পায়ের গোলাকৃতি মাংসপেশীর মাঝামাঝি স্থান থেকে নিচের দিকে হাড় আর মাংসের একটা রক্তাক্ত দলায় পরিণত হয়েছে।
খুররম তার ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে তার চারপাশে পুনরায় নিজের সৈন্যদের সমবেত হবার সুযোগ দিয়ে, সে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখে যে তাঁর বক্ষাবরণীর নিম্নাংশ, তার পর্যাণের সামনের দিকে উঁচু হয়ে থাকা বাঁকা অংশ এবং তাঁর ঘোড়ার মাথাকে সুরক্ষা দানকারী ইস্পাতের একটা পাত সবকিছুতে রক্ত আর মাংসের ছোট টুকরো আটকে রয়েছে যা অবশ্যই প্রথম কামানের কোনো তোপচির দেহ থেকে ছিটকে এনেছে। সে কেঁপে উঠে ভাবে, তার ভাগ্যটা বেশ ভালোই বলতে হবে। তাঁর একেবারে সামনে বিস্ফোরণটা হয়েছিল। অত্যাধিক মাত্রায় গোলাবর্ষণ বা ত্রুটিযুক্ত গঠণের কারণে যদি কামানের নলটা বিস্ফোরিত না হত কামানের গোলা নিশ্চিতভাবেই তাকে এতক্ষণে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলতো। নিয়তি তাকে যে সুযোগ দিয়েছে সে অবশ্যই সেটার যথাযোগ্য ব্যবহার করবে।
সে পুলকিত হয়ে লক্ষ্য করে তার চারপাশে দ্রুত সমবেত হতে থাকা যোদ্ধারা এখন মালিক আম্বারের সৈন্যব্যুহের ভেতর অবস্থান করছে এবং আবিসিনিয়ান সেনাপতির তোপচিরা তাঁদের অবশিষ্ট কামানগুলোকে দৈহিক শক্তির দ্বারা কোনোভাবেই এমনকোন অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে না যেখান থেকে তাদের অবস্থানের উপর গোলাবর্ষণ করা যাবে এমনকি যদি, বিস্ফোরণের কারণে তাদের বিমূঢ় হয়ে পড়ার কথা, এটা করার মত তাদের মানসিক স্থিরতা বজায় থাকে। রণহস্তীর বহরের একটা অংশ এতক্ষণে এসে উপস্থিত হয়েছে, বালিয়াড়ির নরম বালির ভিতর দিয়ে তারা সবকিছু ভেঙে এগিয়ে যায়। খুররম তাঁদের সামনে মালিক আম্বারের অবস্থানের কেন্দ্রের দিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে আরো বেশ কয়েকটা বালিয়াড়ির পেছনে সে মালবাহী শকটের বহর আর তাঁদের পেছনে একদল অশ্বারোহী যোদ্ধা দেখতে পাচ্ছে, এবং সে চিৎকার করে তার অশ্বারোহীদের অনুসরণ করতে বলে।
মালিক আম্বারের লোকজন তাদের বিভ্রান্তি কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে। হাতির পাল সামনের দিকে এগিয়ে যেতে খুররম আশেপাশের বালিয়াড়ির আড়াল থেকে গাদাবন্দুকের শব্দের সাথে সাথে হাতির গায়ের ভারি ইস্পাতের পাতে বন্দুকের গুলি প্রতিহত হবার শব্দ শুনতে পায়। একটা হাতি, দেহের অরক্ষিত স্থানে মোক্ষমভাবে গুলিবিদ্ধ হতে, প্রথমে গতি শ্লথ করে এবং তারপরে দিক পরিবর্তন করে কিন্তু বাকিরা এমন প্রাণবন্ত ভাবে সামনে এগিয়ে যায় যেন তারা তাদের সাথীদের বিপর্যয়ের আর্তনাদ শুনতে পায়নি। গোলন্দাজদের মত তবকিদেরও গুলিবর্ষণের পরে পুনরায় গুলি ভরার ঝামেলাপূর্ণ পদ্ধতি সম্পূর্ণ করতে প্রয়োজনীয় সময়ের সমস্যার কথা জানা থাকায়, খুররম তার সৈন্যদলের পার্শ্বদেশে অবস্থানরত এক সেনাপতিকে কিছু অশ্বারোহী যোদ্ধা নিয়ে তবকিরা তাঁদের গাদাবন্দুকে গুলি ভরার আগেই তাদের নিষ্ক্রিয় করার ইঙ্গিত করে। লোকটা সাথে সাথে তার আদেশ পালন করে এবং এক মিনিটেরও কম সময়ের ভিতরে অশ্বারোহী যোদ্ধারা সবচেয়ে কাছের বালিয়াড়ির একপাশ দিয়ে ঘুরে গিয়ে আক্রমণ করতে বেশ কয়েকজন তবকি বালিয়াড়ির অন্যপাশ দিয়ে বের হয়ে আসে। শত্রুপক্ষের যোদ্ধারা তাদের অস্ত্র মাটিতে ফেলে দেয় এবং দৌড়ে পালাবার সময় তারা অসহায় ভঙ্গিতে পেছনে ধেয়ে আসা অশ্বারোহী যোদ্ধাদের ধারালো তরবারির ঘাতক ফলার হাত থেকে নিজেদের মাথা হাত তুলে বাঁচাতে চেষ্টা করে। তাঁদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং অচিরেই সবাই বালির উপরে হাত পা ছড়িয়ে নিথর পড়ে থাকে।
