খুররম এরপর যখন খুব কষে লাগাম টেনে ঘুরতে চেষ্টা করে তাঁর প্রথম প্রতিপক্ষকে পুনরায় আক্রমণ করতে, আরেকজন শত্রু তার লম্বা বর্শা দিয়ে প্রাণপনে তাকে ধাক্কা দেয়। বর্শার ফলা তার বুকের বর্মে বাধাপ্রাপ্ত হয় এবং ভিতরে প্রবেশ না করে পিছলে সরে যায় কিন্তু এত প্রবল শক্তিতে আঘাতটা করা হয়েছিল যে, সে ঘোরার সময় আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ায়, খুররম তার ঘোড়র উপর থেকে একপাশে ছিটকে গিয়ে হুড়মুড় করে নদীর কিনারের মাটিতে আছড়ে পড়ে। সে নিচে থেকে উপরের দিকে তাকিয়ে দেখে বর্শাধারী অশ্বারোহী পুনরায় তার দিকে বর্শা তাক করেছে। সময় মনে হয় যেন থমকে থেমে গিয়েছে এবং সহসাই তার মনে হয় আরজুমান্দকে তার আবার দেখতে খুব ইচ্ছা করছে এবং সে যদি অশ্বারোহীর গতিপথ থেকে নিজেকে সরিয়ে না নেয় তাহলে সে আর কোনোদিনই তাকে দেখতে পাবে না। সে একেবারে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে থাকে, বস্তুতপক্ষে অশ্বারোহী প্রাণঘাতি আঘাতের জন্য বর্শা ইতিমধ্যেই পিছনে নিয়ে গিয়েছে। সে তারপরে পানির মাঝে আর নুড়িপাথরের উপর দিয়ে গড়িয়ে একপাশে সরে যায়। সে গড়িয়ে সরে যাবার ভিতরেই কোমরের পরিকর থেকে ছুঁড়ে মারার জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত করা একটা খঞ্জর টেনে বের করে এবং প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে সেটা ছুঁড়ে মারে। খঞ্জরটা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হলেও শত্রুর ঘোড়ার পশ্চাদ্ভাগে আঘাত হানলে জম্ভটা পিছনের পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পিঠের আরোহীকে পিছনের দিকে ছিটকে ফেললে বিরাট শব্দ করে সে পানিতে অবতরণ করে।
খুররম চার হাতপায়ের উপর ভর করে নদীর অগভীর স্থানের ভিতর দিয়ে বাতাসের অভাবে খাবি খেতে থাকা লোকটা কাছে যায় এবং তার উপরে নিজেকে ছুঁড়ে দেয়। সে তার গলা আঁকড়ে ধরে, হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে কণ্ঠার হাড়ে ধাক্কা দেয় আর শক্ত করে চেপে রাখে যতক্ষণ না সে লোকটার ভিতর থেকে জীবনের সব ধরনের চিহ্ন বিলুপ্ত হয় এবং তাঁর দেহটা অসাড় হয়ে পড়ে। লাশটা একপাশে সরিয়ে রেখে, খুররম অনেক কষ্ঠ করে নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ায় এবং টলমল করতে করতে নদীর পানি থেকে উঠে আসে, তাঁর পরনের কাপড় থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে এবং পায়ের নাগড়া পানিতে বোঝাই, তারপরেও প্রাণে বেঁচে রয়েছে বলে ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেয়। সে পানি থেকে উঠে আসার সময়েই তার এক দেহরক্ষীকে তাঁর কালোর ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। নদীর তীরে তাঁর দেহরক্ষীদের অন্তত পাঁচজনের দেহ নিথর হয়ে পড়ে রয়েছে যখন তাঁদের দু’জন সহযোদ্ধা আরেকজনের বাহুর গভীর এক ক্ষতস্থান সেলাই করতে সাহায্য করছে, এক তরুণ রাজপুত, বেচারা দাঁতে দাঁত চেপে রেখে ক্ষতস্থান সেলাই করার সময়ে যন্ত্রণায় চিৎকার করা থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে। খুররম অবশ্য ঘোড়ার পিঠে পুনরায় আরোহণ করে চারপাশে তাকিয়ে দেখে খুশি হয় যে তার নিজের লোকদের চেয়ে তার শত্রুদের অনেক বেশি মৃতদেহ পড়ে রয়েছে এবং তাঁরা পশ্চাদপসারণ করে, যুদ্ধক্ষেত্রের এই অংশটা মোগলদের অনুকূলে পরিত্যাগ করেছে। মালিক আম্বারের লোকেরা কোথায় গিয়েছে?
নদীর তীর বরাবর উপত্যকার শেষপ্রান্তের দিকে তাদের আরো সঙ্গীসাথীদের নিয়ে পশ্চাদপসারণ করেছে।’
‘আমরা কি অবরোধকের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছি?
‘হ্যাঁ, যুবরাজ, কামরান ইকবাল প্রশ্নের উত্তর দেয়, সে দ্রুত শ্বাস নিতে নিতে এই মাত্র এসে উপস্থিত হয়েছে। কয়েকটা স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও আমরা সহজেই তাদের পরাস্ত করেছি।’
‘বেশ, পশ্চাদপসারণকারীদের তাহলে পিছু ধাওয়া করা যাক, কিন্তু হুশিয়ার। আগুন নিভতে শুরু করেছে আর ধোয়ার আড়াল দ্রুত সরে যাচ্ছে। আমরা এখন অনেক বেশি দৃশ্যমান আর তবকি এবং গাছের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তীরন্দাজদের কাছে আমরা এখন অনেক সহজ নিশানা। আমরা তাই দ্রুত অগ্রসর হবো আর পুরোটা সময় নদীর তীর অনুসরণ করবো যেখানে সামান্য হলেও কিছুটা প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
খুররম কথা বলার মাঝেই গোড়ালি দিয়ে তাঁর ঘোড়ার পাঁজরে আবারও গুতো দেয় এবং নদীর তীর বরাবর এগিয়ে যাওয়া শুরু করে। সে আর তার লোকজন অচিরেই যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে থাকা তীরন্দাজ আর পদাতিক সৈন্যদের একটা দলকে আক্রমণ করে। সবাই নিজেদের অস্ত্র ফেলে দেয় কিন্তু একজন তীরন্দাজ সম্ভবত মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই অবনত হয় আর খুররমের দিকে ধনুক তাক করে। খুররমের দেহরক্ষীদের একজন তাঁর পিঠে তরবারির আড়াআড়ি এক কোপ বসিয়ে দিয়ে তাকে মাটিতে ফেলে দেয় কিন্তু তার আগেই সে তার কালো পালকযুক্ত তীরে মৃত্যুর মন্ত্র দিয়ে যুবরাজের দিকে নিক্ষেপ করে। তীরটা তাঁর গিল্টি করা পর্যাণে বিদ্ধ হবার আগে তাঁর উরুতে আচড় কেটে যায়। খুররম কোনো ব্যাথা অনুভব করে না কিন্তু বেশ বুঝতে পারে তার পা বেয়ে রক্ত পড়তে শুরু করেছে। সে বিষয়টা পাত্তা না দিয়ে আরও কয়েকশ গজ ঘোড়া নিয়ে সামনে এগিয়ে যায় যতক্ষণ না একটা ফাঁকা জায়গায় স্থাপিত কয়েক সারি তাবুর কাছে এসে পৌঁছে। পুরো এলাকাটা পরিত্যক্ত মনে হয় এবং বেশ কয়েকটা তাবুতে আগুন জ্বলছে, খুব সম্ভবত মালিক আম্বারের পশ্চাদপসারণকারী লোকের কাজ।
