পর্তুজিগদের বেলায়, তাঁরা তাঁদের যাত্রীদের কাছে তাঁদের প্রভুর প্রতিকৃতি অঙ্কিত–যিশু নামে শ্মশ্রুমণ্ডিত একজন অল্পবয়সী লোক এবং ধুসর মুখের এক কুমারী রাণি যার নাম মেরী–যে অনুমতিপত্র বিক্রি করে জাহাঙ্গীর সেটা দেখেছে। পর্তুগিজ জাহাজগুলো শক্তিশালী আর তাঁদের সশস্ত্র নাবিকেরা জলদস্যুদের ভালোমতই প্রতিরোধ করতে পারে কিন্তু পর্তুগিজরা গোয়ায় তাঁদের বাণিজ্য কেন্দ্রে ক্রমশ আরো বেশি উদ্ধত হয়ে উঠছে। তাদের পুরোহিতেরা হিন্দু আর মুসলমান জনসাধারণ উভয়ের ভিতরেই আগ্রাসী ভঙ্গিতে ধর্মান্তরিতকরণের প্রয়াস চালাচ্ছে এমনকি মক্কায় যাবার জন্য জাহাজের প্রতিক্ষারত হজ্জযাত্রীদেরও তাঁরা প্ররোচিত করার চেষ্টা করেছে যে তাদের বিশ্বাস ভ্রান্ত। পর্তুগিজরা সেই সাথে যাত্রীদের কাছ থেকে পরিবহণের জন্য ক্রমশ বেশি অর্থ দাবি করছে। ইংরেজ রাজা দরবারে একজন দূত প্রেরণ করেছেন এই বাস্তবতা হয়ত তাঁদের নিজেদের দাবির ব্যাপারে নমনীয় হতে সাহায্য করবে।
‘আপনার প্রভুকে জানাবেন আমি তার প্রস্তাব বিবেচনা করে দেখবো এবং সেই জন্য আগামীতে আমরা আলোচনা করবো, জাহাঙ্গীর বলে। সে বেদীর ডানপাশে দাঁড়িয়ে থাকা তূর্যবাদকের উদ্দেশ্যে হাল্কা মাথা নাড়ে এবং লোকটা সাথে তার ব্রোঞ্জের তৈরি বাদ্যযন্ত্র ঠোঁটে রেখে সাক্ষাৎকার পর্ব সমাপ্তির ইঙ্গিতবাহী স্বল্পস্থায়ী একটা আওয়াজ করে। জাহাঙ্গীর উঠে দাঁড়ালে, দূতমহাশয় পুনরায় পা লম্বা করে দিয়ে নিজস্ব রীতিতে সুনির্মিত ভঙ্গিতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে। সে যখন পুনরায় সোজা হয়ে দাঁড়ায় তার লাল মুখ আরও লালচে দেখায় আর তার ব্রোকেডের হলুদ জ্যাকেটের বাহুর নিচে ঘামের গাঢ় বৃত্ত সৃষ্টি হয়। লোকটা কি কোনো কারণে বিচলিত হয়ে রয়েছে নাকি এটা কেবল হিন্দুস্তানের অস্বাভাবিক গরমের ফল?
*
‘আরও ওয়াইন নিয়ে এসো, জাহাঙ্গীর তার কচিকে আদেশ দেয়। রো’র মুখ ঘামে ভিজে চকচক করছে, মাংসপেশী শিথিল–গত তিন ঘন্টা ধরে সে ক্রমাগতভাবে যে বিপুলপরিমাণ সুরা নিঃশেষ করেছে তার ফল। জাহাঙ্গীর পান করার এমন ক্ষমতাসম্পন্ন লোক কখনও দেখেনি, কিন্তু ওয়াইন রো’র রসিকত বোধ ভোঁতা না করে বরং উল্টোই করে বলে মনে হয়। সে যত বেশি পান করে জাহাঙ্গীর তত বেশি তার আলাপচারিতায় আনন্দ লাভ করে, তার আগ্রহী ঠোঁটের মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হতে থাকা তথ্য উপভোগ করে। রো স্পষ্টতই একজন শিক্ষিত মানুষ যদিও সে যেসব পণ্ডিতদের লেখা উদ্ধৃত করতে পছন্দ করে–গ্রীক আর রোমান দার্শনিক, সে বলেছে, তাঁদের অনেকেই প্রায় দু’হাজার বছর পূর্বে মারা গিয়েছেন–জাহাঙ্গীরের কাছে তাঁদের বেশিরভাগই অপরিচিত। তিনি গত চারমাস ধরে দরবারে অতিবাহিত অবস্থান করায় দূতমহাশয়ের পার্সী অনেক উন্নত হয়েছে এবং জাহাঙ্গীর যদিও উল্টো ফলাফল আশা করেছিল কিন্তু দেখা যাচ্ছে ওয়াইন তাকে স্বচ্ছন্দভাষী করে তুলেছে। জাহাঙ্গীর মাত্র গতকালই তাঁর দরবারের এক পণ্ডিতের সাথে তাকে প্রাণবন্ত ভঙ্গিতে যুক্তি পেশ করতে শুনেছে যে পরশ পাথরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা–এমন একটা পদার্থ কেউ কেউ মনে করেন যার অবর ধাতুকে সোনা বা রূপায় পরিণত করার ক্ষমতা রয়েছে। এবং এটা অনন্ত জীবনের রহস্যও ধারণ করে–পুরোপুরি অযৌক্তিক আলাৎপালা। জাহাঙ্গীর ব্যক্তিগতভাবে, এমন কোনো কিছু যা প্রমাণ করা সম্ভব নয় সেসব বিষয়ে সাধারণত সন্দেহপ্রবণ, তার যুক্তির সাথে একমত পোষণ করে।
তাদের সামনের টেবিলের উপরে মানচিত্রের একটা বই খোলা অবস্থায় রয়েছে রো’র ভাষ্য অনুযায়ী যার স্রষ্ঠা মারকেটর নামে জনৈক মানচিত্র-প্রস্তুতকারী, দরবারে উপস্থিত হবার পরপরই জাহাঙ্গীরকে যা সে উপহার দিয়েছিল। রো বইটাকে ‘অ্যাটলাস’ বলে, ব্যাখ্যা করে বোঝায় যা একজন পৌরাণিক পুরুষের নাম যিনি নিজের কাঁধে পুরো পৃথিবীর ওজন বহন করছে প্রচ্ছদের উপরে যা অঙ্কিত রয়েছে। জাহাপনা, আমি জানি সিংহাসনে আরোহণের সময় আপনি “পৃথিবীর অধিকারী” উপাধি গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু দেখেন আসলেই বাইরের পৃথিবী কতটা বিশাল, দূতমহাশয় খানিকটা কৌতূকপূর্ণ কণ্ঠে কথাটা বললেও জাহাঙ্গীর হাসতে বাধ্য হয়। সে মুগ্ধচিত্তে বারবার বইটা নিয়ে বসে, ভারি পাতাগুলো যত্নের সাথে উল্টে সে জীবনে কখনও নামও শুনেনি এমন সব রেখাঙ্কিত এলাকা খুটিয়ে দেখে, পুরোটা সময় তাঁর মাথায় রো’র জন্য প্রশ্ন গিজগিজ করতে থাকে, এই জন্যই সে তাকে আবারও নিজের ব্যক্তিগত নিভৃত কক্ষে পুনরায় আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
‘আপনি নিজ মুখে আমায় যা বলেছেন সেটা অনুসারে, এটা মনে হয় যে স্পেনিশ, ডাচ আর পর্তুগিজরা ইংরেজদের চেয়ে অনেক ভালো ভ্রমণকারী? আপনি অন্য একদিন ম্যাগিলান নামে যে লোকটার কথা বলেছিলেন–প্রথম ব্যক্তি যার জাহাজ পুরো পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেছিল–সে একজন পর্তুগিজ, তাই না?
রো আরেকটু আরাম করে বসতে চেষ্টা করে। তাঁর পা লম্বা আর সরু হওয়ায় বেশিক্ষণ আসনপিড়ি করে বসে থাকাটা তার জন্য কষ্টকর। হ্যাঁ, জাঁহাপনা। এটা সত্যি কথা যে গুটিকয়েক ভিনদেশী অভিযাত্রী সমুদ্রযাত্রায় ভাগ্যের সহায়তা পেয়েছে, কিন্তু আমাদের ইংরেজ নাবিক আর তাঁদের জাহাজ কারো চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আমার দেশের মানুষ সম্প্রতি উত্তর আমেরিকাসের একটা স্থানে প্রথম বসতি স্থাপন করেছে আমাদের মহানুভব রাজা জেমসের নামানুসারে এলাকাটার নাম তাঁরা রেখেছে জেমসটাউন। নিজের প্রত্যন্ত ছোট দ্বীপের গুরুত্ব সম্পকে রো’র অনড় বিশ্বাস জাহাঙ্গীরকে সবসময়ে আমোদিত করে। দূতমহাশয় এতটা উৎসাহের সাথে যে জীবনের কথা বর্ণনা করেন, সাধারণ মানুষের অভ্যেস থেকে শুরু করে দরবারের রীতি রেওয়াজ পর্যন্ত, জাহাঙ্গীরের কাছে সবকিছুই কেমন সেকেলে মনে হয়, যদিও সৌজন্যতাবোধ আর সে রোকে ক্রমশ পছন্দ করতে শুরু করায় এমন কিছু বলা থেকে তাকে বিরত রাখে। ‘আপনি যা কিছু বলেছেন তা যদি সত্যি হয় এবং আপনার দেশ যদি বাস্তবিকই আমার হজ্জযাত্রীদের বহন করার জন্য জাহাজের যোগান দেয় আমি হয়ত আপনার কাঙ্খিত বাণিজ্যিক রেয়াত প্রদানে সম্মত হতে পারি, কিন্তু সেখানে কিছু শর্ত থাকবে।
