*
নিকোলাস ব্যালেনটাইন বিছানায় শুয়ে থাকা তার প্রভুর ঘামে ভেজা আর নগ্ন দেহের দিকে আতঙ্কিত চোখে তাকিয়ে থাকে, তার লালচে মুখ এখন যন্ত্রণায় ফ্যাকাশে হয়ে আছে। আমার পেটের নাড়িভূঁড়িতে মনে হচ্ছে যেন কেউ আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে যদিও গত এক ঘন্টায় আমি ছয়বার পেট খালি করেছি,’ দূতমহাশয় চোখ বন্ধ অবস্থায়, কোঁকাতে কোঁকাতে বলে।
‘এসব কখন থেকে আরম্ভ হয়েছে?
‘রাতের খাবার শেষ করার প্রায় সাথে সাথে।
নিকোলাস ভাবে, লক্ষণ দেখে মনে হচ্ছে আমাশয়, হিন্দুস্তানে আগত বেশিরভাগ বহিরাগত কোনো না কোনো সময় যে রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। গন্ধ নিশ্চিতভাবে সেটাই ইঙ্গিত করছে–রো’র শয্যার নিচে প্রায় উপচে ওঠা পিতলের মূত্রাধার থেকে কামরার ভিতরে জমে থাকা দুর্গন্ধ মাথা ধরিয়ে দেয়। একজন পরিচারককে ডেকে মূত্রাধার খালি করতে আর নতুন আরেকটা দিয়ে যাবার আদেশ করে, নিকোলাস নিজেকে তার প্রভুর আরো কাছে যাবার জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করে, বিছানার দু’পাশ দুই হাতে শক্ত করে ধরে থাকা অবস্থায় বেচারার শীর্ণ বুকটা হাপরের মত উঠানামা করছে যেন সে ভয় পাচ্ছে যেকোনো সময় আবার যন্ত্রণাটা ফিরে আসবে।
‘আমি একজন হেকিমকে ডেকে আনছি।’
নিকোলাস বিশ মিনিট পরে দরবারের একজন হেকিমকে, খয়েরী রঙের পাগড়ি পরিহিত খর্বাকৃতির মোটাসোটা দেখতে একটা লোক নিজের চিকিৎসার অনুসঙ্গ চামড়ার একটা থলেতে বহন করছে, নিয়ে যখন ফিরে আসে, রো তখন একজন পরিচারকের ধরে থাকা পিতলের পিকদানে নাড়িভূড়ি উল্টে আসবে এমন ভঙ্গিতে বমি করছে। তার বমি করা অবশেষে শেষ হয় এবং বিছানায় উল্টে পড়ে হেকিম তখন তার কপালে হাত রাখে তারপরে প্রথমে তার ডান চোখের এবং পরে বামচোখের পাতা তুলে দেখে। দেখি, আমাকে আপনার জিহ্বা দেখান,’ সে তাকে অনুরোধ করে। রো মুখ খুলে জিহ্বার অগ্রভাগ বের করলে, নিকোলাস সেখানে হলদে একটা কিছুর প্রলেপ দেখতে পায়। আরো বের করেন, হেকিম আদেশের সুরে বলে। রো দুর্বলভাবে তাঁর জিহ্বা আরেকটু বাইরে বের করে।
‘আপনি পচা কিছু একটা খেয়েছেন। গরমের সময়ে আপনার অবশ্যই আরো সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।’
‘সম্রাটের আদেশে দূতমহাশয়ের সব খাবারই রাজকীয় রন্ধনশালায় প্রস্তুত করা হয়, নিকোলাস বিভ্রান্ত ভঙ্গিতে বলে। অনেক যত্ন নিয়ে সেখানে…’।
পচা খাবারের দ্বারাই কেবল এসব লক্ষণের প্রাদুর্ভাব দেখা যাবে। তার দেহ খাদ্যনালীর শুরু আর শেষপ্রান্ত দিয়ে রেচনের মাধ্যমে নিজেকে পরিষ্কার করছে যার কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। নিকোলাস তখনও বিষয়টা পুরোপুরি মানতে পারছে না দেখে চিকিৎসক আরো বলেন, ‘শোন ছোকরা, জিনিষটা যদি বিষ হতো তাহলে এতক্ষণে তোমার প্রভুর ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যেতো। অবস্থা যেমন দেখছি তোমায় এটুকু আমি বলতে পারি যদি তিনি চুপচাপ শুয়ে বিশ্রাম নেন, প্রচুর পানি পান করেন আর আগামী কয়েকদিন কেবল টকদই খেয়ে থাকেন যার সাথে তুমি অবশ্যই আফিমের গুলি গুড়ো করে মিশিয়ে দেবে তাহলে তাঁর প্রাণসংশয় হবার মত কোনো কারণ এখনও ঘটেনি। আমি এখন একটা মিশ্রণ প্রস্তুত করবো। আমি কি করছি খুব খেয়াল করে দেখবে তাহলে বুঝতে পারবে তোমায় ঠিক কি করতে হবে। তুমি তাকে দুই চামচ করে প্রতিঘন্টায় খেতে দেবে–এর বেশি নয়–যতক্ষণ না আমাশয় আর সেই সংক্রান্ত অসুস্থতা পুরোপুরি বন্ধ না হয়। সবকিছু বন্ধ হবার পরে আরো তিনদিন যেন সে পানি ছাড়া আর কিছু গ্রহণ না করে। তার শারীরিক অবস্থার যদি কোনো অবনতি হয় তাহলে সাথে সাথে আমায় ডেকে আনতে লোক পাঠাবে।
নিকোলাস মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। হেকিম বিদায় নিতে সে রো’কে পরিষ্কার করতে, বিছানার চাদর বদলে দিতে আর তাকে ভীষণভাবে কাঁপতে দেখে তাঁর জন্য রাতে পরার একটা পোষাক নিয়ে আসবার জন্য একজন পরিচারকদের ডেকে আনে।
‘আমার মনে হয় আমি সম্ভবত এখানে অনেক বেশি দিন অতিবাহিত করেছি,’ রো ঝাঁকিয়ে উঠে বলে। তার নুয়ে পড়া লম্বা গোফ আর গা মুছে দেয়ায় টপটপ করে গড়িয়ে পড়তে থাকা পানির ফোঁটায় শীর্ণকায় লোকটাকে একেবারে বিষণ্ণ, মনমরা দেখায়। সবাই বলে যে এ আবহাওয়া ইউরোপের লোকদের খুব একটা সহ্য হয় না এবং আমাদের ভিতরে খুব কম লোকই রয়েছে যারা পরপর দুটো বর্ষাকাল এখানে বেঁচেবর্তে অতিবাহিত করতে পারবে।’
‘সাহস রাখেন। আপনি এখনও সুস্থই আছেন। পৃথিবীর যেকোনো স্থানে এটা ঘটতে পারতো…এমনকি ইংল্যান্ডেও…এবং আপনি যে উদ্দেশ্যে এখানে এসেছেন সেটা এখনও হাসিল হয়নি।’
‘তোমার কথাই সম্ভবত সত্যি। নিকোলাস, তুমি একটা ভালো ছেলে, তোমাকে ধন্যবাদ। আমি কখনও ভুলবো না তুমি কত যত্ন নিয়ে আমার সেবা করেছে, রো কোনোমতে মুখে একটা দুর্বল হাসি ফুটিয়ে বলে কিন্তু সহসা নতুন করে যন্ত্রণার প্রকোপ শুরু হতে তার মুখের মাংসপেশীতে একটা খিঁচুনি উঠে। আমায় এখন একা থাকতে দাও…’ সে কোনোমতে বলে এবং আরো একবার পিকদানির দিকে এগিয়ে যাবার জন্য বিছানা থেকে নিজেকে টেনে তুলে।
*
‘আমি ভেবেছিলাম সন্ধ্যেটা আপনি স্যার টমাসের সাথে অতিবাহিত করার পরিকল্পনা করেছেন?’ জাহাঙ্গীর তার কক্ষে প্রবেশ করে তাকে চুম্বন করার জন্য ঝুঁকতে মেহেরুন্নিসা তার দিকে তাকিয়ে বলে।
