হাতির বহরের গুটিকয়েক দাঁড়িয়ে থাকা সদস্য এখনও সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে কিন্তু স্বগোত্রের ভূপাতিত সহযোদ্ধাদের ধরাশায়ী দেহ পাশ কাটিয়ে অগ্রসর হওয়াটা তাদের জন্য ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। মালিক আম্বারের প্রতিবন্ধকতায় ফাটল ধরাতে তাদের যদি সফল হতে হয় তাহলে সেদিকে যে গতিতে তাদের ছুটতে হবে সেই গতি অর্জন করা তাদের জন্য এই মুহূর্তে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। খুররমের চোখের সামনেই আরো একটা হাতি ভূপাতিত হয়, এত মন্থরভাবে জন্তুটা ভূপাতিত হয় যে পিঠের হাওদায় অবস্থানরত চারজন যোদ্ধাই লাফিয়ে মাটিতে নামতে পারে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য পেছনের দিকে দৌড়াতে শুরু করে। খুররম হতাশ হয়ে চারজনের একজনকে, স্পষ্টতই গাদাবন্দুকের গুলির আঘাতে, মুহূর্ত পরেই মাটিতে ছিটকে পড়তে দেখে। ভূপাতিত সহযোদ্ধাকে সাহায্য করার জন্য দ্বিতীয়জন ঘুরে দাঁড়ায় কিন্তু আহত লোকটার কাছাকাছি পৌঁছাবার আগে সে নিজেই গুলিবিদ্ধ হয়। তৃতীয়জনও গুলিবিদ্ধ হয় কিন্তু তার আঘাত বোধহয় খুব একটা মারাত্মক না এবং বুকে ভর দিয়ে খুররমের অবস্থানের দিকে একটু একটু করে এগিয়ে আসতে শুরু করে। চতুর্থজন নদীর অগভীর অংশের ভিতর দিয়ে দৌড়াবার কারণে গাদাবন্দুকের গুলির আওতা থেকে প্রায় বের হয়ে আসবার মুহূর্তে সেও গুলিবিদ্ধ হয়, প্রচণ্ড আক্ষেপে বাতাসে দু’হাত ছোঁড়াছুড়ি করতে করতে মুখ নিচের দিকে দিয়ে পানিতে আছড়ে পড়ে।
ইত্যবসরে আরো অন্তত চারটা হাতি ভূপাতিত হয়েছে যখন অন্য দুইটা কি তিনটা হাতি গতিপথ পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। বিশাল প্রাণীগুলোর একটা, মারাত্মকভাবে আহত, টলমল করতে করতে নদীর দিকে এগিয়ে গিয়ে ফোয়ারার মত উপরের দিকে পানি ছিটিয়ে দিয়ে জলশয্যা নেয়, রক্তে দ্রুত বহমান পানি লাল হয়ে যায়। খুররম মনে মনে চিন্তা করে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো ব্যাপক হবার আগে এখনই আক্রমণ বন্ধ করা উচিত, এবং সে সাথে সাথে কালক্ষেপণ না করে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সামরিক সংবাদ বহনকারী অপেক্ষমান অশ্বারোহীকে যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেয়। সে বরাবরই জানতো যে মালিক আম্বার একজন কুশলী, দক্ষ আর অভিজ্ঞ প্রতিপক্ষ। সে নিশ্চিত পোড় খাওয়া আবিসিনিয়ান সেনাপতি ভেবেছে যে উপত্যকায় ভালোভাবে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে সে যদি মোগল বাহিনীর এতটাই ক্ষতিসাধন করতে পারে যার ফলে তারা হয় পশ্চাদপসারণ করবে, নিজেদের তার পাল্টা আক্রমণের ঝুঁকির সম্মুখীন করে, নতুবা লড়াইটাকেই নিদেনপক্ষে এতটাই দীর্ঘস্থায়ী করা যার ফলে একটা অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে যা কাজে লাগিয়ে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সে নিজেদের জন্য শান্তি আর নিরাপদ অতিক্রমণের সুবিধা আদায় করে নিতে পারবে। খুররম যদি এই দুটো সম্ভাবনার একটাও যদি মেনে নেয় তাহলে নিজের বদরাগী পিতার প্রতিক্রিয়া আন্দাজ করতে তাঁর খুব একটা কষ্ট হয় না আর সেই সাথে সে নিজের প্রথম অভিযানে সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। তাকে এখন একটু সময় নিয়ে নতুন কৌশলের কথা ভাবতে হবে। আজ দুপুরের পরে পুনরায় আরেকদফা নিষ্ফল সম্মুখ আক্রমণ শুরু করার চেয়ে আগামী দুই কি একদিন আক্রমণ মূলতবি রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
‘আমাদের কেমন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে? খুররম পরে তার চারপাশে অর্ধবৃত্তাকারে আসনপিঁড়ি হয়ে বসে থাকা তার সেনাপতিদের কাছে জানতে চায়।
কমপক্ষে ছয়শ সৈন্য হয় নিহত হয়েছে নতুবা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। আমাদের হেকিমরা কেবল তাঁদেরই চিকিৎসা করার সময় পেয়েছে যাদের বেঁচে থাকার একটা সম্ভাবনা রয়েছে বলে তাদের কাছে মনে হয়েছে। সম্ভবত একইরকম গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের সেরা রণহস্তির ত্রিশটা মারা গেছে অথবা এত জঘন্যভাবে আহত হয়েছে যে তাদের কষ্ট লাঘব করাই করুণা প্রদর্শনের সামিল, কামরান ইকবাল পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে। ‘আমি যতটা ভয় করেছিলাম পরিস্থিতি তারচেয়েও একটু বেশি মারাত্মক। আমার মনে হয় আপাতত প্রকাশ্যে সম্মুখ আক্রমণের ধারণা আমাদের বাতিল করা উচিত। আমরা কি নিশ্চিতভাবে জানি যে উপত্যকার পেছন দিক দিয়ে বাইরে বের হবার জন্য কোনো পথ নেই আর আমরা যেমন ধারণা করেছি উপত্যকার পার্শ্বদেশ ঠিক ততটাই খাড়া হয়ে উঠে গিয়েছে।’
‘হ্যাঁ, যুবরাজ, আমরা এ ব্যাপারে যতদূর জানি তাতে তাই মনে হয়েছে। স্থানীয় অধিবাসীরা, যারা প্রায়শই তথ্যের একটা ভালো উৎস হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে, ভয়ে হয় পালিয়ে গিয়েছে বা এতটাই আতঙ্কিত যে তাঁরা দরকারি তথ্য দেবে না। আমরা যদি তথ্যের জন্য তাঁদের চাপ দেই তাহলে আমরা যা শুনতে চাই বলে তাদের মনে হবে তারা ঠিক সেটাই আমাদের বলবে আর সেটা তাহলে তখন অপ্রয়োজনীয় তথ্যের চেয়েও ভয়ঙ্কর হবে।’
‘আমরা আমাদের গুপ্তদূতদের কয়েকজনকে প্রেরণ করেছিলাম, নাকি আমরা শেষ পর্যন্ত পাঠাইনি, চারপাশের পাহাড়ী ঢালে ঘুরে দেখতে আর পেছন থেকে উপত্যকাটা অনুসন্ধান করতে?
‘হা, কিন্তু মালিক আম্বারের নিজেরও মনে হয় অসংখ্য গুপ্তদূত চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে। আমাদের লোকদের চেয়ে তাঁরা এই এলাকাটা অনেক ভালো করে চিনে বলে বেশ কয়েক দফা তারা সাফল্যের সাথে আমাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ পরিচালনা করেছিল। আক্রমণের কবল থেকে যারা বেঁচে এসেছিল আর যারা কোনো ধরনের বিপত্তি ছাড়াই অভিযান সমাপ্ত করতে পেরেছিল সবাই একই কথা বলেছে যে তারা যা দেখেছে তাতে সামনের সংকীর্ণ প্রবেশপথটাই বস্তুতক্ষে উপত্যকায় সশস্ত্র লোকজন প্রবেশের একমাত্র রাস্তা।
