কামরান ইকবাল, তাহলে কি আর করা, এবার তাহলে দ্রুত অগ্রসর হওয়া যাক, খুররম উত্তেজনা চেপে রেখে আদেশ দেয়। অন্য যেকোনো যুদ্ধের আগমুহূর্তের চেয়ে নিজেকে এখন তাঁর অনেক বেশি সন্ত্রস্ত মনে হয়। তাঁর হৃৎপিণ্ড দ্রুতবেগে স্পন্দিত হচ্ছে, শিরায় অশ্বের গতি এবং তাঁর মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে। সে অবশ্য ঘোড়ায় চেপে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া শুরু করতে নিজেকে বাধ্য করে মন থেকে সব ভাবনা ঝেড়ে ফেলতে এবং কেবল সামনের ব্যাপারটায় মনোনিবেশ করতে চেষ্টা করে। সে আর তার লোকজন কিছুক্ষণের ভিতরেই প্রথম মৃত হাতিটা পাশ কাটিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং বাতাসে এক ঝলকের জন্য ইতিমধ্যে শুরু হওয়া পচনের দুর্গন্ধ তাঁর নাসারন্ধ্রে এসে ধাক্কা দেয়। দুর্গন্ধ আর মৃতদেহের চারপাশে ভনভন করতে থাকা উপলবৎ বর্ণের কালো মাছির দল কারণে এর পেছনে অবস্থিত ব্রোঞ্জের বিশাল কামানগুলো থেকে গোলাবর্ষণ করা মোগল তোপচিদের জন্য একটা মারাত্মক পরীক্ষা। তারা এরপরে যে হাতির মৃতদেহটার পাশ দিয়ে যায় সেটা থেকে আরো প্রবল দুর্গন্ধ ভেসে আসে, সবচেয়ে কষ্টসহিষ্ণু পাকস্থলীর অধিকারীর পক্ষেও বমি চেপে রাখাটা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। মালিক আম্বারের লোকেরা ধোয়ার কারণে প্রায় অন্ধের মত নিজেদের কামান থেকে পাল্টা গোলাবর্ষণ আরম্ভ করে এবং ভাগ্যক্রমে তাঁদের একটা গোলা এসে মৃত হাতির উদরে বিস্ফোরিত হলে ফুলতে শুরু করা নাড়িভূড়ি ছিন্নভিন্ন হয়ে চারপাশে ছিটকে যায়–সেই সাথে দুর্গন্ধও।
সে বড় করে একটা ঢোক গিলে পাকস্থলী থেকে খাবারের উঠে আসা কোনোমতে দমন করে এবং মুখের চারপাশে জড়ানো সুতির বড় রুমালটা আরও ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে, খুররম তাঁর লোকদের অগ্রসর হবার গতি দ্রুততর করার আদেশ দেয়। ঘূর্ণায়মান ধোয়ার মাঝে বিদ্যমান একটা ফাঁকা স্থানের ভিতর দিয়ে সে দেখে যে মালিক আম্বারের প্রতিবন্ধকতা থেকে তাঁরা মাত্র তিনশ গজ বা তারও কম দূরে রয়েছে কিন্তু সেখানে কোনো ফাটল দেখতে না পেয়ে সে আতঙ্কিত হয়ে উঠে। ঘোয়ার আচ্ছাদন তারপরে আবার সরে যায় এবং এক মুহূর্তের জন্য সে তার বামপাশে নদীর কাছাকাছি ফাটলের মত কিছু একটা দেখতে পায় তারপরেই কেবল সে বিশ্বাস করে। ফাটল দেখা দিয়েছে!’ সে প্রাণপণে চিৎকার করে উঠে। ‘বামদিক দিয়ে আক্রমণ করো!
সে নিজের আদেশ অনুসরণ করে কালো ঘোড়ার পাঁজরে গুতো দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটতে করে। এক মিনিটেরও কম সময়ের ভিতরে ধোয়ার মাঝে অবরোধকটা আবছাভাবে আবির্ভূত হয়ে পুনরায় আবার আড়ালে চলে যায়। অবরোধকটা কেবল আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। সে তাই বাধ্য হয় লাগাম শিথিল করতে এবং নিজের পর্যাণের উপরে সামনের দিকে ঝুঁকে এসে খুররম অবরোধকের অবশিষ্টাংশ লাফিয়ে অতিক্রম করার জন্য তার বাহনকে তাড়া দেয়, দূর থেকে দেখে যা প্রায় তিন ফিট উঁচু বলে মনে হয়। ঘোড়াটা তার নিতম্ব আর পিছনের পায়ের মাংসপেশি পুরোটা শক্তি ব্যবহার করে সামনের দিকে লাফ দিয়ে অনায়াসে প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে যায়।
সে এখন শত্রু শিবিরের ভেতরে, তাঁর দেহরক্ষীরা দ্রুততার সাথে তাকে অনুসরণ করে। তোপচিদের নিরস্ত্র করতে চেষ্টা করো, সে চিৎকার করে বলে। অবরোধক বরাবর ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে ভাসমান ধোয়ার মাঝে, সে একটা কামানের সামনে এসে পড়ে যা মুহূর্তের ভিতরে গোলাবর্ষণ করবে। সে তার ভারি কিন্তু নিখুঁত ভারসাম্যের তরবারিটা মাথার উপর থেকে মাত্র একবার অর্ধবৃত্তাকারে চালনা করে সলতেয় অগ্নি সংযোগ করতে ব্যস্ত তোপচিকে কবন্ধ করে দেয়। নিজের মুখে ছিটকে আসা উষ্ণ রক্তের স্বাদ অনুভব করার মাঝেই দ্রুত আরো দু’বার তরবারি চালিয়ে সে অন্য দু’জনের ভবলীলা সাঙ্গ করে, একজন কামানে বারুদ ভরার জন্য ব্যবহৃত লোহার দণ্ড ধরে দাঁড়িয়েছিল আর অন্যজনের হাতে ছিল কামানে ভরার জন্য বারুদের থলে। তাঁর দেহরক্ষীরা তখনও তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে অবস্থান করছিল, সে এর ভেতরেই অবরোধক বরাবর আস্কন্দিত বেগে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে আরেকটা কামানের গোলন্দাজদের তাদের সহায়তায় আহত কিংবা নিহত করে। সে এরপরে শত্রু শিবিরের আরো ভেতরে প্রবেশ করার জন্য দ্রুত বহমান নদীর নুড়িময় উপান্তের দিকে ঘুরে, তাঁর ইচ্ছে শত্রুপক্ষের আরো বেশি সংখ্যক যোদ্ধাকে যুদ্ধের জন্য প্রলুব্ধ করে টেনে আনে এবং তাঁদের ধ্বংসের নিয়ামক হয়।
সে তার লোকদের সাথে নিয়ে বেশ কয়েকজন তবকিকে কচুকাটা করে যাঁরা অবরোধকের চারপাশের লড়াই থেকে ইতিমধ্যে পালাতে শুরু করেছিল। কিন্তু সহসা মালিক আম্বারের অশ্বারোহী যোদ্ধাদের সঙ্ঘবদ্ধ একটা দল ধোয়ার ভেতর দিয়ে তাঁর ডানদিক থেকে বের হয়ে এসে পাশ থেকে তাঁর নিজস্ব অশ্বারোহীদের আক্রমণ করার জন্য প্রচণ্ড বেগে ছুটে আসে, তাদের আক্রমণের প্রাথমিক ধাক্কা সামলাতে না পেরে প্রতিপক্ষের দু’জন ভূপাতিত হয়। খুররম তাঁর আক্রমণকারীদের মুখোমুখি হবার জন্য নিজের কালো ঘোড়া চক্রাকারে ঘুরিয়ে নিয়ে দু’জন আক্রমণকারী যখন তার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছে তখন তাদের লক্ষ্য করে তার তরবারি দিয়ে আঘাত করে চায়। তাঁর প্রতিপক্ষের একজন যোদ্ধা তাঁর আঘাত এড়িয়ে গেলেও অন্যজন নিজের পাকস্থলীতে গভীর একটা ক্ষত নিয়ে নিজের পর্যাণ থেকে মাটিতে আছড়ে পড়ে।
