মেহেরুন্নিসা তেপায়ার উপরে দেহের ভর পরিবর্তন করে। রো’র এতবড় স্পর্ধা জাহাঙ্গীর সম্বন্ধে এতটা তাচ্ছিল্য আর পৃষ্ঠপোষকতার ভান করে কথা বলছে? কিন্তু পরিচারক তখনও পড়ছে এবং সে পুনরায় তাঁর মনোযোগ পরিচারকের উপরে নিবদ্ধ করে। প্রতিটা শব্দ, তাঁদের অর্থের সূক্ষতম দ্যোতনা বোঝার চেষ্টা করাটা তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
‘মহামান্য জাঁহাপনা এই চিত্রকর্মটায় আপনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমান করা হয়েছে, যদিও সম্রাট যখন আমাকে এটা দেখান আমি তাকে কেবল এটাই বলেছি যে চিত্রকর তার প্রতিমূর্তি প্রায় জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছে এবং প্রতিকৃতির একত্রীকরণের বিন্যাস নিয়ে কোনো মন্তব্য করা থেকে নিজেকে বিরত রাখি। সম্রাট নিজেকে নিয়ে এতটাই আত্মগর্বে ভুগছিলেন যে তিনি আমার শীতল আবেগহীন উত্তর খেয়ালই করেননি, আমি জানতাম তিনি করবেন না। আমি বস্তুতপক্ষে তাঁর সাথে এতটাই সময় অতিবাহিত করেছি–তিনি আমার সঙ্গ পছন্দ করেন আর আমাকে প্রশ্ন করার বিষয়ে তাঁর কোনো ক্লান্তি নেই–যে তাঁর চরিত্র পর্যালোচনা করার একটা চমৎকার সুযোগ আমি পেয়েছিলাম। আমার মনে হয় যে এখন সময় হয়েছে যখন আমার উচিত তার মানসিক প্রকৃতি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা যাতে করে জাঁহাপনা আপনি যেন বুঝতে পারেন কেন, তুলা, নীল আর সুগন্ধি দ্রব্যের বাণিজ্যে সম্রাট যদিও আমাদের সামান্য কিছু ছাড় দিয়েছেন তারপরেও আরবে হজ্জ্বযাত্রী পরিবহণে ইংরেজ জাহাজগুলোকে অনুমতি দেয়ার ক্ষেত্রে আমাকে এখনও কেন কোনো স্পষ্ট উত্তর দেন নি–আপনার সাথে শেষ যোগাযোগের সময় থেকে আমি জানি যে বিষয়টা আপনার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দেবার উপক্রম করেছে।
‘সম্রাট জাহাঙ্গীর জটিল চরিত্রের অধিকারী একজন মানুষ যার মাঝে আমি অসংখ্য স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করেছি। তিনি কখনও নিঃস্বার্থ, দয়ালু পরোপকারী এবং জাদুকরী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর একটা ক্রিয়াশীল মন রয়েছে, আর অকপটে নিজের ভাবনার কথা অন্যের কাছে প্রকাশ করেন এবং পার্থিব জগত পর্যবেক্ষণে তাঁর অসীম উৎসাহ। সম্প্রতি গ্রামবাসী এক প্রজা যখন খবর নিয়ে আসে যে আকাশ থেকে একটা অতিকায় প্রায় ভষ্মীভূত উল্কাপিণ্ড আগ্রার অনতিদূরে একটা টিলার পাশে এসে আছড়ে পড়েছে, তিনি সাথে সাথে উত্তপ্ত অবস্থায় সেটাকে খুড়ে বের করার আদেশ দেন এবং সেটা থেকে আহরিত গলিত ধাতু দিয়ে তরবারি তৈরি করে সেটার শক্তি পরখ করে দেখার আদেশ দেন। তিনিই আবার সিংহের অন্ত্র পরীক্ষা করে প্রাণীটার সাহসিকতার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় কিনা দেখার জন্য বাদশাহী সনদবলে লোক নিযুক্ত করেন।
‘সম্রাট অবশ্য একই সাথে আবেগপ্রবণ, অস্থির আর মাত্রাতিরিক্ত বদরাগী। তিনি যদিও বেশিরভাগ বিষয়েই সহনশীল, যার ভিতরে ধর্মের বিষয়টাও রয়েছে–যদিও আমার কাছে প্রায়শই মনে হয় যে তিনি নিজে এটা সামান্যই বিশ্বাস করেন–এই তিনিই আবার ক্ষেত্র বিশেষে অদ্ভূতধরনের নিষ্ঠুর। তিনি বাহ্যিক আড়ম্বরের গুরুত্বের প্রতি সবসময়েই আস্থাশীল, নির্যাতন আর মৃত্যুদণ্ডের মত বিষয়কেও একটা জমকালো প্রদর্শনীতে পরিণত করতে সক্ষম। তিনি মনে হয় কখনো-সখনো মানুষকে হাতির পায়ের নিচে পিষ্ট হতে বা জীবন্ত অবস্থায় চামড়া ছাড়ানো দেখতে পছন্দই করেন। তিনি বলেন এগুলো এমন শাস্তি যা সবসময়ে অপরাধের পরিমাপ অনুযায়ী দেয়া হয়। আমার মনে সন্দেহ নেই যে কথাটা সত্যি–অথবা যে তাঁরা শাস্তির উপযুক্ত–কিন্তু তাকিয়ে দেখার সময় আমার পাকস্থলী কেমন যেন মোচড়াতে থাকে। সম্রাট পক্ষান্তরে শাস্তি প্রদানের এইসব পদ্ধতি খুব কাছ থেকে এমনভাবে পর্যবেক্ষণ করেন যেন সেগুলো কোনো অ্যালকেমিস্টের কোনো গবেষণা, চামড়া ছাড়াবার পরে বা শূলবিদ্ধ অবস্থায় একজন মানুষের দেহ থেকে প্রাণ বায়ু বের কতক্ষণ সময় লাগে বা তাদের দেহের আভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালীর কতটা এইসব নির্যাতনের ফলে প্রকাশ পেয়েছে সবকিছু লিপিবদ্ধ করেন।
‘জাহাপনা, আমার কাছে কিন্তু এর চেয়েও মারাত্মক বলে যেটা মনে হয়েছে, সম্রাট একজন মহিলার দ্বারা নিজেকে পরিচালিত করার বিষয়টা অনুমোদন করেছেন। এই মেহেরুন্নিসা, যার সম্বন্ধে আমি আপনাকে আগেই অবহিত করেছি, আমি নিশ্চিত, সম্রাট আর তার শাসিত সাম্রাজ্যের উপরে তার মারাত্মক প্রভাব রয়েছে। সম্রাটের দরবারে এটা সর্বজনবিদিত যে তিনি ক্ষমতার জন্য লালায়িত এবং সবাই এটাও জানে যে তিনি তাঁর স্বামীর সুরা আর আফিমের নেশাকে উৎসাহিত করেন ক্ষমতা প্রদানের ব্যাপারে তাকে আগ্রহী করতে। তাঁর গুরুত্ব যেকোনো অমাত্য–এমনকি সম্রাটের যিনি উজির তার চেয়েও অনেক বেশি। আমি অবশ্য তাকে উপঢৌকন আর প্রশংসাসূচক বার্তা প্রেরণের বিষয়টা খেয়াল করলেও আমি দরবারে কানাঘুষো যা শুনেছি তাতে একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত যে তিনি আমাদের বন্ধু নন। ইংরেজ জাহাজগুলোকে হজ্জ্বযাত্রী পরিবহনের অনুমতি প্রদানের বিষয়ে সম্রাটকে আমি তাঁর অনুমতি প্রদানের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে প্রতিবারই তিনি হাসি মুখে আমায় ধৈর্য ধারণ করতে বলেন। আমার ধারণা এই দীর্ঘসূত্রতার পিছনে সম্রাজ্ঞীর কোনো হাত রয়েছে। অমাত্যরা আমায় বলেছে যে, তিনি নিজে পার্সী বংশোদ্ভূত হলেও, মহিলা সব বিদেশীদের অবিশ্বাস করেন এবং আমাদের উদ্দেশ্যের বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন, তাঁর নিজের মতই সবাইকে স্বার্থান্বেষী মনে করেন, আমার বিশ্বাস। তিনি সেজন্যই, তাঁর সম্রাট স্বামীর কানে ফিসফিস করে পরামর্শ দেন, আমাদের সবাইকে একে অপরের বিরুদ্ধে বিরূপ ভাবাপন্ন করে তুলতে এবং এভাবেই নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি আর সংহত করতে চান। জাহাঙ্গীরের উচিত তাকে এতটা প্রশয় না দিয়ে তাকে তার নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত করা এবং অনধিকার চর্চা থেকে বিরত রাখা।
