কিন্তু আমি অবশ্য এখনও আমাদের উদ্দেশ্য অর্জনের বিষয়ে হতাশ হইনি। সম্রাট আমাকে তাঁর বন্ধু হিসাবে বিবেচনা করেন এবং আমি যদি ধৈর্য সংবরন করতে পারি হজ্জ্বযাত্রীদের বিষয়ে আমাদের প্রস্তাব সমর্থনে আমি এখনও হয়তো তাকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হব। আমি আপনাকে পুনরায় চিঠি লিখব যখন জানাবার মত–এবং আমার বিশ্বাস অনুকূল খবর থাকবে।
নিকোলাস ব্যালানটাইন মুখ তুলে কৌতূহলী চোখে তাকায়। দারুণ।’ রো মাথা নাড়ে। সত্যি বলতে কি, অসাধারণ। আমি চাই আজ রাতেই যেন চিঠিটা সুরাটের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা হয় যাতে করে এক সপ্তাহের ভিতরে ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া পেরিগ্রিনে এটা তুলে দেয়া যায়। আমরা বরং এখন আমার কক্ষের দিকে যাই যেখানে গিয়ে আমি চিঠিটায় আমার মোহর লাগাতে পারবো।’
মেহেরুন্নিসা জালির ভিতর দিয়ে ব্যালেনটাইনকে চিঠিটা ভাঁজ করে সেটা নিজের থলেতে যত্ন করে রাখতে দেখে। দুই ফিরিঙ্গি তারপরে দবরার থেকে ধীরে ধীরে বের হয়ে যায়। নতুন প্রাণশক্তি আর সংকল্প তাকে জারিত করতে তার চেহারা থেকে একটু আগের ক্লান্তিকর অভিব্যক্তি মুছে যায়। রো তার বন্ধু নয় এই বিষয়টা এখন তাঁর কাছে দিনের আলোর মত পরিষ্কার। তার চেয়েও বড় কথা সে তাচ্ছিল্যের সাথে সম্রাট সম্বন্ধে কথা বলেছে। মেহেরুন্নিসা সাল্লাকে পাশে নিয়ে বহুক্ষণ নিথর হয়ে সেখানে নির্বাক ভঙ্গিতে বসে থাকে।
*
‘লাডলি, প্রথম তিনটা পংক্তি আমায় পড়ে শোনাও।’ মেয়েটা পড়তে শুরু করলে মেহেরুন্নিসা ভাবে, তার মেয়ে, এখন দশ বছর বয়স, তার মতই চটপটে হয়েছে। কবিতা যদিও তাঁর অন্যতম প্রিয় বিষয়, সে মনোযোগ দিতে পারে না। রো’র আবাসিক কক্ষে কি চলছে পুরো সময়টা তার মাথায় কেবল এই চিন্তাই ঘুরপাক খেতে থাকে। ফিরিঙ্গিটার উপরে কীভাবে সে তাঁর চরম প্রতিশোধ নেবে এবং বস্তুতপক্ষে, সেটা নেয়াটা যথার্থ হবে কি না এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে তাঁর প্রচুর সময় অতিবাহিত হয়েছে। তার ক্রোধ প্রশমিত হবার সাথে সাথে সে রো’র চিঠির ব্যাপারে অনেক বেশি যুক্তিগতভাবে চিন্তা করতে পারে। রো, অতীতের যেকোনো দূতের ন্যায়, নিজের নৃপতির কাছে এখানে তার কতটা প্রভাব রয়েছে, মহান লোকদের জীবনের ব্যাপারে কত গভীর তার অন্তদৃষ্টি, তার নিজের দেশের স্বার্থ হাসিলের ক্ষেত্রে সে কত সুন্দরভাবে সবকিছু গুছিয়ে এনেছে, সাফল্য অর্জনের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যর্থতার জন্য সে দায়ী নয়… সেটাই বোঝাতে চেয়েছে… সে এখন যখন অনেকটাই সুস্থির তখন এসবের জন্য সে রো’র আচরণ খানিকটা ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে প্রস্তুত।
সে এরপরেও তার ব্যাপারে রো’র দৃষ্টিভঙ্গি কোনোমতেই উপেক্ষা করতে পারে না। দরবারে বিষয়টা সুবিদিত যে সে ক্ষমতার জন্য লালায়িত, ফিরিঙ্গিটা ঠিক এভাবেই চিঠিতে লিখেছে… কিন্তু দরবারে সে তাঁর বন্ধু আর পরিচিতদের ভিতরে এমন আলোচনা সে উৎসাহিত করছে ব্যাপারটা যদি এমন হয়? পরিস্থিতি ভুল বিশ্লেষণ করায় সে নিজের উপরই বিরক্ত হয়। জাহাঙ্গীরের সাথে রো’র ঘনিষ্ঠতা সে লম্বা একটা সময় ধরে উৎসাহিত করেছে, পুরোটা সময় সে একটা বিষয় খুব ভালো করেই জানতো যে তার স্বামী দূতমহাশয়ের সঙ্গ পছন্দ করেন কিন্তু সেই সাথে তিনি ফিরিঙ্গিটার সাথে যত বেশি সময় অতিবাহিত করবেন দাপ্তরিক বিষয়ের জন্য যা তার কাছে একঘেয়ে মনে হয় তত কম সময় তিনি দিতে পারবেন এবং তাকে দায়িত্ব থেকে খানিকটা মুক্তি দিতে সে আগ্রহী–এবং যোগ্যতার সাথেই সে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম।
সে রোকে কোনোমতেই তাঁর অবস্থান আর সে এখন পর্যন্ত যা কিছু অর্জন করেছে এবং আরো বৃহৎ গৌবর লাভের আকাঙ্খ পোষণ করে এসব কিছু। হীন প্রতিপন্ন করার সুযোগ দিতে চায় না, পারে না। সে এখন যখন বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করছে তখন তার মনে পড়ে মাত্র দু’সপ্তাহ আগে জাহাঙ্গীর যখন তাঁর উজিরকে লাহোর দূর্গের সংস্কার কর্মসূচি সংক্রান্ত নথিপত্র অনুমোদনের জন্য তাঁর কাছে পাঠাতে বলেছিল তখন মাজিদ খানের চেহারায় সে অস্বস্তিকর একটা অভিব্যক্তি লক্ষ্য করেছিল। আরো সম্প্রতি সে হঠাৎ হেরেমে দু’জন বৃদ্ধ মহিলার কথোপকথন শুনে ফেলে– একজন জাহাঙ্গীরের পিতামহের ভগ্নি আর অন্যজন তাঁর আব্বাজানের দূরসম্পকের আত্মীয়সম্পর্কিত বোন–তাঁরা তাঁর পরিবারের প্রভাব নিয়ে খেদ প্রকাশ করছিল। গিয়াস বেগ সাম্রাজ্যের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করে, আসফ বেগ আগ্রা দূর্গের সেনাপতি এবং তার কথা কি বলবো…’ সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারে তার’ বলতে আসলে দুই বৃদ্ধা কার কথা বোঝাতে চেয়েছেন।
তাঁর মেজাজ খোশ করতে সাল্লা দীর্ঘ এক ঘন্টা ধরে তার লম্বা চুল আচড়ে বেনী করে দেয় এবং সেই সময়ের ভিতরেই সে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। রোকে যেভাবেই হোক দরবার থেকে বিতাড়িত করতে হবে।
আর আজই সেই রাত যে রাতে তার পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হবে কি না সে বুঝতে পারবে। সে সহসা উপলব্ধি করে যে লাডলি কবিতার পংক্তি পাঠ শেষ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। চমৎকার। দারুণ হয়েছে।’ মেহেরুন্নিসা হেসে বলে, খানিকটা অপরাধবোধ অনুভব করে যে তাঁর কন্যা কেমন আবৃত্তি করেছে সে বিষয়ে তাঁর কোনো ধারণাই নেই।
