‘সে একটা বার্তা পাঠিয়েছে যে তার শরীরটা ভালো নেই।’
‘খবরটা শুনে খারাপ লাগল। আশা করি তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। সে মনে মনে গভীর একটা সন্তুষ্টি অনুভব করলেও মেহেরুন্নিসা তার চোখেমুখে আন্তরিক উদ্বেগের একটা অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলে। রন্ধনশালার একজন পরিচারককে ঘুষ দিয়ে প্রচুর মশলা দেয়া ভেড়ার মাংসের তৈরি পোলাওয়ে এক টুকরো পঁচা মাংস দেয়াটা মোটেই কঠিন কাজ ছিল না যা রো খুব পছন্দ করে বলে সে জানে। সে কোনো ধরনের অপরাধবোধ অনুভব করে না–তাঁর সম্পর্কে বাজে কথা লেখার জন্য এই দুর্ভোগ তার প্রাপ্য। সে আশা করে মোগল দরবার ত্যাগ করার কথা বিবেচনা করার মত যথেষ্ট পরিমাণে অসুস্থ সে তাকে করতে পেরেছে। সম্ভবত না, কিন্তু দূতমহাশয়কে তাঁর নাড়িভূঁড়ির মাধ্যমে আক্রমণের উপায় খুঁজে পেয়ে সে বারবার এই উপায় ব্যবহার করবে যতক্ষণ না সে তাকে যথেষ্টভাবে দুর্বল করে দিয়ে তাকে দরবার থেকে বিতাড়িত করার তার লক্ষ্য অর্জিত হয়। তাঁর ধৈর্য কম এমন কথা তার শত্রুও বলবে না।
‘আমি এমনিও তোমার সাথে দেখা করতে আসতাম। আমি তোমার সাথে একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে আগ্রহী। আমার গুপ্তচরেরা দক্ষিণ থেকে খবর নিয়ে এসেছে যে মালিক আম্বার নতুন করে আবার সৈন্য সংগ্রহ করছে। আমি ভেবেছিলাম আমরা তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়েছি কিন্তু তার ঔদ্ধত্য আর উচ্চাকাঙ্খর–দাক্ষিণাত্যের সেইসব রাজাদের মত যাঁদের পক্ষে সে লড়াই করছে–মনে হয় কোনো সীমা পরিসীমা নেই।’
‘আপনি কি আবারও খুররমকে পাঠাতে চান?
‘আমি সেটাই তোমার সাথে আলোচনা করতে চাই। সে গতবার যুদ্ধে ভালোই পারদর্শীতা প্রদর্শন করেছিল। আমি তাকে আবার পাঠাব সেটাই সে আমার কাছে আশা করবে কিন্তু আমি তাকে আবারও বিপদের মুখে ঠেলে দিতে আগ্রহী নই। আমি তাকে যতই দেখছি ততই একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত হচ্ছি যে আমার উত্তরাধিকারী হিসাবে তার নাম ঘোষণা করার এবং তাকে এখানে নিরাপদে রাখার সময় এসেছে। একটা সাম্রাজ্য কীভাবে পরিচালনা করতে হয় সে বিষয়ে আমার কাছে তাঁর অনেক কিছুই শিক্ষণীয় রয়েছে। আমার স্থলাভিষিক্ত হবার সময় হলে যা তাকে সাহায্য করবে। আমার আব্বাজানও যদি আমার জন্য এভাবে চিন্তা করতেন আর আমি আমার আব্বাজানের ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চাই না।’
মেহেরুন্নিসা দ্রুত চিন্তা করে। তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি তাকে চিৎকার করে বলছে জাহাঙ্গীর আর খুররমকে পরস্পরের এতটা কাছাকাছি আসবার সুযোগ দেয়া তাঁর মোটেই উচিত হবে না। খুররমের যদিও আরজুমান্দের সাথে বিয়ে হয়েছে যার প্রতি সে ভীষণ অনুরক্ত এবং দু’জনের এমন নৈকট্যে তাঁর পরিবারই আখেরে লাভবান হলেও তাঁর নিজের কপালে এরফলে কেবলই দুর্ভোগ লেখা হবে। সে কোনোভাবেই এটা অনুমোদন করতে পারে না, কিন্তু সে কি বলবে? তারপরে তাঁর মাথায় একটা বুদ্ধি আসে। খুররমকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়ার ব্যাপারে আপনার অনীহার কারণ আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সে একজন গর্বিত তরুণ আর মালিক আম্বারকে মোকাবেলায় আপনি যদি তাকে পুনরায় প্রেরণ না করেন সে হয়তো অপমানিতবোধ করবে। সে শেষবার মালিক আম্বারকে বন্দি বা হত্যা করতে তার ব্যর্থতার প্রতিদান হিসাবে বিষয়টা বিবেচনা করতে পারে।
‘তো তুমি সত্যিই বিশ্বাস করো আমার তাকে পাঠানো উচিত?
‘হ্যাঁ। তাঁর জন্য, আবিসিনিয়ার অধিবাসীর সাথে বোঝাপড়াটা একটা অসমাপ্ত অধ্যায় আমি তাকে এমনটাই বলতে শুনেছি–এবং অন্য যেকোনো পদক্ষেপ কেবল তার মর্যাদাহানিই ঘটাবে। আর সে যখন ফিরে আসবে–আমি তার ফিরে আসবার ব্যাপারে নিশ্চিত, যদি তার নিজের জীবন ঝুঁকির সম্মুখীন না করার নির্দেশ আপনি তাকে দেন–ইতিমধ্যে তাকে আপনার উত্তরাধিকারী হিসাবে মনোনীত করবার বিষয়ে চিন্তা করার জন্য প্রচুর সময় পাওয়া যাবে। আপনার নিজেরই এখনও এমন কোনো বয়স হয়নি–এহেন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বিবেচনা করার জন্য এখনও আপনার হাতে প্রচুর সময় রয়েছে। আপনার অন্য সন্তানদের কথা আপনার ভুলে যাওয়া উচিত হবে না এবং খুররমের প্রতি আপনি যদি এতটা পক্ষপাত প্রদর্শন করেন তাহলে তাদের মনের অবস্থা কেমন হতে পারে সেটাও একটা ভেবে দেখার বিষয়।’
‘পারভেজ একটা মাথামোটা নির্বোধ আর বেহেড মাতাল। সে নিশ্চয়ই খসরুর চেয়ে বেশি সিংহাসন প্রত্যাশী নয়।
‘কিন্তু শাহরিয়ার। সে দ্রুত বেড়ে উঠছে এবং তাঁর চৌকষ হয়ে উঠার বিষয়ে আমি অনেক উৎসাহব্যঞ্জক কথা শুনতে পাই। সবাই বলে যে সে একজন দক্ষ ঘোড়সওয়ার এবং তীর-ধনুক বা গাঁদাবন্দুক দুটোতেই তাঁর নিশানা কখনও লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় না।
জাহাঙ্গীর মুচকি হাসে। তুমি দেখছি আমায় লজ্জায় ফেলে দিলে। আমাকে আমার নিজের সন্তানের সম্ভাবনা সম্বন্ধে তোমায় কিছু বলতে হবে না। আমি মানছি শাহরিয়ারের সাথে আমার কালেভদ্রে দেখা হয়।’
‘আপনার দেখা উচিত। আপনি তাহলে নিজেই তাকে যাচাই করতে পারবেন।
জাহাঙ্গীর মনে মনে ভাবে, মেহেরুন্নিসা বরাবরের মত ঠিকই বলেছে। উত্তরাধিকারী ঘোষণা করার জন্য এত তাড়াহুড়ো করার আসলেই কোনো প্রয়োজন নেই। আর সে এটাও ঠিকই বলেছে যে মালিক আম্বারের সাথে বোঝাপড়া করার জন্য তাঁর খুররমকেই সুযোগ দেয়া উচিত।
