‘ইংরেজ দূতমহাশয় আর তার কর্চি। অমাত্যরা সবাই সম্রাটের সাথে হাতির লড়াই দেখতে গিয়েছিল বলে তারা তখন দেওয়ানী আমে একাই ছিল। দূতমহাশয়কে আমি তাঁর কচিকে বলতে শুনেছি যে খোলাখুলি কথা বলা এখনকার মত তাঁদের জন্য নিরাপদ। আমি কৌতূহলী হয়ে উঠি আর তাই অপেক্ষা করি–আপনি জানেন যে আমি তাঁদের ভাষায় পারদর্শী। দূতমহাশয় বেদীর পাশে বেলেপাথরের স্তম্ভগুলোর একটার গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়েছিল আর কর্চি সম্রাটের বেদীর প্রান্তে বসেছিল।
মেহেরুন্নিসার ভ্রু কুঁচকে ওঠে। সম্রাটের বেদীর উপর উপবেশন করাটা আদবকায়দার একটা প্রায় অচিন্তনীয় লঙ্ন কিন্তু দুই ভিনদেশী নিশ্চিতভাবেই ভেবেছিলেন তাঁদের কেউ দেখছে না। বলতে থাকো।
‘দূতমহাশয় বলেন যে তিনি ইংল্যাণ্ডে প্রেরণের জন্য একটা চিঠি মুসাবিদা করতে চান। তিনি বলেন তার প্রভুর সম্রাটের বিষয়ে সত্যি কথাটা জানবার সময় হয়েছে–যে তিনি কেবল গর্বোদ্ধতই না সেই সাথে সম্পূর্ণভাবে একজন রমণীর বশীভূত। তিনি বলেন–আমায় মার্জনা করবেন, মালকিন– যে তার দেশে আপনার মত রমণীকে লজ্জা দেয়ার জন্য ঘোড়ার লাগাম পরিয়ে রাখা হত।’
‘সে আর কি বলেছে?’ ক্রোধে মেহেরুন্নিসার কণ্ঠস্বর কেঁপে যায়।
‘আমি জানি না… আমি সাথে সাথে আপনাকে খুঁজে বের করার জন্য সেখান থেকে চলে আসি। আমি কি কোনো ভুল করেছি?
‘তুমি ঠিক কাজই করেছে। আমার সাথে এসো। দূতমহাশয় যদি এখনও সেখানে থাকে তাহলে তারা কি আলোচনা করছে বোঝার জন্য তোমার সাহায্য আমার প্রয়োজন হবে। সে যদিও ইংরেজি ভাষাটা আয়ত্ত করার জন্য বেশ পরিশ্রম করছে–এমনকি, সাল্লার সাহায্যে, শেকসপিয়ার নামে জনৈক ইংলিশ কবির রচিত চতুর্দশপদী কবিতা পাঠ করলেও যা রো জাহাঙ্গীরকে উপহার দিয়েছিল–মেহেরুন্নিসা খুব ভালো করেই জানে ভাষাটার উপরে তাঁর দখল এখনও সাল্লার চেয়ে অনেক দুর্বল।
মেহেরুন্নিসার আবাসন এলাকা থেকে দুই রমণী দ্রুত হাঁটতে আরম্ভ করে এবং জালির পেছনের ছোট অন্ধকারাচ্ছন্ন কক্ষটার সাথে সংযোগকারী সংকীর্ণ গলিপথ অনুসরণ করে এগিয়ে সামনের দিকে যায়। মেহেরুন্নিসা কয়েক মিনিট পরেই সাল্লাকে পেছনে নিয়ে সন্তর্পণে কক্ষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। গোলাপি বর্ণের রেশমের কাপড় দিয়ে আচ্ছাদিত একটা তেপায়ায় উপবিষ্ট হয়ে, মেহেরুন্নিসা সামনের দিকে ঝুঁকে এসে বেলেপাথরের তৈরি জালিতে খোদাই করা তারকাকৃতি গহ্বরের একটার ভিতর দিয়ে একাগ্রচিত্তে তাকায়। রো, লাল স্যাটিনের আঁটসাঁট কোট পরিহিত একটা লম্বা আর কৃশকায় কাঠামো, সাল্লা যেমন বর্ণনা করেছে, একটা স্তম্ভের গায়ে হেলান দিয়ে, ঠিক সেভাবেই দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিকোলাস ব্যালেনটাইনের সোনালী চুলভর্তি মাথাটা একটা কাগজের উপর ঝুঁকে রয়েছে যার উপরে সে এই মাত্র বালি ছিটিয়েছে। তারমানে, শ্রুতলিপি দেয়ার পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। মেহেরুন্নিসা যারপরনাই হতাশ হয়ে পেছনের দিকে হেলান দিয়ে বসে। তারপরেই সে রো’কে বলতে শুনে, ‘আমাকে লেখাটা আবার পড়ে শোনাও বলা যায় না তুমি হয়তো কিছু লিখতে ভুলে গেছ।
‘মহামান্য সম্রাট, ব্যালেনটাইন শুরু করে, অনুচ্চ স্বরে পড়লেও সাল্লার জন্য সেটাই যথেষ্ট কোনো অপরিচিত শব্দের অর্থ মেহেরুন্নিসাকে ফিসফিস করে বলার জন্য। মোগল দরবারে আমার আগমনের পরে আঠার মাসাধিককাল অতিবাহিত হয়েছে। সম্রাট নিজেকে যে বিপুল বিলাসিতার মাঝে নিম্মজিত করে রাখেন সে বিষয়ে অতীতে বহুবার আমি লিখেছি কিন্তু তিনি গত সপ্তাহেই প্রথম আমার খাতিরে তার ভূগর্ভস্থ কোষাগারের একটা পরিদর্শনের জন্য আমায় নিমন্ত্রণ জানান। আমি সেখানে যা দেখেছি তা ভাষায় প্রকাশ করার জন্য শব্দ খুঁজে পাওয়া কঠিণ–মোমের আলোয় আলোকিত কুঠরিতে পান্না আর রুবি স্তপ হয়ে রয়েছে যার একেকটার আকৃতি আখরোটের চেয়ে বড়, রেশমের গাঁটের সাথে একটা সমুদ্র থেকে যতটা আহরণ করা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন তারচেয়েও অধিক পরিমাণ মুক্তা সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এবং সেই সাথে সূর্যের দীপ্তি ম্লান করে দেয় এমন সব হীরকখণ্ড। আমি অবশ্য নিজের বিস্ময়বিহ্বলতা প্রকাশ না করে এমন ভঙ্গিতে মৃদু মাথা নাড়ি যেন ঐশ্বর্যের এমন বিভার সাথে আমি পরিচিত। কিন্তু সত্যি বলতে, জাহাপনা, সম্রাটের প্রিয় ঘোড়া, হাতি আর শিকারী চিতারও এমন কি আমাদের রাজকীয় খাজাঞ্জিখানার চেয়েও বেশি দামি রত্ন রয়েছে, এবং সবকিছুই সোনার উপর বসান।
‘সম্রাটের কাছে, যে নিজেকে, নিজের সাম্রাজ্যকে আর নিজের রাজবংশকে নিয়ে লুসিফারেরমত গর্বিত, এই চোখ ধাধন ঐশ্বর্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নিজের প্রাচুর্য্য প্রদর্শন করতে পছন্দ করেন এবং আরেকটা বিষয় জানাতে আমার নিজেরই কষ্ট হচ্ছে যে সম্প্রতি তাঁর এই গর্ব নতুন মাত্রা লাভ করেছে। আমি আপনাকে ইতিমধ্যেই জানিয়েছি কীভাবে মানুষ আর জীবজন্তুর প্রতিকৃতির ব্যাপারে মোল্লাদের নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে–আমাকে বলা হয়েছে তার আগে তাঁর আব্বাজানও তাই করেছিলেন তিনি আপনি তাকে আপনার নিজের যে প্রতিকৃতি পাঠিয়েছিলেন সেটা কতটা পছন্দ করেছেন। তিনি তাঁর নিজের প্রতিরূপ অঙ্কন করিয়েছেন। প্রতিকৃতিটা নিয়ে তিনি ভীষণ সন্তুষ্ট যেখানে জনৈক চিত্রকর–বিসি নামে এক লোক–তাকে আমাদের ধর্মীয় পর্বে ব্যবহৃত পানপাত্রের মত দেখতে রত্নখচিত একটা পাত্রে উপবিষ্ট অবস্থায় তাকে অঙ্কন করেছে যেখানে তাঁর মাথার চারপাশে রয়েছে একটা সোনালী জ্যোতিশ্চক্র। তিনি একজন মোল্লাকে একটা কিতাব দান করছেন, জাঁহাপনা, চিত্রকর্মটায় পারস্যের শাহ আর তুরস্কের সুলতানের সাথে আপনাকেও ইচ্ছাকৃতভাবে এককোণে ক্ষুদ্র আর তুচ্ছভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সম্রাট এই চিত্রকর্মে নিজের ঔদ্ধত্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে নিজেকে পৃথিবীর অধিশ্বর বলে দাবি করেছেন।’
