তাঁর ভয় যে জাহাঙ্গীর হয়ত খুররমের উপর বেশি মাত্রায় নির্ভর করতে শুরু করবে এখন পর্যন্ত অমূলক প্রমাণিত হয়েছে। খুররম আর আরজুমান্দের আরেকটা পুত্র সন্তান, দারা শুকোহ্, ভূমিষ্ঠ হওয়ায় তিনি ভীষণ আনন্দিত, কিন্তু তিনি আর খুররম আজকাল যদিও অনেক বেশি সময় একত্রে অতিবাহিত করেন সাধারণত এসময় তারা বাজপাখি উড়াতে বা শিকারে যান, বা তীরন্দাজিতে পরস্পরের দক্ষতা পরীক্ষা করেন নয়তো একসাথে হাতির লড়াই দেখেন। যুবরাজ দাক্ষিণাত্য থেকে ফিরে এসে শাসনকার্যের খুঁটিনাটি বিষয়ে নিজেকে যুক্ত করার সামান্যতম আগ্রহ প্রদর্শন না করায় ব্যাপারটা তাকে আরও বেশি উৎফুল্ল করেছে এবং তাঁর নিজের আকাঙ্খ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অন্যরা অবশ্য তাঁর ক্রমবর্ধমান প্রতিপত্তি খেয়াল করেছে। গত সপ্তাহে রাজকীয় হেরেমে সরাসরি তাকে সম্বোধন করে প্রেরিত প্রায় আধ ডজন আবেদন পত্র এসেছে। জাহাঙ্গীরকে সে শীঘ্রই জিজ্ঞেস করবে যে তাকে ঝামেলার হাত থেকে বাঁচাতে সে কি তার নিজের নামে অধ্যাদেশ জারি করা শুরু করতে পারে। তিনি তাকে খোদাই করা যে পান্নাটা দিয়েছেন যেখানে তাঁর উপাধি, নূর মহল উত্তীর্ণ রয়েছে, সেটা ব্যবহার করবে…।
দরজার পাল্লা দুটো খুলে যায় এবং একটা বাঁশের খাটিয়া নিয়ে চারজন পরিচারক ভেতরে প্রবেশ করে যার উপরে জাহাঙ্গীর চিত হয়ে দু’হাত দু’পাশে ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে রয়েছে, পরিশ্রমের কারণে তাঁদের সবার পা সামান্য বেঁকে রয়েছে। সে তার ভারি, ছন্দোবদ্ধ শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়।
‘খাটিয়াটা ওখানে নামিয়ে, তারপরে আমাদের একা রেখে তোমরা বিদায় নাও, মেহেরুন্নিসা, গবাক্ষ দিয়ে প্রবেশ করা উজ্জ্বল সূর্যালোক থেকে দূরে কক্ষের অন্ধকার কোণের দিকে ইঙ্গিত করে, আদেশ দেয়। পরিচারকের দল তাঁদের একা রেখে কক্ষ ত্যাগ করা মাত্র সে পিতলের পাত্রে রক্ষিত পানিতে রেশমের রুমাল ভিজিয়ে নেয়, তারপরে জাহাঙ্গীরের কাছে এগিয়ে এসে তাঁর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে। কি গভীর ঘুমে লোকটা আচ্ছন্ন হয়ে আছে, সে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, মাস অন্তে বছর অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে আগের চেয়ে একটু মাংসল দেখায় কিন্তু এখনও দেখতে সুদর্শন রয়েছেন। সে তার কপালের ঘাম মুছিয়ে দিতে শুরু করতে, তাঁর জন্য একটা স্নেহার্দ্র অনুভূতি তাকে আপুত করে। সে জীবনে যা কিছু চেয়েছে, এই লোকটা তাকে সবকিছু দিয়েছে–এখনও অনেক কিছু দিতে পারে।
জাহাঙ্গীর নড়াচড়া শুরু করে। সে সহসাই চোখ খুলে তাকায় এবং খানিকটা অনুতাপপূর্ণ ভঙ্গিতে হাসে। আমার মনে হয় আমি আবারও তোমার তৈরি সুরা একটু বেশিই পান করে ফেলেছি।
১.১২ বিষাক্ত লেখনী
‘মালকিন…আপনাকে ঘুম থেকে জাগাবার জন্য আমায় মার্জনা করবেন…’
মেহেরুন্নিসা ঘুম জড়ানো চোখ খুলে সাল্লাকে বিছানার উপরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যেখানে সে ঘুমিয়ে ছিল। আর্মেনিয়ান মেয়েটা জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, যেন সে তার মালকিনের কামরায় দৌড়ে এসেছে। মেহেরুন্নিসা উঠে বসে, পরিত্রস্ত।
কি হয়েছে? সম্রাটের কি কিছু হয়েছে? জাহাঙ্গীর, ঘন্টাখানেক আগে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তাঁর পরীক্ষিত রণহস্তীর একটা–খুনি খাজা নামে বহু ক্ষতচিহ্নের অধিকারী দানবাকৃতি যুদ্ধপ্রবীন এক দাঁত ভাঙা কিন্তু ডান গজদাঁত এখনও ভীষণ কার্যকর একটা পশু–এবং গোয়ালিওরের শাসনকর্তার কাছ থেকে উপহার হিসাবে প্রেরিত এর চেয়েও বিশাল আরেকটা হাতির ভিতরে অনুষ্ঠিত লড়াই দেখতে গিয়েছে। সেও সাধারণত তাঁর সাথে লড়াই দেখতে যায়–সে পর্বতাকৃতি এই প্রাণীগুলোর লড়াই উপভোগ করে যেখানে তাঁরা তাঁদের শক্তির বরাভয়ে একে অপরের বিরোধিতা করছে এবং আন্দাজ করতে চেষ্টা করে কে জিততে পারে–কিন্তু নিজেকে আজ তার খানিকটা পরিশ্রান্ত মনে হচ্ছিল আর তাই সে বিশ্রাম করার সিদ্ধান্ত নেয়।
‘মালকিন, সম্রাটের কিছু হয় নি।
‘কি তাহলে?
সাল্লা ময়ূরের মত দেখতে পাথর বসান একটা চুলেরকটা এগিয়ে দেয় যার কলাই করা পেখমে ছোট ছোট নীলা আর পান্না বসান রয়েছে। এটা মেহেরুন্নিসার প্রিয় চুলেরকাঁটাগুলোর একটা এবং সেদিন সকালের দিকে দেওয়ানী আমের রাজকীয় সিংহাসনের একপাশের দেয়ালে স্থাপিত জালি অন্তঃপটের পেছনে অবস্থানের সময় এটা তার চুলে ছিল যখন লাহোরের শাসনকর্তার কাছ থেকে আগত প্রতিনিধি সেখানকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নতির লক্ষ্যে গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতির প্রতিবেদন পেশ করছিলেন। কাঁটাটা নিশ্চয়ই তখন তার অজান্তে চুল থেকে খুলে মাটিতে পড়েছিল কিন্তু সাল্লা নিশ্চয়ই মামুলি একটা চুলেরকটা খুঁজে পাওয়ার কথা জানাবার জন্য তাকে বিরক্ত করতে আসে নি?
‘জালির পেছনে আপনার আসনের উপর কাঁটাটা পড়েছিল,’ সাল্লা বলতে থাকে। আমি যখন আমার চাদর যা আমি সেখানে ফেলে এসেছিলাম আনবার জন্য গিয়ে আমি এটা খুঁজে পাই, কিন্তু আমি যখন সেখানে ছিলাম তখন আমি আড়াল থেকে হঠাৎ কিছু শুনতে পেয়েছি…’
সাল্লাকে ভীষণ বিব্রত দেখালে মেহেরুন্নিসা নিজের অজান্তে তার হাত চেপে ধরে। আমায় বল তুমি কি শুনেছো।’ তাঁর ব্যক্তিগত পরিচারিকাকে কি এত বিব্রত করেছে জানবার জন্য সে নিজেও যদিও ভীষণ উদ্গ্রীব তারপরেও সে তার কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক রাখে।
