খুররম তাঁর দেহরক্ষীদের নিয়ে অস্থায়ী শিবির পেছনে ফেলে নদীর তীর বরাবর সামনের দিকে এগিয়ে যায় যা দু’পাশের পাহাড় ক্রমশ উঁচু এবং চারপাশ থেকে আরও ঘিরে আসায় প্রতিমুহূর্তে আরও সংকীর্ণ হয়ে আসছে। সহসা গাছের আড়াল থেকে গুলি বর্ষণের শব্দ ভেসে আসে এবং দেহরক্ষীদের একজন কপালে গাদাবন্দুকের তিলক নিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। নদীতে বিদ্যমান একটা বাঁক ঘুরতেই, খুররম সামনে গাছের কাণ্ড ফেলে তৈরি করা একটা অবরোধক দেখতে পায় যার পেছন থেকে কয়েকজন তবকী গুলি করছে। তাঁর সামনে পথটা এতটাই সংকীর্ণ যে সে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়ে সরাসরি অবরোধক অভিমুখে ঘোড়া হাকালে বন্দুকের গুলি তার চারপাশের বাতাস কেটে বের হয়ে যায়। অবশ্য, ভাগ্য তার সহায় থাকে এবং সে আর তার বাহন কালো ঘোড়াটা কোনো আচড় ছাড়াই গাছের গুঁড়ির তৈরি অবরোধক লাফিয়ে অতিক্রম করে। প্রতিরোধকারীরা প্রায় সাথে সাথে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে এবং চারপাশের গাছপালা অভিমুখে পালিয়ে যায়। কিন্তু একজন যোদ্ধা, যার গায়ের কৃষ্ণবর্ণ ত্বক আর মুখাবয়বের বৈশিষ্ট্যের কারণে তাকেও মালিক আম্বারের মতই আবিসিনিয়ান বংশোদ্ভূত বলে মনে হয়, গাছের গুঁড়িতে পা আটকে গিয়ে হাত পা ছড়িয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে। তাকে জীবন্ত বন্দি করো!’ খুররম চিৎকার করে উঠে। তাঁর দু’জন দেহরক্ষী সাথে সাথে তাঁর আদেশ পালন করতে নিজেদের ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে মাটিতে নেমে কৃষ্ণবর্ণের পরিশ্রান্ত লোকটার দু’হাত দু’পাশ থেকে চেপে ধরে।
‘লোকটাকে আমার কাছে নিয়ে এসো, খুররম আদেশ দেয়। তারা তাই করে, তাঁর সামনে তাকে জোর করে হাঁটু মুড়ে বসতে বাধ্য করে। মালিক আম্বার কোথায়? খুররম দরবারে এবং বয়োজ্যেষ্ঠ আধিকারিকদের সাথে আলোচনার সময় ব্যবহৃত পার্সী বদলে হিন্দিতে প্রশ্নটা করে।
আপনাকে যদি বন্দি করা হতো তাহলে আপনি কখনও আপনার সেনাপতির অবস্থানের কথা বলতেন না এবং আমিও বলবো না। কিন্তু সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে আড়চোখে একবার উপত্যকার কিনারের দিকে তাকাতে নিজের অজান্তেই সে সত্যি কথা প্রকাশ করে ফেলে। সে তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতে নুড়িপাথরে ভর্তি পাহাড়ী ঢলের শীর্ষদেশে কয়েকটা অবয়ব দেখতে পায়। এই উপত্যকা থেকে বের হবার একটা পথ সেখানে রয়েছে, তাই না?
অবয়বগুলো দেখতে পেয়ে লোকটা অনেকটাই শমিত হয়েছে, এবং প্রশ্নের উত্তরে বলে, “আপনি যদি গাছের ডালপালা দিয়ে আমাদের তৈরি মইয়ের ব্যবস্থাকে বাইরে বের হবার পথ বলতে চান, তাহলে হ্যাঁ আছে। কিন্তু ব্যবস্থাটা আপনার কোনো কাজে লাগবে না। ঘোড়া মই ব্যবহার করতে পারবে না এবং আমাদের সেনাপতি আর তার সাথে যেসব সৈন্যরা রয়েছে তাদের জন্য উপরে আগে থেকেই ঘোড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং আপনি পিছু ধাওয়া করার কোনো প্রচেষ্টা নেয়ার অনেক আগেই তারা নাগালের বাইরে চলে যাবে।
‘সে যা বলেছে সেটার সত্যতা যাচাই করে দেখো, খুররম তার দেহরক্ষীদের উদ্দেশ্যে বলে, কিন্তু হুশিয়ার। সামনে আরও আক্রমণকারী ওঁত পেতে থাকতে পারে।’
*
খুররম সেদিন সন্ধ্যাবেলা আরজুমান্দের সান্নিধ্যে শুয়ে থাকে। তার উরুর ক্ষতটা ততটা মারাত্মক নয় এবং সেখানে এখন সাদা সুতি কাপড়ের পট্টি বাধা রয়েছে আর সেও গোসল করে পরিচ্ছন্ন হয়েছে। তার লোকজন বাইরে দারুণ হৈ-হট্টগোলের মাঝে নিজেদের বিজয় উদযাপন করছে। সে কিছুটা সময় তাঁদের সাথে অতিবাহিত করেছে তারপরে হেকিমের তাবুতে গিয়ে আহতদের পরিচর্যার বিষয়ে খবর নিয়ে অবশেষে আরজুমান্দের কাছে ফিরে এসেছে। সেনাপতি হিসাবে তার প্রথম একক অভিযানে বিজয়ের আনন্দে যুদ্ধে আহত সৈন্যদের কষ্ট আর আবিসিনিয়ান যোদ্ধা যে সত্যি কথাই বলেছে–মালিক আম্বার আসলেই পালিয়ে গিয়েছে, এই তথ্য খানিকটা কালিমা লেপন করেছে। অবশ্য যুদ্ধবন্দি আর নিহত সৈন্যদের লাশ গণনা করে একটা বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে সে নিজের সাথে খুব বেশি হলে কয়েক’শ যোদ্ধা নিয়ে যেতে পেরেছে। আহমেদনগরের সুলতানের সেনাবাহিনী পরাস্ত হয়েছে। তাকে এখন শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দেনদরবার করতে হবে। মোগল বিজয় অর্জিত হয়েছে।
*
আগ্রা দূর্গের পাশে যমুনা নদীর তীরে খুররমের সেনাবাহিনী শ্রেণীবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান রয়েছে। অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে ইস্পাতের বর্মসজ্জিত রণহস্তির সারি সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত–যেহেতু এটা যুদ্ধের নয় উৎসবের সময়–আজ তাদের গজদাতে কোনো তরবারি সংযুক্ত করা হয়নি, যা তাঁদের মাহুতেরা সোনালী রঙ করে দিয়েছে। কমলা আর লাল রঙের পাগড়ি পরিহিত রাজপুত রক্ষীবাহিনী পরিবেষ্টিত অবস্থায় সোনালী রঙ করা শিঙের সাদা ষাড় দিয়ে টেনে নিয়ে আসা মালবাহী শকটগুলোয় রয়েছে. খুররমের বাহিনীর দখল করা ধনসম্পদ ভর্তি বাক্স।
খুররম নিজেও একেবারে সামনের সারির সেনাপতিদের থেকে বিশ কদম আগে তাঁর কালো স্ট্যালিয়নে প্রাণীটা যুদ্ধক্ষেত্রে দারুণ সাহসিকতার সাথে তাকে সহযোগিতা করেছে উপবিষ্ট অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। সোনালী রঙের আনুষ্ঠানিক মাথার সাজ আর সবুজ মখমলের ভারি পর্যাণের কাপড় যা প্রায় মাটি ছুঁইছুই করছে ঘোড়াটা অভ্যস্ত না হওয়ায় থেকে থেকেই অস্থির ভঙ্গিতে নড়াচড়া করছে আর মাথা ঝাঁকাচ্ছে। শান্ত হও বাছা, খুররম বিড়বিড় করে বলে, জন্তুটার ঘামে চিকচিক করতে থাকা গলায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেয়। তোমার উচিত আমাদের নিরাপদে ফিরে আসা লোকদের উদ্যাপন করতে এবং আমাদের বিজয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে দেয়া। সহসা দূর্গপ্রাকারের পুরোটা দৈর্ঘ্য জুড়ে অসংখ্য ক্র্য ধ্বনিত হতে জাহাঙ্গীর সেখানে আবির্ভূত হয়ে হাত নেড়ে বিজয়ী মোগল বাহিনীকে স্বাগত জানায়।
