‘অবশ্যই, জাহাপনা। সে যে পরিমাণ ওয়াইন পান করেছে তারপরেও রো’র চোখ সহসা একাগ্র দেখায়। দূতমহাশয়ের আগমনের পর থেকে বিগত মাসগুলোতে, জাহাঙ্গীর প্রতিশ্রুতির বিষয়ে সবসময়ে সতর্ক থেকেছে যদিও সে তার এই রাজা জেমসের জন্য উপহার পাঠিয়েছে, যত্নের সাথে যা বাছাই করা হয়েছে যেন একাধারে আকর্ষণীয় হয় কিন্তু সেই সাথে খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ না হয় যে ইংরেজ শাসক অস্বস্তিবোধ করে, যিনি সঙ্গত কারণেই মোগলদের মত ঐশ্বর্যের অধিকারী নন। সে নিজে যদিও সোনা। মোড়ান স্ফটিকের একটা বাক্স খুব পছন্দ করেছে, ইংরেজদের অন্য উপহারের অনেকগুলোই ইতিমধ্যে নষ্ট হতে শুরু করেছে–চামড়ায় ফাটল ধরেছে সম্ভবত গরমের ফলে হয়েছে, ছবির ফ্রেম থেকে গিল্টির পরত উঠে আসতে শুরু করেছে, এবং সে ইতিমধ্যে জুড়িগাড়ির ছাতার গন্ধযুক্ত আস্তরন। বদলে গুজরাত থেকে নিয়ে আসা সবুজ ব্রোকেড লাগিয়েছে। রো তারপরেও এমন কিছু নিয়ে এসেছে যা অন্য কোনো দূত আগে কখনও নিয়ে আসেনি–বৃহত্তর পৃথিবী সম্বন্ধে তথ্য, যেমন মানচিত্র এবং এই নতুন পৃথিবী’ সেখানে পাওয়া যায় এমন সব উদ্ভিদ আর প্রাণীর বর্ণনা যে বিষয়ে কথা বলতে সে ভীষণ পছন্দ করে। তার আগমনের কিছুদিন পরেই সে জাহাঙ্গীরকে একটা সুতির ব্যাগ উপহার দিয়েছিল যেটায় কিছু শক্ত আর গোলাকৃতি উদ্ভিদের কন্দ ছিল–সে সেগুলোর নাম বলেছিল ‘আলু’–এবং আন্তরিকভাবে দাবি করেছিল যে কন্দগুলো পোড়ালে বা সিদ্ধ করলে খেতে দারুণ হয়।
কর্চি এতক্ষণে ফিরে এসেছে। জাহাপনা। এই সুরাটা–গোলাপজলের সুগন্ধিযুক্ত–সম্রাজ্ঞীর কাছ থেকে প্রেরিত একটা বিশেষ উপহার। তিনি আমাকে বলতে বলেছেন যে তিনি নিজ হাতে এই সুরা প্রস্তুত করেছেন।’
‘চমৎকার। দূতমহাশয় এবার, দেখা যাক আপনি আমার জন্য যে হুইস্কি নিয়ে এসেছিলেন সেটার তুলনায় এই সুরা কতটা জোরালো মাদকতার অধিকারী… এবং আমি চাই আপনি তোক পাঠিয়ে আপনার সেই কচিকে ডেকে নিয়ে আসেন যে আমাকে আরো কিছু ইংরেজি গান গেয়ে শোনাবে…’
*
মালকিন, সম্রাট গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।
মেহেরুন্নিসা তেলের প্রদীপের আলোয় বই পড়া বন্ধ করে চোখ তুলে তাকায়, যদিও এখন ভোরের প্রথম আলো গবাক্ষের ভিতর দিয়ে পরিশ্রুত হয়ে প্রবেশ করছে তার এখন আর এটার প্রয়োজন নেই। আর দূতমহাশয়?
“তিনিও ঘুমে আচ্ছন্ন, মালকিন।
‘সম্রাটকে এখানে তাঁর নিজের কক্ষে বয়ে নিয়ে আসবার জন্য পরিচারকদের আদেশ দাও এবং ইংরেজ ভদ্রলোকের ভৃত্যকে এসে তাকে তার আবাসিকস্থলে নিয়ে যেতে বলো।
রোয়ের সাথে জাহাঙ্গীরের পানাহার পর্বের ভোর পর্যন্ত স্থায়ী হবার এটাই প্রথম ঘটনা না এবং মেহেরুন্নিসা খুব ভালো করেই জানে কর্চি কি বোঝাতে চেয়েছে যখন সে বলেছে যে তার স্বামী ঘুমে আচ্ছন্ন: সম্রাট জ্ঞান হারিয়েছেন। রোর সাথে পানাহারের এসব জমায়েত ক্রমশ আরো বেশি বেশি হতে শুরু করেছে। জাহাঙ্গীর অজুহাত দেখায় যে অনেক আকর্ষণীয় বিষয় রয়েছে তাঁদের আলোচনা করতে হবে, অজস্র ধারণা অনুসন্ধান করতে হবে। তিনি গতকাল তাকে বলেছিলেন রোর কাছে তিনি নতুন ঔষধ নিয়ে তার কিছু পরীক্ষা-চিনার গাছের পাতা গাজিয়ে তোলা পানি ব্যবহার করে–ক্ষতস্থান দ্রুত নিরাময়কারী একটা মলম আবিষ্কারের বিষয়টা ব্যাখ্যা করতে চান। সে এই মলমটা একজন কর্চির উপরে পরীক্ষা করেছে যে শিকারের গিয়ে একটা মর্দা হরিণের শিং এর গুতো খেয়েছে। কিন্তু কয়েক ঘন্টা আগে একটা ক্ষুদ্র জালি পর্দার ভিতর দিয়ে পর্যবেক্ষণ করে সে জানতে পেরেছে যে জাহাঙ্গীর আর রো কিছুক্ষণের ভিতরেই চটুল বিষয়ে আলোচনা শুরু করে, আদি রসাত্মক গান–পার্সী আর ইংরেজি–যা তাঁরা পরস্পরকে শিখিয়েছে গলা ছেড়ে গাইতে থাকে, এবং পাঞ্জা লড়ে শক্তির পরীক্ষার প্রয়াস নেয় যা দৈহিকভাবে অনেকবেশি শক্তিশালী জাহাঙ্গীর অবিকার্যভাবে জিতে।
তাঁদের তখন একজন সম্রাট আর ভিনদেশী শাসকের দূতের চেয়ে এক জোড়া দুষ্ট ছেলে মনে হয়, কিন্তু ইংরেজ রাজদরবারে এমন পানোৎসব সম্ভবত সাধারণ বিষয়। নিজের দরবারের সুর্নিমিত আনুষ্ঠানিকতার তুলনায় সম্ভবত, যেখানে তাকে অবশ্যই একজন মানুষের চেয়েও ক্ষমতা আর ঐশ্বর্যের প্রতিমূর্তি হিসাবে আচরণ করতে হবে, জাহাঙ্গীরের কাছে এটা নিশ্চিতভাবেই আকর্ষণীয়। রো যখন তার উপস্থিতিতে সশব্দে এবং দীর্ঘস্থায়ী বাতকর্ম করে জাহাঙ্গীর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে এবং তাঁর কাঁধ চাপড়ে দেয়। তারা যদিও মাত্রাতিরিক্ত মদ্যপান করে কিন্তু এই আড্ডাগুলো হয়ত খারাপ কিছু না। জাহাঙ্গীরকে এসব শমিত করে এবং, কোনো কোনো রাতে সম্রাটকে তার শয্যা থেকে দূরে সরিয়ে রাখা ছাড়া, তাঁর কাছ থেকে কিছু কেড়ে নিচ্ছে না। সম্রাটের জন্য এসব কারণে সে অনেক কিছু করার সুযোগ পাওয়ায়, বস্তুতপক্ষে উল্টোটা সত্যি। সে অবশেষে প্রচণ্ড মাথা ব্যাথা নিয়ে, ঘুম থেকে জেগে উঠলে সে তখন তার যত্ন নেয়, ব্যাথা দূর করতে চন্দনকাঠ আর ঘৃতকুমারী পাতার মিশ্রিত নির্যাস তার কপালের দু’পাশে ঘষে দেয়।
কখনও কখনও, আগের রাতের পানোৎসবের কারণে চোখ তখনও ঝাপসা হয়ে থাকায়, সে তাঁর উপদেষ্টাদের বৈঠকে আলোচিত বিষয়বস্তুসমূহে খাজনা বৃদ্ধি, তার অমাত্যদের জায়গীর আর খিলাত বিতরণ, এবং তার সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রদেশের শাসকদের প্রয়োজনীয় আদেশ পাঠান মনোনিবেশ করাটা তার জন্য খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তাকে এসব বিষয় সে যখন সুরার প্রভাব মুক্ত থাকে তখনও বিরক্ত করে। সে, অবশ্য, কখনও একটা অধিবেশনও বাদ দেয় না, রাজমহিষীদের প্রেক্ষণিকার জালি অন্ত ওপটের পেছনে একায়ত ভঙ্গিতে বসে সবকিছু শোনে এবং তিনি যদি কখনও বিষয়টা নিয়ে কিছু জানতে চান তাকে স্মরণ করিয়ে দিতে পারবে। সে প্রায় প্রতিদিনই রাজকীয় নথিপত্র পাঠ করার প্রস্তাব দেয় যা তার কাছে ভীষণ বিরক্তিকর বলে মনে হয় এবং সে পুরোটা পাঠ করে বিষয়বস্তুর সারাংশ তাকে জানায় এবং তিনি সাথে সাথে সম্মতি দান করেন, নিজের কাঁধ থেকে কিছুটা দায়িত্ব তার কাঁধে চাপিয়ে দিতে পেরেই তিনি আনন্দিত। সে তার কাছে ঠিক যেমনটা আশা করেছিল, তিনি আজকাল প্রায়ই তাঁর কাছে পরামর্শ চায়, এমনকি কখনও কৌতুক করেন যে বেচারা মাজিদ খান তাঁর উজির যেকোনো দিন বুঝি চাকরিটা হারাবে। প্রভাব আর ক্ষমতার মধ্যবর্তী সীমারেখা খুব একটা প্রশস্ত না, এবং সাম্প্রতিক সময়গুলোতে সে প্রায়ই অনুভব করে রেখাটা সে অতিক্রম করতে শুরু করেছে…
