এমন নয় যে সে কেবল এসব গতানুগতিক বিষয়েই সাহায্য করতে পারবে। সে ইতিমধ্যে জটিল সিদ্ধান্তের কারণে জাহাঙ্গীরের উপরে চেপে বসা দুশ্চিন্তার ভার উপলব্ধি করতে পেরেছে। সে যদি সাথে সাথে আবেগ কিংবা প্রণোদনার বশে কাজ না করে–যার জন্য সে প্রায়শই অনুতপ্ত হয়–সে প্রায়ই সেগুলো ফেলে রাখে, এবং বিশেষ করে সে যখন হতবুদ্ধি বা উদ্বিগ্ন থাকে মনকে প্রশান্ত করতে সে সামান্য আফিম আর সুরার আশ্রয় নেয়। সে তাঁর আব্বাজানের কাছে এবং জালি পর্দার পেছন থেকে জাহাঙ্গীরের উপদেষ্টাদের বৈঠকের আলোচনা শুনে রাজকীয় দপ্তর পরিচালনার ব্যাপারে অনেক কিছু জেনেছে বলে দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে পারবে… এবং তাঁর কাছে এটা কেবল একটা দায়িত্ব না বরং গভীর সন্তুষ্টির বিষয়।
জাহাঙ্গীরের উচ্চগ্রামের হাসিতে তাঁর ভাবনার জাল ছিন্ন হয়। খুররম নিশ্চয়ই তাকে আমোদিত করার মত কিছু একটা বলেছে এবং তিনি তাঁর পুত্রের কাঁধ চাপড়ে দিচ্ছেন। খালি চোখে দেখলে একটা সুখী পারিবারিক দৃশ্য বলে মনে হবে কিন্তু মেহেরুন্নিসার কাছে সহসাই এই দৃশ্যটা অনেক অশুভ কিছু একটা সম্ভাবনা উপস্থাপন করে এবং অনেক আগেই এটা বুঝতে না পারার জন্য সে নিজেরই উপরেই ক্রুদ্ধ হয়ে উঠে। তাকে জীবনে আরো একবার অপেক্ষা আর পর্যবেক্ষণ করতে হবে কিন্তু নিজের স্বার্থের ব্যাপারে তাকে সব চেয়ে বেশি দৃষ্টি রাখতে হবে। জাহাঙ্গীরের কাছে অন্য কেউ না বরং সে নিজে কতটা গুরুত্বপূর্ণ জাহাঙ্গীর যেন সেটা বুঝতে পারে তাকে এটা প্রথমে নিশ্চিত করতে হবে।
*
‘জাহাপনা, ইংল্যান্ড থেকে আগত দূত দেওয়ানি আমের বাইরে অপেক্ষা করছেন,’ শরতের এক পড়ন্ত বিকেলবেলা মেহেরুন্নিসার সাথে নিজের একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষে বসে থাকার সময় কর্চি এসে বলে।
‘চমৎকার। আমার পরিচারকদের আসতে বলো। তাঁর পরিচারকেরা তাকে সজ্জিত করার কাজ শুরু করলে সে মুচকি হাসে। সে এই বৈঠকের জন্য খানিকটা কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করেছিল। মোগল রাজদরবারে আট সপ্তাহ আগে সংবাদ আসে যে সুরাট বন্দরে ইংল্যান্ড থেকে একজন দূত এসেছে। আগ্রা অভিমুখে দূত মহাশয়ের অগ্রসর হবার গতি মন্থর হওয়ায় তিনি উপহার সামগ্রী আগেই প্রেরণ করেছিলেন। উপহার সামগ্রীগুলোর একটা, উঁচু চাকার উপরে প্রকাণ্ড তরমুজের আকৃতির গিল্টি করা একটা অদ্ভুত দর্শন জুড়ি গাড়ি–জাহাঙ্গীর আগে কখনও এমন কিছু দেখেনি–তাকে ভীষণ প্রীত করে যদিও লাল মখমলে ছত্রাকের দাগ রয়েছে–নিঃসন্দেহে প্রত্যন্ত দ্বীপ যেখান থেকে দূতমহাশয় লবণাক্ত সাতসেঁতে জাহাজে দীর্ঘ ভ্রমণ শুরু করেছিলেন তার ফলে এমনটা হয়েছে। জুড়িগাড়িটা মেহেরুন্নিসাকেও পুলকিত করেছে এবং সে তাকে সেটা উপহার দিয়ে নিজের কারিগরদের নির্দেশ দিয়েছে হুবহু আরেকটা জুড়িগাড়ি তার জন্য তৈরি করতে। কিন্তু তাকে তার আগে জানতে হবে গাড়িটা কীভাবে টেনে নেয়া হবে–ষাড় নাকি ঘোড়া দিয়ে, আর কীভাবে তাঁদের গাড়ির সাথে জুড়ে দেয়া আর নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
‘এই দূতমহাশয় কি অভিপ্রায় বলে আপনার মনে হয়?’ জাহাঙ্গীর একটা লম্বা আয়নায় নিজেকে খুটিয়ে দেখার সময় মেহেরুন্নিসা তাকে জিজ্ঞেস করে।
‘আমার ধারণা, পর্তুগিজ আর ডাচদের মত বানিজ্যের সুবিধা। আমি সুরাটে তার দেশের লোকদের একটা ছোট ঘাঁটি স্থাপন করার এবং কয়েকটা মৌলিক দ্রব্য রপ্তানির অনুমতি দেয়ার পর থেকেই তাঁরা নীল, কেলিকোর সাথে সাথে মূল্যবান রত্নপাথর আর মুক্তার মত দামি সামগ্রী কেনাবেচা করার অধিকারের জন্য আমার কাছে অনুরোধ করছে। আমি তাদের সিদ্ধান্ত জানাতে দেরি করছিলাম, তাদের দেশের শাসক এখন তাই তাদের পক্ষ সমর্থন করার জন্য কাউকে প্রেরণ করেছেন।
‘তাঁদের প্রস্তাবে দ্রুত রাজি না হয়ে আপনি বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন। আমি যা শুনেছি তাতে মনে হয় এইসব ভিনদেশী বণিকেরা ক্রমশ ধৃষ্ট, ঝগড়াটে হয়ে উঠছে এবং আমাদের রাস্তায় নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে আর স্থানীয় লোকদের অপমান করছে।
‘বাণিজ্য সম্পদ বৃদ্ধি করে। কিন্তু আমি তোমার সাথে একমত। তাঁদের অবশ্যই কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।’
জাহাঙ্গীর পনের মিনিট পরে দর্শনার্থীদের জন্য নির্ধারিত দেওয়ানি আমে তূর্যধ্বনির মাঝে প্রবেশ করে এবং সিংহাসনে উপবিষ্ট হয়, তার প্রধান উপদেষ্টা আর অমাত্যরা বেদীর নিচে উভয়পাশে দলবদ্ধভাবে এবং খুররম সম্রাটের খুব নিকটের সম্মানজনক স্থানে অবস্থান নেয়।
তূর্যধ্বনি আর দামামার গুরুগম্ভীর শব্দের আরেকদফা সুতীব্র ঝঙ্কার সহযোগে দূতমহাশয়ের আগমন ঘোষিত হয়। জাহাঙ্গীর উচ্চস্বরে হেসে ওঠা থেকে অনেক কষ্টে নিজেকে নিবৃত্ত করে। একটা দীর্ঘদেহী অবয়ব যার গাঢ় বেগুনী রঙের সংক্ষিপ্ত, ঢোলা পাজামার মত দেখতে পোষাকটা, চিরে ফালা ফালা করা হয়েছে নিচের উজ্জ্বল লাল কাপড় প্রকাশ করতে এবং সেটা আবার হাঁটুর উপরে লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা নিচে তাঁর ভীষণ সরু দুটো পা ধুসর একটা উপকরণ দিয়ে আবৃত ধীরে ধীরে বেদীর দিকে এগিয়ে আসে। ব্রোকেডের একটা উজ্জ্বল হলুদ রঙের আঁটসাট জ্যাকেট কুঁচকির ঠিক উপরে শক্তভাবে সুচ্যগ্র হয়ে শেষ হতে তার চূড়ান্ত কৃশতার বিষয়টাকে গুরুত্ব প্রদান করেছে। লোকটা জাহাঙ্গীরের কাছাকাছি আসতে তাঁর বাকান পালকশোভিত উঁচু কিনারাযুক্ত টুপির নিচে একটা টকটকে লাল মুখ দেখতে পায়–ধুসর ত্বকের উপরে সূর্যের আলোর প্রভাব?–তার গলার চারপাশে শক্ত দেখতে সাদা উপাদানের তৈরি একটা চওড়া বৃত্ত সবকিছুকে আরও বেশি চমকপ্রদ করে তুলেছে। তার কাঁধের উপরে পড়ে থাকা খয়েরী চুল পাতলা হয়ে এসেছে কিন্তু সেটা পুষিয়ে দিয়েছে কোঁকড়ানো গোফের বাহার। অদ্ভুতদর্শন এই লোকটার বয়স আন্দাজ করা কঠিন কিন্তু জাহাঙ্গীর অনুমান করে লোকটার বয়স ত্রিশের কোটার শেষের দিকে।
