‘উপত্যকাটা অনেকটা বোতল আকৃতির। প্রবেশ পথটা বোতলের গলা বা বলা যায় সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশ। দুই পাশ খাড়াভাবে উঠে গিয়েছে আর পায়ের চাপে গড়িয়ে পড়তে পারে এমন পাথর এবং আলগা নুড়িতে ঢাকা। উপত্যকার মাঝে ঝর্ণার পানিতে সৃষ্ট একটা নদী রয়েছে যা মালিক আম্বারের লোকদের পানির সংস্থান দেবে। আর সেখানে প্রচুর কাঠও রয়েছে। তাঁরা কিছু গাছ কেটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে এবং তারপরেও যথেষ্ট গাছ দাঁড়িয়ে থাকবে আমাদের যেকোনো আক্রমণ বিক্ষিপ্ত করে দিতে।’
‘তোমার কি মনে হয়? আমরা কি এখন আক্রমণ করবো?’ শেষ যুদ্ধের সম্ভাবনায় অধৈর্য হয়ে উঠা খুররম জানতে চায়।
‘না, যুবরাজ। যদিও বর্তমান পরিস্থিতিতে আক্রমণ করাটাই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হচ্ছে, আমার মনে হয় সেটা ঠিক হবে না, কামরান ইকবাল বলে। উপত্যকার প্রবেশ মুখটা খুবই সংকীর্ণ আর সহজেই এলাকাটা সুরক্ষিত করা সম্ভব। আমরা যদি কেবল আমাদের সঙ্গে থাকা অশ্বারোহী যোদ্ধাদের ভরসায় আক্রমণ শুরু করি তাহলে মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবার ঝুঁকি রয়েছে। রণহস্তীর বহর আর কামানবাহী শকটগুলো এসে যোগ দেয়া পর্যন্ত আমাদের অবশ্যই অপেক্ষা করা উচিত।’
খুররম বুঝতে পারে কামরান ইকবাল ঠিকই বলেছে। এতগুলো সপ্তাহ। কৌশলী অভিযান পরিচালনা করে মালিক আম্বারের বাহিনীকে বর্তমান অবস্থানে নিয়ে এসে এখন ব্যর্থতার সম্ভাবনা আছে জেনেও আক্রমণ করলে সে বোকামির পরিচয় দেবে। মালিক আম্বারের অবস্থা এই মুহূর্তে নিজ গুহায় কোণঠাসা অবস্থায় আহত সিংহের ন্যায়, যে এখনও অসতর্ক বা অতি উৎসাহী শিকারীকে প্রাণঘাতি আঘাত করতে সক্ষম।
*
‘আজ আমরা জয়লাভ করবো, খুররম এক ঘন্টা আগে আরজুমান্দকে বলেছে। মালিক আম্বারের সৈন্যরা যে উপত্যকায় নিজেদের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অবরুদ্ধ করে রেখেছে সেখান থেকে আধ মাইল দূরে একটা টিলার উপরে রোকের অবস্থান থেকে সে এখন সামনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। প্রবেশ পথটা সত্যিই খুব সংকীর্ণ–কোনোমতেই দুইশ গজের বেশি চওড়া হবে না-এবং দু’পাশের পাহাড় এতটাই খাড়াভাবে উঁচু হয়েছে যে সেটা বেয়ে উপরে উঠা বিশেষ করে এমন একদল মানুষের জন্য যাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করা হচ্ছে। মালিক আম্বারের সৈন্যরা প্রবেশ পথটা পাথর, গোড়া থেকে কেটে ফেলা গাছ এমনকি কাঁটাগাছের ঝোঁপ যা আশেপাশের এলাকায় প্রচুর জন্মে একসাথে বেঁধে গোছা করে ফেলে রাখার সাথে সাথে নিজের সাথের মালবাহী শকটগুলোও উল্টে দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। প্রতিবন্ধকতা বরাবর নিয়মিত দূরত্বে খুররমের অতর্কিত হামলার পরেও কার্যক্ষম রয়েছে মালিক আম্বারের এমন অবশিষ্ট কামানের নল মুখ ব্যাদান করে রয়েছে।
খুররম এখন আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত যে গতকাল সন্ধ্যাবেলা যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণী বৈঠকে সে ঠিকই বলেছিল যে উপত্যকার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এসে নদীটা যেখানে বাইরে বের হয়ে এসেছে সেটাই একমাত্র সম্ভাব্য দূর্বল স্থান। মালিক আম্বারের লোকজন নদীতে বাঁধ না দিয়ে সেখানে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না যা অচিরেই তাদের পেছনের স্থান প্লাবিত করে এলাকাটা পাহারা দেয়াই তাদের জন্য অসম্ভব করে তুলবে।
যুদ্ধের কৌশল নির্ধারণী সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুসারে তাঁর রণহস্তীর একটা বহর ইতিমধ্যেই আক্রমণের জন্য অগ্রসর হতে আরম্ভ করেছে, উপত্যকার প্রবেশ পথের দিকে ধীরে কিন্তু নিশ্চিন্ত নিশ্চয়তায় এগিয়ে চলেছে। খুররম কয়েকটা হাওদা থেকে গাদাবন্দুকের গুলির ঝলক দেখতে পায় এবং অন্যগুলো থেকে ভেসে আসে তাঁর বহনযোগ্য ছোট কামান–গজলের চাপা গর্জন আর ঘোয়া। হাতির বহরের ঠিক পেছনে আড়াআড়িভাবে বিন্যস্ত অশ্বারোহী যোদ্ধাদের সারি ইতিমধ্যেই সমবেত হতে শুরু করেছে প্রতিবন্ধকতায় সৃষ্ট সামান্যতম ফাটলের সর্বোচ্চ সুযোগ নিতে। খুররমের মন চাইছে তাদের সাথে থেকে আক্রমণের নেতৃত্ব দিতে কিন্তু যুক্তি দিয়ে সে জানে যে আরজুমান্দ ঠিকই বলেছে এবং কেবল তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই না বরং সে তাকে তাঁর সেনাপতিদের পরামর্শ অনুসরণ করতে অনুরোধ করেছিল এই জন্য যে যুদ্ধক্ষেত্র আর সেখানকার ঘূর্ণায়মান ধোয়ার কুণ্ডলী আর এর অনুগামী বিভ্রান্তি থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করে রণনীতি পরিচালনা করলেই সে তার দায়িত্ব অনেকবেশি কার্যকরভাবে পালন করতে পারবে।
মালিক আম্বারের সৈন্যদের তড়িঘড়ির করে তৈরি করা প্রতিবন্ধকতার পেছন থেকে কামানগুলো এখন গোলাবর্ষণ করতে শুরু করেছে এবং খুররম তাঁর হাতির বহরের অগ্রগামী একটা হাতিকে থমকে দাঁড়িয়ে যেতে এবং তারপরে ধীরে ধীরে একপাশে কাত হয়ে নদীতে ভূপাতিত হতে দেখে, পিঠের হাওদাটা ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। আরেকটা হাতির ঘাড়ের দু’পাশ থেকে দুই মাহুতই নিচে আছড়ে পড়ে, সম্ভবত তবকীদের সম্মিলিত গুলিবর্ষণের একটা ঝাপটা তাদের আঘাত করেছে। হাতিটা আক্রমণের অভিমুখ থেকে নিজেকে ঘুরিয়ে নেয়, ভয় আর আতঙ্কে শুড় উঁচু করে রেখেছে। বিশাল জন্তুটা দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে পালাবার সময় এর গজদাঁতের সাথে সংযুক্ত ধারালো তরবারির আঘাতে পেছনে অনুসরণরত আরেকটা হাতির পা প্রায় দ্বিখণ্ডিত করে ফেললে সেটাও ভূপাতিত হয়। হাতিটা ভূপাতিত হবার সময় খুররম এর হাওদা থেকে গজনল মাটিতে আছড়ে পড়ে বিধ্বস্ত হতে দেখে। আরেকটা হাতি সেটার সাথে হোঁচট খেয়ে সামনের দিকে ছিটকে পড়লে ঘাড়ের দু’পাশ থেকে দুই মাহুতের সাথে সাথে পিঠে স্থাপিত হাওদাও স্থানচ্যুত হয়।
