‘তোমার সহজাত প্রবৃত্তি বরাবরের মত এবারও অভ্রান্ত। তুমি পরিস্থিতি এত পরিষ্কার বিশ্লেষণ করতে পারো।
‘আমি কেবল আপনাকে সাহায্য করতে চাই। আর খুররম তাঁর অভিযানে রওয়ানা দেয়ার পরে আমি একটা ভোজসভার আয়োজন করে শাহরিয়ারকে আমন্ত্রণ জানাব যাতে আপনি নিজের চোখে দেখতে পান সে কত বড় হয়ে উঠেছে। আর সেদিন লাডলিকেও হয়তো আমি আমাদের সাথে যোগ দিতে বলতে পারি। মেয়েরা দ্রুত বড় হয়ে যায় এবং সেও দিনে দিনে রূপবতী আর গুনবতী হয়ে উঠছে। আমার মনে হয় তাঁর সঙ্গ আপনার ভালোই লাগবে।’
‘তবে তাই করো। কিন্তু কাজের কথা অনেক হয়েছে। তুমি আমার মনকে যথারীতি প্রশান্ত করেছে। এবার এসো দেহের উৎসবে আমরা নিজেদের ভাসিয়ে দেই। সে কথা শেষ করার আগেই আলতো করে তার গভীর-গলার কাচুলির কোরালের বোতাম খুলতে আরম্ভ করে এবং তাঁর চোখের তারায় সম্মতির আলো ফুটে উঠতে দেখে মুচকি হাসে। জাহাঙ্গীর কেবল মেহেরুন্নিসার এবং তাঁর জন্য কেবল সে জন্মেছে এবং কোনো কিছু বা কারো তাঁদের মাঝে আসা উচিত হবে না।
১.১৩ আবিসিনিয়ার অসুর
‘আমার আব্বাজান আমাদের আরো একবার মালিক আম্বারের মুখোমুখি হতে প্রেরণ করছেন। তার বিরুদ্ধে আমাদের পূর্ববর্তী বিজয়ের পরেও আবিসিনিয়ার এই ভাড়াটে যোদ্ধা পুনরায় আবার মোগল ভূখণ্ডে হানা দেয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে, খুররম কথা শুরু করে। সে মুক্তার চারটা ছড়া পরিকর হিসাবে ব্যবহৃত হয়েছে এমন দুধসাদা রঙের একটা আলখাল্লায় অনবদ্যভাবে সজ্জিত হয়ে এবং তাঁর একই রঙের পাগড়িতে প্রায় আঙুরের মত বড় একটা দীপ্তিময় মুক্তা শোভিত অবস্থায় আগ্রা দূর্গের ঝরোকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে নিচে কুচকাওয়াজ ময়দানে ঘন সন্নিবিষ্ট অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা তার সৈন্যদলের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতে। বারান্দার পেছনে অবস্থিত কক্ষ থেকে তাকিয়ে দেখার সময়, জাহাঙ্গীর মনে মনে ভাবে এই বয়সে সে কি এতটা আত্মবিশ্বাস আর কর্তৃত্বের সাথে কথা বলতে পারতো। খুররমের কথায়, গমের খেতের উপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাবার মত সারিবদ্ধ লোকের ভিতর দিয়ে মনে হয় যেন একটা মৃদু তরঙ্গ বয়ে যায় এবং তারা উল্লাস ধ্বনি করতে আরম্ভ করে।
‘আমরা এইবার মালিক আম্বারের সৈন্যদলকে পরাস্ত করে এবং তাকে আমাদের ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত করেই কেবল শান্ত হবো না যেমনটা আমরা তিনবছর আগে করেছিলাম, খুররম তাঁর কথা অব্যাহত রাখে, সে তাঁর ডান হাত উঁচু করে সবাইকে শান্ত থাকতে হুকুম করে। আমরা সেইসাথে দাবি করবো তার প্রভুরা গোলকুণ্ডা, বিজাপুর আর আহমেদনগরের সুলতানেরা যেন তাদের ভূখণ্ডের একটা অংশ আর স্বর্ণমুদ্রা আমাদের হাতে ছেড়ে দেয়। যুদ্ধে অর্জিত লুণ্ঠিত দ্রব্যের পরিমাণ দারুণ হবে এবং আমি নিজে সেটা তোমাদের সবার ভিতরে ভাগ করে দেয়াটা নিশ্চিত করবো। খুররম তার হাত নিচু করে এবং তার লোকদের ভিতর থেকে খুররম জিন্দাবাদ, পাদিশাহ জাহাঙ্গীর জিন্দাবাদ এর সমবেত ঐক্যতান ভেসে আসতে সে মুচকি হাসে। জাহাঙ্গীর ভাবে, তাঁর পূর্বপুরুষ বাবর ঠিকই বলেছিলেন যখন তিনি তাঁর রোজনামচায় লিখেছিলেন যে একটা সৈন্যবাহিনীর সাহসিকতা আর আনুগত্য নিশ্চিত করার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ উপায় লাভের সম্ভাবনা তাদের সামনে তুলে ধরা।
নিচে সমবেত লোকদের চিৎকার স্তব্ধ হয়ে পুনরায় নিরবতা বিরাজ করলে, খুররম বলতে থাকে, আজ রাতে, আমাদের চুড়ান্ত প্রস্তুতি যখন সমাপ্ত হলে, আমি আমাদের রাধুনিদের আদেশ দিয়েছি আমাদের জন্য বিশেষ ভোজের আয়োজন করতে যাতে আগামীকাল আমরা যখন আগ্রা দূর্গ থেকে যাত্রা করবো তখন আমরা আমাদের সর্বাত্মক বিজয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী থাকার সাথে সাথে আমাদের সবার পাকস্থলীও যেন খাদ্যে পরিপূর্ণ থাকে।’ খুররম ঘুরে দাঁড়াতে উল্লাসধ্বনির আরেকটা ঝাপটা তাকে আচ্ছন্ন করে, মাখন রঙের পোষাক পরিহিত দু’জন দীর্ঘদেহী দেহরক্ষী যাদের বক্ষাবরনী আর শিরোস্ত্রাণ পালিশ করে আয়নার দীপ্তি আনা হয়েছে তাঁর অনুগামী হয় এবং সে ভেতরে যেখানে তাঁর আব্বাজান অপেক্ষা করছে সেখানে যায়।
‘তুমি দারুণ বলেছে, জাহাঙ্গীর তাকে আলিঙ্গণ করে, বলে।
কারণ আমি চাই আমার লোকেরা যেন জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করে। আমার ভোজসভার ঘোষণা তাদের চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে গতির সঞ্চার করবে।
‘মালিক আম্বারের গতিবিধি সম্বন্ধে আজ আমি আরও কিছু তথ্য পেয়েছি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে মানডুর আশে পাশের এলাকায় লুটতরাজের অভিপ্রায়ে সে সমৃদ্ধশালী জায়গিরগুলোতে হানা দিচ্ছে। সে দুটো জেলার কোষাগার আর একটা স্থানীয় অস্ত্রশালাও দখল করেছে।
‘সে তাহলে বেশ ভালো পরিমাণের লুষ্ঠিত দ্রব্য একত্রিত করেছে।
‘হা, কিন্তু সেটা তাঁর অগ্রসর হবার গতি সামান্য হ্রাস করে বিষয়টা হয়তো আমাদের পক্ষেই রাখবে আর তোমার জন্যও সহজ হবে তার নাগাল পাওয়া।’
‘এটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা। আমার সৈন্য সংখ্যা তার চেয়ে অনেক বেশি এবং তারা অনেক বেশি অস্ত্রে সজ্জিত। আমি যদিও আমার লোকদের অপ্রয়োজনীয় উপকরণ বা মালপত্র বহন করতে নিষেধ করেছি, তারপরেও তার সৈন্যবাহিনী অনেকবেশি দ্রুতগামী আর ক্ষিপ্রগতির। সেইসাথে দাক্ষিণ্যের সীমান্ত তাঁরা আমাদের চেয়ে অনেক ভালো করে চেনে, যা তিনবছর আগে আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম। তারা আবারও পলায়নপর একটা শিকার হিসাবে প্রতিপন্ন হবে…’।
