সত্যি কথা, কিন্তু আমি তার হুমকি নিয়ন্ত্রণের চেয়ে আরও বেশি কিছু করতে আগ্রহী। আমার এখন ভয় হচ্ছে যে আগামী দুই একদিনের ভিতরে সে তার পরিচিত পাহাড়ী এলাকায় পৌঁছে যাবে এবং সেখানে ফলাফল নির্ধারণী যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া প্রায় অসম্ভব, খুররম কথাগুলো বলার সময় নিজের হতাশা কণ্ঠে ফুটে উঠা থেকে লুকিয়ে রাখতে গিয়েও ব্যর্থ হয়। তার মাঝে মাঝে মনে হয় যে মালিক আম্বারের বোধহয় তার জ্যেষ্ঠ আধিকারিকদের ভেতর কোনো গুপ্তচর রয়েছে, গতকাল সন্ধ্যাবেলায় সে তার তাবুতে আরজুমান্দকে বিষয়টা নিয়ে রীতিমত অভিযোগ করেছে।
‘কিন্তু যদি তাই হবে তাহলে সে কেবল পশ্চাদপসারণ না করে আপনাকে অতর্কিত আক্রমণ করে পরাস্ত করার একটা সুযোগ কি খুঁজে পেতো না? সে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করে। তার অর্ধাঙ্গিনী হয়ত ঠিকই বলেছে, সে নিজেকে সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করে।
‘যুবরাজ, আমাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য গুপ্তদূতদের একজন আমায় বলেছে যে মালিক আম্বারের বর্তমান অবস্থান থেকে প্রায় দশ মাইলের দূরে নদী সহসা পশ্চিমে তীক্ষ্ণ একটা বাঁক নিয়েছে। কামরান ইকবাল খুররমের তন্ময় ভাবনার ঘোর ছিন্ন করে বলে। আমরা কি তাকে নদীর বাঁকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করতে পারি না?’
‘চেষ্টা করা যায়, কিন্তু সেটা বাঁকের কাছে ভূমির গঠন প্রকৃতির উপর নির্ভর করছে। এলাকাটা নিশ্চয়ই জলাভূমি নয়, তাই কি?
‘না। জায়গাটায় বেশকিছু বালুচর রয়েছে যার হয়ত প্রতিরক্ষা সহায়ক হিসাবে প্রতীয়মান হতে পারে কিন্তু সেগুলো বেশ নিচু আর আপাতদৃষ্টিতে সেখানে খুব বেশি সংখ্যক বালুচরও নেই।’
‘তাহলে সম্ভবত ঝুঁকিটা নেয়া যায়, খুররম বলে, তার উদ্দীপনা বাড়তে শুরু করেছে। মালিক আম্বার সেখানে কখন পৌঁছাতে পারে?
‘আগামী কাল সকাল দশটা নাগাদ–সে যদি রাতের বেলা নয় ঘন্টা শিবির স্থাপনের তাঁর চিরাচরিত রীতি অনুসরণ করে।
‘বেশ, তাহলে তাকে আমরা সেখানেই আক্রমণ করবো। আমাদের আক্রমণের প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করার মত কাছাকাছি আসা থেকে মালিক আম্বারের গুপ্তদূতদের বিরত রাখতে আমাদের শিবির থেকে দূরবর্তী পাহারার স্থানগুলোয় লোক সংখ্যা দ্বিগুণের দ্বিগুণ বৃদ্ধি কর। অন্ধকার নামার পর নিরাপত্তা জোরদার করতে আমরা প্রহরীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেব।
*
খুররম পরের দিন সকালে নদীর বাঁকে মালিক আম্বারের অবস্থানের দিকে বালুময় ভূমির উপর দিয়ে ঘোড়া দাবড়ে এগিয়ে যাবার সময় ভয় আর উত্তেজনার একটা মিশ্র অনুভূতি সে টের পায় যা যুদ্ধের আগমুহূর্তে অন্যসব অনুভূতি মুছে গিয়ে সে সবসময়ে অনুভব করে। গতরাতে তাঁদের যুদ্ধ প্রস্তুতি আপাতদৃষ্টিতে তাদের শত্রুর অগোচরে সম্পন্ন হয়েছে কিন্তু তাঁর রণহস্তীর একটা অগ্রবর্তী দল নদীর বাঁকে অতর্কিত হামলার জন্য নির্ধারিত স্থান অভিমুখে দশ মাইল পথের মাত্র অর্ধেক দূরত্ব অতিক্রম করার পরেই মালিক আম্বারের গুপ্তদূতদের একটা দলের মুখোমুখি পড়ে যায়। হাওদায় অবস্থানরত তবকিরা যদিও তিনজনকে গুলি করে ধরাশায়ী করেছে কিন্তু অন্ততপক্ষে দু’জন মালিক আম্বারের সৈন্যসারি অভিমুখে অক্ষত অবস্থায় ঘোড়া হাঁকিয়ে পালিয়ে গিয়েছে, তার মানে সে তাঁদের আক্রমণের প্রায় এক ঘন্টা পূর্বেই হুশিয়ার হয়ে যাবে। খুররম ভাবে, কেবলমাত্র অশ্বারোহী বাহিনীর উপর পুরোপুরি নির্ভর না করে সে হয়ত ভুলই করেছে, কিন্তু সেক্ষেত্রে সে তার হাতির হাওদায় স্থাপিত ছোট কামানের গোলাবর্ষণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতো, তার অশ্বারোহী বাহিনীর সামান্য পিছনে অবস্থান করে দুর্বহ-দর্শন অতিকায় প্রাণীগুলোর পক্ষে বিস্ময়কর দ্রুততায় যারা আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
গুপ্তদূতেরা তাঁদের হুশিয়ার করার পরের অব্যবহিত সময়ে, মালিক আম্বারের তোপচিরা সম্ভবত তাঁদের ছয়টা কামান বালুচরের পেছনে সুবিধাজনক স্থানে মোতায়েন করতে পারবে, যা খুররম যেমনটা ধারণা করেছিল তারচেয়ে সামান্য নিচু হলেও সংখ্যায় মনে হয় অগণিত। তাঁদের প্রথম গোলাটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, বালুমাটির বুকে ভোঁতা শব্দ করে নিরীহ ভঙ্গিতে আছড়ে পড়ে। এখন অবশ্য মোগল অশ্বারোহীদের অগ্রবর্তী দলের ভেতরে কামান থেকে নিক্ষিপ্ত দ্বিতীয় দফার দুটো গোলা কাছাকাছি একসাথে পতিত হয়।
খুররম, নিজে অশ্বারোহী বাহিনীর দ্বিতীয় দলটার সাথে অবস্থান করছিল যুদ্ধ পরিস্থিতি ভালো করে দেখতে আর যুদ্ধ পরিচালনার স্বার্থে, তাঁর অগ্রবর্তী দু’জন অশ্বারোহী যোদ্ধার ঘোড়া মাটিতে আছড়ে পড়তে দেখে, তাঁদের আরোহীরা ঘোড়ার মাথার উপর দিয়ে সামনের দিকে ছিটকে যায়। অন্য ঘোড়াগুলো যার ভেতরে মোগল ঝাণ্ডা বহনকারী একটা ঘোড়াও রয়েছে মাটিতে পড়ে থাকা দেহগুলোতে হোঁচট খায় এবং তাঁরাও নিষ্ফল ভঙ্গিতে বাতাসে পা আন্দোলিত করতে করতে ভূপাতিত হয়। সবুজ রঙের লম্বা ঝাণ্ডাটা বাহকের হাত থেকে ছিটকে গিয়ে বাতাসে মালিক আম্বারের সৈন্যসারির দিকে কয়েক গজ গড়িয়ে গিয়ে বালুচরের একপাশে জন্মানো একটা ছোট কাঁটাঝোঁপের সাথে জড়িয়ে যায়।
মালিক আম্বারের তোপচিরা দারুণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আর নিয়মনিষ্ঠ। প্রতি মুহূর্তে আরো অধিক সংখ্যক কামানের গর্জন ভেসে আসতে থাকে আর সেই সাথে আরো সংখ্যায় অশ্বারোহী যোদ্ধা পর্যাণ থেকে মাটিতে ছিটকে পড়ে। দুটো ঘোড়া, একটার সামনের বামপায়ের বেশ কিছুটা অংশ উড়ে গিয়েছে এবং দুটোই সওয়ারীবিহীন অবস্থায় যন্ত্রণায় চিঁহি রব করে, কামানের আওতা থেকে সরে এসে অন্যান্য মোগল অশ্বারোহীদের পথে বাধার সৃষ্টি করে। ঘোড়া দুটো এমন আচরণ করার সাথে সাথে মোগল অশ্বারোহীর প্রথম আক্রমণ তাঁর সমস্ত প্রাণোন্মাদনা হারিয়ে ফেলতে আরম্ভ করে। অচিরেই অশ্বারোহীদের আক্রমণের দ্বিতীয় ঝপটার সামনের দিকের যোদ্ধারা আর খুররম অশ্বারোহীদের প্রথম দলটার অবশিষ্ট যোদ্ধাদের সাথে মিশে যায়। প্রাণোন্মাদনা
