ভালো কথা, আমাদের আক্রমণ করার বিষয়ে আপনি কি পরামর্শ দেবেন? খুররম জিজ্ঞেস করে, কিছুক্ষণের জন্য নিজের মতামত দূরে সরিয়ে অন্যের কথা শুনতে চায়।
‘যুবরাজ, আমাদের আসলে কামানগুলোকে একটা অগ্রবর্তী স্থানে নিয়ে যাওয়া দরকার যেখান থেকে সেগুলো প্রতিবন্ধকতার সত্যিকারের ক্ষতিসাধন করতে পারবে, ওয়ালী বেগ, কৃশকায় দেখতে এক বাদশানি, খুররমের তোপচিদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ এবং বয়স কম করে হলেও যুবরাজের দ্বিগুণ।
কাজটা করার চেয়ে বলাটা অনেক সহজ। তোপচিদের জন্য সামান্যতম আড়াল থাকবে না এবং তাঁরা তাঁদের কামানগুলো কার্যকর করার আগেই মালিক আম্বারের তবকিরা সহজেই তাদের পাখির মত গুলি করে ভূপাতিত করবে।’
‘আমরা কামানের মঞ্চের জন্য আড়াল হিসাবে মৃত হাতির দেহগুলো কেন ব্যবহার করছি না?’ কামরান ইকবাল পরামর্শের সুরে বলে।
হ্যাঁ, কিন্তু তারপরেও কামানগুলো আমাদের জায়গামত নিয়ে যেতে হবে এবং সেটা করতে গেলে আমাদের প্রচুর লোকক্ষয়ের ব্যাপারটা মেনে নিতে হবে।
খুররমের মাথায় সহসা একটা ভাবনা খেলা করে যায়। যুদ্ধের পরামর্শদাতারা আর আরজুমান্দ উভয়পক্ষই যখন সামনে থেকে যুদ্ধের নেতৃত্ব না দেয়ার পরামর্শ দেয়, তারা তখন ধোয়ার কুণ্ডলীর ফলে সৃষ্ট বিভ্রান্তিকে তাদের পক্ষের অন্যতম যুক্তি হিসাবে উপস্থাপন করেছিল। ধোয়াকে নিজের সুবিধার্থে সে কেন ব্যবহার করার কথা চিন্তা করছে না?
“আমরা কি ঘোয়ার একটা অন্তরাল তৈরি করতে পারি আড়াল হিসাবে যা ব্যবহার করে আমাদের লোকেরা কামানগুলো নিয়ে এসে মৃত হাতির দেহগুলোর পিছনে সেগুলো স্থাপন করতে পারে? সে প্রশ্ন করে। আমি সেখানে প্রচুর ঘাস আর ঝোঁপঝাড় দেখেছি যা পোড়ালে প্রচুর ধোয়া সৃষ্টি হবার কথা। কয়েক ঘন্টার ভেতরেই প্রচুর ঘাস আর ঝোঁপঝাড় আমার লোকদের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব।’
‘যুবরাজ, এতে কাজ হলেও হতে পারে, ওয়ালী বেগ বিষয়টা নিয়ে ভাবতে ভাবতে বলে।
কাজ হবে। আমরা আমাদের লোকদের আদেশ দিতে পারি তাঁরা যেন নিজেদের বাহুতে সবুজ বা সাদা রঙের কাপড় টুকরো বেধে রাখে যা ধূম্রমেহের ভিতরে তাদের পরস্পরকে সনাক্ত করতে সাহায্য করবে। অবিলম্বে পোড়াবার জন্য ঝোঁপঝাড় সংগ্রহ শুরু করতে লোক পাঠাবার ব্যবস্থা করেন। আমরা রাতের বেলা সেগুলো জায়গামত নিয়ে যাব, এবং ওয়ালি বেগ, আপনি ভোরের আলো ফোঁটার ঘন্টা দুয়েক আগে কামানগুলো স্থানান্তরিত করার কাজ শুরু করবেন যাতে অন্ধকারও আমাদের বাড়তি আড়াল দান করে।
*
পরদিন সকাল চারটার সময় ষাড়ের দল তাঁর প্রথম কামানটা যখন টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে উপত্যকার প্রবেশমুখের দিকে অশ্বারোহী প্রহরী সাথে করে এগিয়ে যেতে থাকে খুররম ততক্ষণে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ইতিমধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ ঝোঁপঝাড় মজুদ করা হয়েছে যেখান থেকে বাতাস মালিক আম্বারের অবস্থান অভিমুখে ধোয়া প্রবাহিত করে, তার লোকদের দৃষ্টি ঝাপসা করে দেবে। খুররম সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ হওয়া সত্ত্বেও আশা করে যে আগামী কয়েক ঘন্টা এখন যেমন মোটামুটি প্রবল বেগে বাতাস বইছে সেটা যেন দিক পরিবর্তন না করে বা বন্ধ না হয়ে যায়। তার ধারণা প্রায় বিশ মিনিট সময় অতিবাহিত হবার পরে সে গুলির শব্দ পায়। ষাড়ের দলটার তত্ত্বাবধায়করা ইতিমধ্যেই মালিক আম্বারের বেশ কিছু অগ্রগামী প্রহরীদের মোকাবেলা করেছে যাদের সে প্রতিবন্ধকতার বাইরে মোতায়েন করেছিল। খুররম মনে মনে ভাবে, আবিসিনিয়ান আসলেই একজন চৌকষ সেনাপতি, কিন্তু আমিও নিজেকে তার সমকক্ষ হিসাবে প্রমাণ করবো। ভোরের প্রথম আলো উঁকি দিতে শুরু করেছে এবং তার পোয় ব্যবহার করার পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার সময় হয়েছে। শুকনো পাতার বহ্নৎসবশুরু করো, সে চিৎকার করে বলে, এবং সাথে সাথে একজন অশ্বারোহী তাঁর আদেশ পালনের বিষয়টা নিশ্চিত করতে এগিয়ে যায়। ওয়ালি বেগ আর তাঁর তোপচিদের আগেই নির্দেশ দেয়া হয়েছে হাতির মৃতদেহগুলোর পেছনে একটা সুবিধাজনক সুরক্ষিত স্থানে তারা যখন পৌঁছাতে পারবে তখনই যেন সাথে সাথে কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা আরম্ভ করে। সে দুই বা এক মিনিটের ভিতরেই প্রথমবারের মত কামান থেকে গোলাবর্ষণ করার ভারি মন্দ্র শব্দ শুনতে পায়, প্রায় সাথে সাথেই পটকার মত তবকিদের গুলিবর্ষণের শব্দ ভেসে আসে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে, এবং মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সে যদিও ছয়শ গজ বা তারও বেশি দূরে অবস্থান করছে তারপরেও খুররম জ্বলন্ত ঝোঁপের গন্ধ অনায়াসে চিনতে পারে। পুরোপুরি যখন সকাল হয় সে দেখে যে ধোয়ার বেশির ভাগ আসলেই মালিক আম্বারের অবস্থানের দিকে বয়ে চলেছে।
খুররম তার সেনাপতিদের কাছ থেকে প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হলেও সিদ্ধান্ত নেয় যে প্রতিবন্ধকতায় সৃষ্ট ফাটলের ভিতর দিয়ে অশ্বারোহী যোদ্ধাদের আক্রমণের নেতৃত্ব সে নিজে দেবে। সেখানে এখন যেকোনো মুহূর্তে ফাটল দেখা দেবে। সে সহিসকে ডেকে এনে নিজের বিশাল কালো ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে এবং দুলকি চালে তার অপেক্ষমান দেহরক্ষী আর কামরান ইকবালের নেতৃত্বাধীন অন্যান্য অশ্বারোহী যোদ্ধাদের সমাবেশের দিকে এগিয়ে যায়। একজন বার্তাবাহককে মাত্র দশ মিনিট পরেই তাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। যুবরাজ, বোয়ার কারণে ঠিক নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না কিন্তু আমাদের ধারণা আমরা নদীর কাছ থেকে বিশ গজ দূরে যেখানে মূলত মালবাহী শকট উল্টে দিয়ে আর ঝোঁপঝাড়ের সাহায্যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়েছিল সেখানে একটা ফাটল সৃষ্টি করতে সফল হয়েছি।’
