তার পেছনে রয়েছে অল্পবয়সী এক তরুণ-বলা যায় সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ–একই রীতির পোষাক পরিহিত কেবল একটাই পার্থক্য তাঁর কাপড়গুলো সব গাঢ় খয়েরী রঙের কোনো উপকরণ দিয়ে তৈরি আর তাঁর মাথায় টুপি নেই। মধ্যম উচ্চতার লোকটার মাথার চুলের রঙ বার্লির মত এবং বার্থোলোমিউ হকিন্সের মত নীল চোখ–যে অতিসম্প্রতি সদ্য লাভ সম্পদে বোঝাই সিন্দুক নিয়ে ইংল্যান্ড ফিরে গিয়েছে জাহাঙ্গীর আক্ষেপ করে–যা এই মুহূর্তে সোনালী সিংহাসনে অধিষ্ঠিত তাঁর নিজের দিকে খানিকটা বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে। তার ডানহাতে রয়েছে লম্বা পায়ের, ধুসর চামড়ার একটা কুকুরের গলায় বাঁধা গলবন্ধনীর সাথে সংযুক্ত দড়ি, কুকুরটা এতটাই শুকনো দেখতে যে জাহাঙ্গীর তার পাজরের প্রতিটা হাড় আলাদা করে গুনতে পারে। দূতমহাশয় থেকে দেখতে খুব একটা আলাদা নয় জন্তুটা।
জাহাঙ্গীরের উজির মাজিদ খানের কাছ থেকে ইঙ্গিত পেয়ে বেদী থেকে দশফিট দূরে দূতমহাশয় দাঁড়িয়ে যায় এবং মাথার টুপি নামিয়ে নিয়ে সেটা ডানবাহুর নিচে গুঁজে দিয়ে একটা সরু পা নিজের সামনে সোজা বাড়িয়ে দিয়ে, অন্য পা ভাঁজ করে এবং কোমর থেকে দেহের উপরের অংশ সামনের দিকে নত করার সময় ডান হাত বৃত্তাকারে আন্দোলিত করে। বিচিত্র একটা অভিবাদন রীতি, এবং তরুণ লোকটা জাহাঙ্গীরের ধারণা যে নিশ্চিতভাবে তার কর্চি একই ভাবে অভিবাদন জানায়। সে হাত নেড়ে তার পণ্ডিতদের একজনকে যে দোভাষীর কাজ চালাবার মত চলনসই ইংরেজি জানে সামনে এগিয়ে যেতে বলবে যখন দূতমহাশয় নিজেই ভাঙা ভাঙা কিন্তু তারপরেও স্পষ্টতই বোধগম্য ভঙ্গিতে পার্সীতে কথা বলতে শুরু করে।
‘মহামান্য সম্রাট, অধমের নাম স্যার টমাস রো। আমি আমার নিজের রাজা, ইংল্যান্ডের প্রথম আর স্কটল্যাণ্ডের ষষ্ঠ জেমসের কাছ থেকে আপনার জন্য শুভেচ্ছা বয়ে নিয়ে এসেছি। শাসক হিসাবে আপনার মহত্বে কথা শুনে তিনি তার দেশ থেকে আপনাকে কিছু উপহার দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। আমি ইতিমধ্যেই এখানে আসবার আগেই কিছু উপহার পাঠিয়ে দিয়েছিলাম এবং আমি নিজে আরো নিয়ে এসেছি–চিত্রকর্ম, রূপার আয়না, চমৎকার পাকা চামড়া, পরিচিত পৃথিবীর মানচিত্র, আমাদের দ্বীপের উত্তরে প্রস্তুতকৃত একটা পানীয় আমরা যাকে হুইস্কি বলি, চারটা চমৎকার ঘোড়া দীর্ঘ সমুদ্র যাত্রার ধকল তাঁরা খানিকটা সামলে নেয়ার পরে যা আমি নিজে মহামান্য সম্রাটকে উপহার দেব এবং আমি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারি তারা আপনার তারিফের যোগ্য এবং আমাদের দেশের এই শিকারী কুকুরটা–আমরা ইংরেজিতে একে গ্ৰেহাউন্ড বলি। পৃথিবীতে এর চেয়ে দ্রুতগামী কুকুর আর হয় না। রো এবার তরুণের দিকে ঘুরে তাকায়, যে ঠিক তার ডান কাঁধের পেছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অল্পবয়সী লোকটা এবার সামনে এগিয়ে আসে এবং কুকুরের গলা থেকে দড়িটা খুলে নেয়। জাহাঙ্গীর ভেবেছিল ভিনদেশী সারমেয় বুঝি দৌড়ে পালাবে কিন্তু এই মুহূর্তের জন্য নিশ্চয়ই তাকে যত্নের সাথে প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। জন্তুটা কয়েক পা সামনে এগিয়ে এসে নিজের ডান থাবা অবিকল রোয়ের মত সামনে বাড়িয়ে দিয়ে মাথা নিচু করে, দূতমহাশয়ের নিজস্ব অভিবাদন রীতি অনুকরণ করে।
‘আমার দরবারে আপনাকে স্বাগতম। আপনার প্রভুকে তার উপহার সামগ্রীর জন্য আমার তরফ থেকে তাকে ধন্যবাদ জানাবেন। জাহাঙ্গীর তাঁর কচিদের একজনকে কুকুরটা সরিয়ে নেয়ার জন্য ইঙ্গিত করে। আমি বিশ্বাস করি দূর্গে আপনার বাসস্থান আরামদায়ক হবে এবং আগামী দিনগুলোতে আশা করি আপনার সাথে নানা বিষয়ে আরো আলোচনা হবে।
রোকে চোখেমুখে খানিকটা বিভ্রান্তি ফুটে উঠলে অল্পবয়সী লোকটা সামনে এগিয়ে এসে ফিসফিস করে তার কানে কিছু একটা বলে। দূতমহাশয়কে সম্মতির ভঙ্গিতে মাথা নাড়তে দেখে সে বলে, জাহাপনা, আমার প্রভুকে মার্জনা করবেন। তিনি সামান্য পার্সী শিখেছেন, আপনাকে সম্বোধন করার জন্য যা যথেষ্ট–এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো করে শিখবেন বলে আশা রাখেন–কিন্তু ভাষাটা তিনি এখনও খুব সামান্যই বুঝতে পারেন। আমি তার দোভাষি এবং পথসঙ্গী। অধমের নাম নিকোলাস ব্যালেনটাইন। দূতমহাশয় আপনার সহৃদয়তার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ দিয়েছেন। তাঁর বসবাসের ব্যবস্থা সত্যিই আরামদায়ক। তিনি আপনার সাথে আলোচনার জন্য তিনি অপেক্ষা করবেন যখন তিনি আশা করেন আপনার বিশাল সাম্রাজ্যের সাথে আমাদের বাণিজ্যের অভিপ্রায় আপনি সহানুভূতির দৃষ্টিতে বিবেচনা করবেন। তার ইচ্ছা আমি আপনাকে বলি যে আমরা কেবল আমাদের নিজেদের পণ্যই আপনার কাছে বিক্রি করবো না সেই সাথে আমাদের জাহাজ আপনার সাম্রাজ্য থেকে হজ্জযাত্রীদের আরবেও পৌঁছে দিতে পারবে। আমরা দ্বীপের অধিবাসী আর আমাদের জাহাজ পৃথিবীতে শ্রেষ্ঠ বলে বিবেচিত হয়। জাহাজগুলো বিশাল সমুদ্র অনায়াসে অতিক্রম করতে সক্ষম এবং আমাদের কামানগুলো অন্য যেকোনো জাতির জাহাজ ধ্বংস করতে পারদর্শী। জাঁহাপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, গত বছরের কথা, আপনার উপকূলের কাছেই পর্তুগিজরা ইংরেজদের দুটো জাহাজ আক্রমণ করার মত ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছিল। আমরা তাদের ডুবিয়ে দিয়েছিলাম।
জাহাঙ্গীর বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকে–ভিনদেশি যুবকের মুখে প্রায় নিখুঁত ফার্সী ভাষা শুনেই কেবল নয় সেই সাথে স্পষ্টভাবে প্রস্তাব পেশ করতে দেখে সে বিস্মিত হয়েছে। একজন মোঘল–বা বস্তুতপক্ষে একজন পার্সী–প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে আরও অনেকবেশি সময় গ্রহণ করতো। কিন্তু ইংরেজ রাজা তার উপহার সামগ্রী ছাড়াও যে আরও কিছু সহায়তা করতে আগ্রহী সেটা স্পষ্ট হয়ে ভালোই হয়েছে। মুসলিম হজ্জযাত্রীদের গুজরাতের বন্দর থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে তাদের যাত্রার প্রথম পর্যায়ে সাগর অতিক্রম করে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে এতদিন পর্যন্ত আরব আর পর্তুগিজ জাহাজগুলো নিজেদের ভিতরে কার্যত একচেটিয়া ব্যবসা করে এসেছে। আরব জাহাজগুলো অধিকাংশ সময়েই গভীর সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী হয় না–মাত্র তিন সপ্তাহ আগেই তিন যাত্রী নিয়ে একটা জাহাজ ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যেতে জাহাজের সবার সলিল সমাধি ঘটেছে। আর আরব নাবিকেরা হজ্জযাত্রীদের জাহাজ আক্রমণকারী জলদস্যুদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারে না।
