‘কিন্তু সাফল্য অর্জনে তোমার দক্ষতা নিয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই।’
তার ছেলের মনেও যে এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই জাহাঙ্গীর সেটা খুররমের অভিব্যক্তি দেখেই বুঝতে পারে। তপতি নদীর কিনারে বুরহানপুরেই আমি এবারও আমার মূলশিবির স্থাপন করবো। মালিক আম্বারকে ধরতে সেখান থেকেই আমি মানডু অভিমুখে যাত্রা করবো। আমি সেই সাথে তার পশ্চাদপসারণ বন্ধ করার অভিপ্রায়ে দক্ষিণ দিন অবরোধ করতে সৈন্যবাহিনীও প্রেরণ করবো। আমি আমাদের ভূখণ্ড থেকে তাকে তাড়িয়ে বের করার বদলে তাকে দাবড়ে এখানে নিয়ে আসতে চাই যাতে আমরা স্থানীয় এলাকা সম্বন্ধে তাঁর জ্ঞানের বাড়তি সুবিধা নাকচ করতে পারি। তাকে সেখানে একবার পরাস্ত করতে পারলে–যদি আল্লাহতালা সহায় থাকে আমি পারবো–তার বাহিনীর অবশিষ্টাংশ যখন নিজেদের এলাকা অভিমুখে পশ্চাদপসারণ শুরু করবে তাদের ধ্বংস করার সুন্দর সুযোগ আমি তখন পাবো এবং সেইসাথে মালিক আম্বারকে বন্দি করে তাঁর হুমকি চিরতরে শেষ করতে পারবো।’
‘সতর্ক থাকবে। শত্রু হিসাবে সে ভীষণ ধূর্ত।
‘সে এইবার আমার হাত থেকে পালাতে পারবে না।’
‘আমি জানি, কিন্তু মনে রাখবে তারুণ্যদীপ্ত ব্যগ্রতা আর আত্মবিশ্বাস, যতই যুক্তিযুক্ত মনে হোক, তোমার দক্ষতায় ব্যাঘাত না ঘটায়, তোমায় বিচক্ষণতা তোমায় পরিত্যাগ করে। তোমার সেনাপতিদের সাথে যুদ্ধ পরিকল্পনা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করবে। আর নিজে অপ্রয়োজনীয় কোনো ঝুঁকি নিতে যাবে না।
‘আব্বাজান, আমি চেষ্টা করবো আপনার কথা স্মরণ রাখতে।
‘আরজুমান্দ সন্তানসম্ভবা হওয়া সত্ত্বেও তোমার সাথে যাচ্ছে?
‘সে গতবারের মত এবারও যাবার জন্য জেদ করছে। সে আমাদের সন্তানদের কাছ থেকেও আলাদা হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যদিও আমরা একবার বুরহানপুর পৌঁছাতে পারলে তারা সেখানের দূর্গের নিরাপত্তায় নিরাপদেই থাকবে। আব্বাজান এবার আমায় মার্জনা করবেন। আগামীকাল সকালে যাত্রা করতে হলে এবার আমায় বিদায় নিতেই হবে। বিদায়পূর্ব ভোজসভায় যোগ দেবার আগে আমায় রসদসংক্রান্ত শেষ মুহূর্তের কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
জাহাঙ্গীর তার সন্তানদের দিকে দু’হাত বাড়িয়ে দেয় এবং দু’জন পুনরায় পরস্পরকে আলিঙ্গন করে। আল্লাহতা’লা তোমার সহায় হোন এবং বাছা আমার, বিজয়ীর বেশে তুমি যেন দ্রুত আবার আমার কাছে ফিরে আসো।’ খুররম বিদায় নেয়ার পরে, জাহাঙ্গীর ঝরোকা বারান্দার দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে যায়। কুচকাওয়াজ ময়দানে সমবেত সৈন্যরা সেখান থেকে বিদায় নিয়েছে। যমুনা নদীর দিকে তাকিয়ে সে হাতিমহল হাতির একটা সারিকে পান পান করার জন্য মন্থর গতিতে বাদামি পানির দিকে ধীরে ধীরে নামতে দেখে, কিন্তু এছাড়া নদীর তীরে আর কোনোকিছু চলাফেরা করতে দেখা যায় না। পশ্চিম আকাশে বেগুনী আর লালচে আভার ছড়িয়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছে। একজন মোগল সম্রাট কতবার এখানে দাঁড়িয়ে এমন একটা দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ লাভ করেছেন? জাহাঙ্গীর একমুহূর্তের জন্য কল্পনা করে তাঁর পূর্বপুরুষেরা–এশিয়ার তৃণাঞ্চল থেকে আগত যোদ্ধা বাবর, জ্যোতিষী হুমায়ুন, তার আব্বাজান মহামতি আকবর, নিজের প্রজাদের কাছে ভীষণ শ্রদ্ধেয়–তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারা একটা প্রাচীন বংশ, তৈমূরের পূর্বেও লড়াকু যোদ্ধা চেঙ্গিস খান অব্দি তাদের বংশ বিস্তৃত… বংশচিন্তা চিন্তা মাথায় আসতে গর্বে তাঁর বুক ফুলে উঠে, এবং খুররমের মত একজন যোগ্য আর অনুগত সন্তানের পিতা হতে পেরে সে নিজেকে আরো গর্বিত মনে করে, যে তাঁর পূর্বপুরুষেরা যে সাম্রাজ্য স্থাপনের জন্য রক্তপাত করেছিল সেটা রক্ষা করতে মোগল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করবে।
*
‘যুবরাজ, দাক্ষিণাত্যের সূর্যের খরতাপে কাপড়ের লাল নিয়ন্ত্রক তাবুর নিচে খুররম একটা ছোট নিচু ডিভানের উপর তাঁর বয়োজ্যষ্ঠ সেনাপতিদের দ্বারা পরিবেষ্টত অবস্থায় বসে থাকার সময় কামরান ইকবাল তাঁর বক্তব্য শুরু করে। আমরা মানডুর চারপাশের এলাকা মুক্ত করার পর থেকেই মালিক আম্বারের লোকেরা আমরা অগ্রসর হবার পূর্বেই পশ্চাদপসারণ করছে। তারা এখনও বারি নদীর গতিপথ অনুসরণ করছে, তারা নদীর পশ্চিম তীর ধরে দক্ষিণে অগ্রসর হচ্ছে। তারা এই মুহূর্তে তাঁদের নিজেদের এলাকা থেকে বিশ মাইল দূরে অবস্থান করছে।
‘বেশ। তার মানে বুরহানপুর থেকে আমরা আমাদের অভিযান শুরু করার পর আমরা কিছুটা হলেও সাফল্য লাভ করেছি, কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়… আমাদের দুটো এলাকার ভিতরে বিভাজন চিহ্নিতকারী উঁচু পাহাড়ের সারি আর তাদের ভিতরে আমাদের কোনো সৈন্যবাহিনী কি অবস্থান করছে?
না, যুবরাজ। গুপ্তদূতদের সামান্য কয়েকটা দল কেবল রয়েছে যাদের পক্ষে প্রলম্বিত যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
‘আমারও তাই মনে হয়। মালিক আম্বার আবারও সুকৌশলে আমাদের ফাঁকি দিয়েছে। আমাদের সর্বাত্মক প্রয়াস সত্ত্বেও আমরা কখনও তাঁর অবস্থানের আর সীমান্তের মাঝামাঝি স্থানে আমাদের বাহিনী পর্যাপ্ত সংখ্যায় সমবেত করতে ব্যর্থ হয়ে তাকে আমাদের পছন্দের এলাকায় যুদ্ধ করতে বাধ্য করতে পারিনি। আমাদের প্রতিটা চাল যেন সে আগেই টের পেয়ে যায়।’
‘কিন্তু আমরা তাঁর লোকদের সাথে যতগুলো খণ্ডযুদ্ধে অবর্তীণ হয়েছি তাঁর প্রতিটাই আমরাই বিজয়ী হয়েছি এবং আমরা তাকে নতুন লুটতরাজের সম্ভাব্য সব স্থান থেকে দূরে রেখেছি–আমরা এমনকি তার আগে লুট করা কিছু সম্পদ উদ্ধারও করেছি, কামরান ইকবাল কথাটা বলে তার কণ্ঠে খানিকটা বুঝি গর্বেরও আভাস পাওয়া যায়, এসময় বেশ কয়েকজন আধিকারিক প্রবলবেগে মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করে।
