মালিক আম্বারের লোকেরা তাদের পিছু ধাওয়া করে নি। খুররম বুরহানপুর ত্যাগ করার পর থেকে অতিবাহিত দু’মাসে এমন ঘটনা আরো দু’বার ঘটেছে, তাঁদের প্রতিপক্ষ সবসময়ে কৌশলগত নিরাপদ আশ্রয়স্থলে অবস্থান অব্যাহত রেখেছে, ঝটিকা হামলায় নিজের বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারটা আপাত দৃষ্টিতে বোধহয় মেনেই নিয়েছে এবং আজ সকালের মত ঝটিকা আক্রমণের সময় নিজ পক্ষের হামলাকারীদের, তারা যখন মূল বাহিনী থেকে পৃথক হয়ে হামলা শুরু করে, তখনও তাদের অনুসরণ করার কোনো তাগিদ তার ভিতরে লক্ষ্য করা যায়নি। মালিক আম্বার মনে হচ্ছে দাক্ষিণাত্যের মালভূমির সীমান্তের লাগোয়া পাহাড়ের অভ্যন্তর পর্যন্ত পশ্চাদপসারণ অব্যাহত রাখতে সংকল্পবদ্ধ যা খুররমের আগমনের সংবাদ প্রথমবার শোনার পরে থেকেই তিনি বজায় রেখেছেন। তার সংখ্যায় অপ্রতুল সৈন্যবাহিনী এখানে যেকোনো যুদ্ধে পরিচিত ভূপ্রকৃতি নিজের সুবিধামত ব্যবহার করতে সক্ষম হবে।
খুররম তার রক্তে রঞ্জিত তরবারির ফলা পর্যাণে রক্ষিত এক টুকরো কাপড়ের সাহায্যে পরিষ্কার করে এবং পরম যত্নের সাথে আরো একবার তরবারিটাকে এর রত্নখচিত ময়ানে কোষবদ্ধ করে, হতাশা আর সন্তুষ্টির একটা মিশ্র অনুভূতির মাঝে সে বিরাজ করছে। সে মালিক আম্বারের সৈন্যবাহিনীর আরো ক্ষতি সাধন করতে পেরেছে, তাদের গোলাবর্ষণের ক্ষমতা আর সৈন্য সংখ্যা ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য মোগল প্রাণহানির বিনিময়ে অর্জিত হওয়ায় সে সন্তুষ্ট, আর হতাশ এই জন্য যে মালিক আম্বার এখনও চূড়ান্ত নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধে নিজেকে নিয়োজিত করে নি। সে অবশ্য নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে মনে মনে বলে যে এমন একটা যুদ্ধের সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে খুব বেশি দিন দেরি হবে না।
*
‘দেখি, আমাকে দেখতে দাও, আরজুমান্দ আদেশের সুরে বলে। খুররম তার পরিশ্রান্ত কালো ঘোড়া নিয়ে মাত্র পাঁচ মিনিট আগেই তার অস্থায়ী সেনাছাউনিতে আস্কন্দিত বেগে এসেছে। আরজুমান্দ রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে হেরেম থেকে ছুটে এসেছে, সে তাবুর উষ্ণ অভ্যন্তরভাগে মধ্যবর্তী সময়টা নিরন্তর পায়চারি করে অতিবাহিত করেছে, তার পরিচারিকারা দরবারের সাম্প্রতিক গুজবের রসালো মুখরোচক অংশ শুনিয়ে তার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলে বা যখন জলখাবারের কথা জিজ্ঞেস করেছে সে তাদের সব কিছুরই যন্ত্রবৎ উত্তর দিয়েছে। খুররমের মুখে জমাট বাধা রক্তের দাগ দেখে সে সাথে সাথে তাকে তাবুতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে।
‘কিস্যু হয়নি। সামান্য আচড় মাত্র। সত্যিই বলছি। ক্ষতস্থানে ইতিমধ্যেই মামাড়ি পড়া শুরু হয়েছে, খুররম প্রতিবাদ জানায় কিন্তু আরজুমান্দ সে সবে মোটেই পাত্তা না দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করার জন্য নিম পাতার নির্যাস আনতে বলে, সে শুনেছে সংক্রমণ প্রতিরোধে এটা একটা নিশ্চিত উপায়। পরিচারিকাদের একজন হন্তদন্ত হয়ে নিম পাতার সন্ধানে যেতেই, আরজুমান্দ খুররমের বুকের বর্মের বাঁধন খুলে এবং তার দেহ থেকে সেটা সরিয়ে নেয়ার সময় সে আপন মনেই বিড়বিড় করে বলতে থাকে, ‘আল্লাহতালাকে লাখ লাখ শুকরিয়া যে আপনি নিরাপদে ফিরে এসেছেন। ‘আমি তোমাকে বলেছি সোনা আমি অবশ্যই ফিরে আসবো… তোমায় ভীষণ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে। তুমি কি নিশ্চিত যে আমার সাথে যুদ্ধযাত্রায় অংশ নেয়া তোমার জন্য সত্যিই ভালো হবে? বুরহানপুরে তুমি কি আরও শান্তিতে থাকতে না?”
না, আরজুমান্দ সাথে সাথে উত্তর দেয়, তাঁর কণ্ঠস্বর কঠোর। সংবাদের জন্য অপেক্ষার প্রহর এখানে সংক্ষিপ্ত। বার্তাবাহকের আগমনের জন্য প্রতীক্ষা করা এবং তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে তারা কি সংবাদ নিয়ে এসেছে সেটা আন্দাজ করার চেষ্টা অনেক বেশি মারাত্মক। আমি এখানে সেনাছাউনিতে আপনার সাথে থাকতে পারছি এবং আপনার ভাবনা জানতে আর চূড়ান্ত বিজয়ের ক্ষণে, আমি জানি যা অবশ্যম্ভাবী, উপস্থিত থাকতে পারবো। সে তার কথার মাঝেই তাকে আলিঙ্গণ করে, ঘামের ঝাঁঝালো গন্ধ যা তার জোব্বাকে নোংরা করেছে পাত্তা না দিয়ে।
খুররম যখন তার গালে প্রণয়স্পর্শ ফিরিয়ে দিচ্ছে, তাঁর মন তখনও ভাবতে থাকে বিজয় অর্জনের জন্য সে আরও কীভাবে তার প্রচেষ্টা জোরদার করতে পারে যা আরজুমান্দ অবশ্যম্ভাবী মনে করে। মালিক আম্বার এখনও সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ হিসাবে বর্তমান।
*
‘যুবরাজ, উন্মুক্ত প্রান্তরে যুদ্ধে আমাদের মোকাবেলা না করে মালিক আম্বার এখান থেকে পাঁচ মাইল দূরে একটা বদ্ধ একটা উপত্যকায় পশ্চাদপসারণ করেছে, কামরান ইকবাল, তাঁর গুপ্তদূতের অভিযান সমাপ্ত করে ফিরে এসে পোষাক পরিবর্তন করে যখন পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে দাবদাহের উত্তাপে তাঁর গোলগাল মুখটায় বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে গড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তার লোকজন ইতিমধ্যে প্রবেশ পথে পাথর, মালবাহী শকট উল্টে রেখে আর অন্য যা কিছু তারা হাতের কাছে পেয়েছে সবকিছু দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
খুররম মনে মনে ভাবে, অবশেষে অপেক্ষার পালা সমাপ্ত হতে চলেছে। আক্রমণ শুরু হবার পর থেকেই যার কারণে তাকে নিজের গালে একটা অগভীর ক্ষত সহ্য করতে হয়েছে তার লোকেরা মালিক আম্বারের বাহিনীর উপরে সবসময়ে নজর রেখে এসেছে বিশেষ করে তারা যখন আহমেদনগরের সুলতানের ভূখণ্ডের দিকে ফিরে যেতে শুরু করে। খুররম পরবর্তীতে শত্রুপক্ষকে পর্যায়ক্রমিক পার্শ্ববর্তী আক্রমণ আর হয়রানিমূলক ঝটিকা হামলা চালিয়ে প্রতিপক্ষকে তাদের সব শক্ত ঘাঁটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে যেখানে পৌঁছাতে পারলে তারা নতুন করে সৈন্য সংগ্রহ করতে পারতো। মালিক আম্বার, যিনি পশ্চাদপসারণের সময় নিজের লোকদের ভিতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার কঠিন কাজে আপাত দৃষ্টিতে সফল হয়েছেন, অবশেষে স্পষ্টতই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাকে এবার ঘুরে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করতে হবে। আবিসিনিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধা প্রতিরক্ষার জন্য সবচেয়ে উপযোগী ভূখণ্ডও যদি নির্বাচিত করে থাকেও, খুররম নিজের বিজয়ের ব্যাপারে আস্থাশীল। পেছনের উপত্যকা সম্বন্ধে কি জানো? আসলেই কি সেটা কানাগলি?’
