জাহাঙ্গীরের হাতের আন্দোলিত ভঙ্গি দেখে যমুনার অপর তীরে, কনুই দিয়ে ধাক্কাধাক্কি করতে থাকা এবং আরেকটু ভালো করে দেখার জন্য চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থাকা জনতার মাঝ থেকে উল্লসিত গর্জন ভেসে আসে। একটা খেপাটে আকাঙ্খ সহসা খুররমকে আবিষ্ট করে তার ইচ্ছে হয় নিজের ঘোড়া নিয়ে কালচে বাদামি পানি সাতরে অতিক্রম করে এবং উফুল্ল, মুগ্ধ দর্শকদের কাতারে গিয়ে যোগ দেয়। বিজয় আর জনগণের স্বহর্ষ করতালি কি সবসময়ে এত ভালো অনুভূতির সৃষ্টির করে? কিন্তু এসব চিন্তা দূরে সরিয়ে সে আবার উপরের দিকে তাকিয়ে দেখে তাঁর আব্বাজান প্রস্থান করেছেন। তাঁর কাছে যাবার এবার সময় হয়েছে। খুররম তার দেহরক্ষীদের দ্বারা অনুসৃত হয়ে দুলকি চালে ঘোড়া নিয়ে দূর্গ অভিমুখে খাড়াভাবে উঠে যাওয়া ঢালু পথটার দিকে এগিয়ে যায়। আরজুমান্দ সেখানে একটা রাজকীয় হাতির পিঠে পান্নাখচিত হাওদায়, দৃষ্টিগোচর হওয়া থেকে রেশমের পর্দা দিয়ে সৃষ্ট আড়ালে তার জন্য অপেক্ষা করছে। বারোজন অশ্বারোহী দেহরক্ষী–গুরুত্বের স্মারক হিসাবে জাহাঙ্গীরের প্রেরিত–তার হাতির পিছনে জোড়ায় জোড়ায় বিন্যস্ত হয়ে অবস্থান করছে। আগ্রায় তার স্ত্রীর বিজয়দৃপ্ত প্রত্যাবর্তনে তাঁর প্রতিরক্ষা সহচর হিসাবে সামনে অবস্থানকারী সৈন্যদের খুররম মনোনীত করেছে যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের প্রদর্শিত সাহসিকতার কথা বিবেচনা করে। খুররম সব শেষে আসা নিজের দেহরক্ষীদের আদেশ দিয়ে সামনে তার জন্য নির্ধারিত স্থানে অবস্থান নেয় এবং ঢাল দিয়ে অগ্রসর হতে সে নিজের দাস্তানাবৃত হাত দিয়ে তাঁর ক্ষুদ্র বহরের উদ্দেশ্যে ইশারা করে।
প্রধান তোরণগৃহের নিচে দিয়ে অতিক্রম করে তারা দূর্গে প্রবেশ করতে অতিকায় দামামাগুলো গুরুগম্ভীর শব্দে বেজে উঠে এবং পরিচারকের দল গিল্টি করা গোলাপের পাপড়ি আর চাঁদ এবং তারার মত দেখতে সোনা আর রূপার তৈরি ক্ষুদ্র অলঙ্কার মুঠো মুঠো ছুঁড়ে দেয় যা তাঁদের চারপাশে ভাসতে ভাসতে নিচে পড়ে। বাঁকানো আর খাড়া ঢাল দিয়ে তাঁরা উপরে উঠা অব্যাহত রাখলে খুররম লক্ষ্য করে প্রতিটা দেয়ালে ব্রোকেডের সবুজ পট্টি বাঁধা রয়েছে। তাঁরা শীঘ্রই আরেকটা তোরণদ্বার অতিক্রম করে এবং প্রাচীরবেষ্টিত প্রধান আঙিনায় এসে পৌঁছে, যার শেষপ্রান্তে রয়েছে তাঁর আব্বাজানের বহু স্তম্ভবিশিষ্ট তিন দিক খোলা, দেওয়ানি আম। আঙিনাটা অভিজাত অমাত্যদের ভীড়ে গিজগিজ করছে কিন্তু ঠিক মধ্যেখানে গোলাপের পাপড়ি শোভিত একটা প্রশস্ত পথ খালি রাখা হয়েছে। পথটার শেষ মাথায় একটা বেদীর উপরে সিংহাসনে উপবিষ্ট অবস্থায় সে তার আব্বাজানের ঝলমলে অবয়র দেখতে পায়।
জাহাঙ্গীর যেখানে বসে রয়েছে খুররম যখন সেখান থেকে ত্রিশ ফিট দূরে রয়েছে, সে তার হাত তুলে পিছনের শোভাযাত্রাকে থামার ইঙ্গিত করে এবং ঘোড়া থেকে নেমে দাঁড়ায় যাতে করে সে তার আব্বাজানের কাছে পায়ে হেঁটে যেতে পারে। সে বেদীর দিকে দুই কি তিন কদম এগিয়েছে যখন সে জাহাঙ্গীরের ডাক শুনতে পায়, ‘দাঁড়াও। আমিই আসছি তোমার কাছে।
চারপাশ থেকে রুদ্ধশ্বাস বিস্ময়ের শব্দ ভেসে উঠে। বিজয়ী সেনাপতিকে স্বাগত জানাতে নিজের সিংহাসন থেকে সম্রাটের নেমে আসা–এমনকি আপন রক্তসম্পর্কিত আত্মীয়ের ক্ষেত্রেও–অভূতপূর্ব একটা ঘটনা। জাহাঙ্গীর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, সিংহাসন থেকে বেদীর কিনারে হেঁটে আসে এবং মার্বেলের ছয়টা নিচু ধাপ বেয়ে নিচে নামে। খুররম তাকিয়ে দেখে তার দিকে এগিয়ে আসার সময় আব্বাজানের রত্নখচিত পাগড়ির সারসের পালক দুলছে এবং কীভাবে তার কানে, গলায় আর আঙুলের হীরকখণ্ড শুভ্র আগুনের ন্যায় জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু সে এসব কিছু এমনভাবে তাকিয়ে দেখে যেন সে স্বপ্ন দেখছে।
তাঁর আব্বাজান যখন মাত্র কয়েকফিট দূরে অবস্থান করছে, খুররম হাঁটু ভেঙে বসে পড়ে এবং মাথা নত করে। জাহাঙ্গীর তার চুল স্পর্শ করে, তারপরে বলে, ‘জিনিষটা নিয়ে এসো।’ খুররম আড়চোখে উপরে তাকিয়ে দেখে একজন পরিচারক ছোট একটা সোনার ট্রে নিয়ে এগিয়ে আসছে যার উপরে কিছু একটা স্তূপ করা রয়েছে–কি রয়েছে সে দেখতে পায় না–আর তাঁর আব্বাজান তাঁর কাছ থেকে সেটা নেয়। খুররম আবার দৃষ্টি নত করে এবং পরমুহূর্তে সে বুঝতে পারে তাঁর আব্বাজান ট্রের জিনিষগুলো তাঁর মাথায় আলতো করে ছোঁয়ান। তাঁর চারপাশে স্বর্ণমুদ্রা আর দামী রত্নপাথর বৃষ্টির মত ঝরে পড়তে থাকে।
‘আমার বিজয়ী আর প্রিয়তম পুত্র তোমায় স্বাগতম, তাঁর আব্বাজান বলছে সে শুনতে পায়, তারপরে নিজের কাঁধে জাহাঙ্গীরের হাত অনুভব করে, তাকে তুলে দাঁড় করায়। আমি চাই এখানে উপস্থিত সবাই সেনাপতি এবং আমার পুত্র হিসাবে তোমার জন্য আমার উচ্চ ধারণার কথা জানুক। তোমায় নিয়ে আমার গর্বের স্মারক হিসাবে, আমি আজ তোমায় শাহ জাহান উপাধিতে ভূষিত করছি, যার মানে পৃথিবীর অধিশ্বর।’
গর্বে খুররমের বুকটা ফুলে উঠে। সে অনেক আশা নিয়ে যুদ্ধাভিযানে যাত্রা করেছিল কিন্তু সেই সাথে সে কতটা সাফল্য লাভ করতে পারবে সেটা নিয়ে খানিকটা বিচলিতও ছিল। সে এখন একটা কাজ ভালো করে সমাপ্ত করার প্রগাঢ় সন্তুষ্টি বোধ করে। সে তাঁর আব্বাজানের কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে এবং তিনিও সেটার প্রশংসা করেছেন। তাঁর আব্বাজানের উত্তরাধিকারী হিসাবে তার মনোনীত হবার উচ্চাশা পরিপূরণে নিশ্চিতভাবে এখন কোনো কিছুই আর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না।
১.১১ লাল মখমলের জুড়িগাড়ি
মেহেরুন্নিসা সম্রাটের একান্ত ব্যক্তিগত কক্ষের লাগোয়া বারান্দায় একপ্রান্ত ঘেষে স্থাপিত রেশমের চাঁদোয়ার নিচে থেকে তাকিয়ে দেখে। প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছে। দক্ষিণে খুররমের বিজয়ের সংবাদ এসে পৌঁছাবার পর থেকেই সে এই অন্তরঙ্গ উদ্যাপনের বিষয়টা পরিকল্পনা করছিলো। খাবারের বন্দোবস্ত ছিল চমৎকার, বিশেষ করে তাঁর নির্দেশে তাঁর পার্সী রাধুনির তৈরি করা পদগুলো–ডালিমের রসে ফোঁটান তিতিরের মাংস, আখরোট আর পেস্তা দিয়ে ঠাসা আস্ত ভেড়ার রোস্ট, জাফরান এবং শুকনো টক চেরী সহযোগে দিয়ে রান্না করা পোলাও–এবং মিষ্টি আঁশের, সুগন্ধিযুক্ত তরমুজ আর জাম যা জাহাঙ্গীরের পছন্দ। তাঁর আদেশে শেষের পদটা বরফ চূর্ণ পাত্রে পরিবেশন করার বদলে এমন একটা ট্রে’র উপরে পরিবেশিত হয় যার নিম্নভাগে মুক্তা আর হীরক খণ্ড বিছানো রয়েছে। সঙ্গীত শিল্পী, নর্তকী আর পায়রার ঝক ভালোমতই মনোরঞ্জন করেছে, কিন্তু এখন সবাই বিদায় নিয়েছে এবং তারা চারজন কেবল একাকী রয়েছে।
