সে আর তার লোকেরা তাদের ঘোড়াগুলোকে বল্পিত বেগে ধাবিত করার পূর্বেই শত্রু সৈন্য তাদের আক্রমণ করে। খুররমকে দেখে মনে হয় চিনতে পারায়, প্রতিপক্ষের গাট্টাগোট্টা দেখতে এক যোদ্ধা যে শিরোস্ত্রাণ পরার কিংবা বর্মে সজ্জিত হবার সময় পায়নি তার দিকে সরাসরি এগিয়ে যাবার জন্য লাগাম ধরে টান দেয়। খুররম তার ঘোড়াকে চক্রাকারে ঘোরায়, জটা এখন নিজের পূর্ববর্তী যুদ্ধ প্রয়াসের কারণে জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে, তার মুখোমুখি হতে। তাঁর প্রতিপক্ষ অবশ্য আঘাত করার প্রথম সুযোগ লাভ করে, খুররমের বক্ষ আবৃতকারী বর্ম লক্ষ্য করে সে হাত দুলিয়ে নিজের বাঁকানো তরবারি নামিয়ে আনতে আঘাতটা নিশানা ভেদ করে আর তারপরে ইস্পাতে প্রতিহত হতে, খুররমও ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে ফলে তাঁর প্রথম আঘাতও বিফলে যায়, প্রতিপক্ষের যোদ্ধা মাথা নিচু করতে তরবারিটা উপরের বাতাস কেটে বের হয়ে যায়। কিন্তু খুররম তারপরেই, দ্রুত ভারসাম্য লাভ করে, পুনরায় তরবারি দিয়ে আঘাত করে, তাঁর তরবারির ক্ষুরধার ফলা লোকটার বুকের লম্বালম্বি হাড়ের ঠিক নিচে তাঁর স্ফীত আর অরক্ষিত উদরের গভীরে আঘাত হানে। সে অস্ত্র আর লাগাম ছুঁড়ে ফেলে এবং নিজের ক্ষতস্থান খামচে ধরে লোকটা তার ঘোড়া থেকে পাথরের মত খসে পড়ে, জটা তার প্রবল ভার থেকে মুক্ত হতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা পরিহার করে সেখান থেকে দ্রুত অন্যদিকে ধাবিত হয়।
খুররম আক্রমণের আকষ্মিকতা শেষে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে দম ফিরে পাবার চেষ্টা করার সময়ে নিজের চারপাশে তাকিয়ে দেখে যে মালিক আম্বারের যোদ্ধারা ক্রমশ আরো বেশি সংখ্যায় লড়াইয়ে যোগ দিচ্ছে এবং সেই সাথে এটাও লক্ষ্য করে যে তার পক্ষের বেশ কয়েকজন সৈন্য মাটিতে আহত বা নিহত অবস্থায় হাত পা ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। সে যেমন আশা করেছিল তাঁদের এই ঝটিকা আক্রমণ ঠিক ততটাই সফল হয়েছে, মালিক আম্বারের যুদ্ধ উপকরণ আর তার শক্তি অনেকটাই তাঁরা আজ হ্রাস করেছে। তাদের অভিপ্রায় এখন যখন অর্জিত হয়েছে তখন এটাই উপযুক্ত সময় তাঁর আর তার অনুগত লোকদের নিরাপদে পশ্চাদপসারণ করা যখন তারা সেটা করতে পারবে। যথেষ্ট হয়েছে, সবাই এখনই ঘোড়ায় চাপো, কামানগুলো অকেজো করা যারা প্রায় শেষ করে ফেলেছে তাদের উদ্দেশ্যে সে চিৎকার করে। আহত কিংবা ঘোড়া হারিয়েছে এমন প্রত্যেককে তুলে নাও আর একটা ঘোড়ায় দু’জন আরোহণ করো কিন্তু তোমরা যখন স্থান ত্যাগ করবে তখন বারুদ বহনকারী শকটের চারপাশে তোমাদের সৃষ্ট বারুদের চিহ্নরেখায় অবশ্যই মনে করে অগ্নি সংযোগ করবে।
সে তার পদাতিক হিসাবে দায়িত্ব পালনরত সৈন্যদের হুড়োহুড়ি করে নিজেদের বাহনের পর্যাণে আরোহণ করতে, সহযোদ্ধাদের পেছনে তুলে নেয়ার সময় সে তাকিয়ে থাকে। দীর্ঘদেহী এক রাজপুত আহত একজন সহযোদ্ধাকে নিজের ধুসর ঘোড়ায় তুলে নেয়া জন্য প্রাণান্ত হচ্ছে তখনই শূন্য থেকে মৃত্যু মুখে নিয়ে দুটো তীর অল্প সময়ের ব্যবধানে নেমে এসে আহত যোদ্ধাকে বিদ্ধ করে, এবং সে পেছনের দিকে উল্টে পড়ে, স্পষ্টতই মৃত্যু ভূমি স্পর্শ করার পূর্বেই হয়েছে। চলে এসো, খুররম উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলে, এবং নিজের কালো ঘোড়ার পাঁজরে গোড়ালী দিয়ে গুতো দেয় যার কালো চামড়া ঘামের সাদা ফেনায় জবজব করছে। সবশেষে যাঁরা শত্রুপক্ষের এলাকা ত্যাগ করবে সে তাদের সাথে অবস্থান করে। সে তীব্র বেগে ঘোড়া দাবড়ের নেয়ার সময়, পেছনের পরিস্থিতি দেখার জন্য নিজের পর্যাণে ঘুরে গিয়ে সে তার পেছনে তাকাতে সে দেখে, মালিক আম্বারের সৈন্যদের ছোঁড়া একটা বর্শা আঘাতে, তার আরেকজন যোদ্ধা নিজের বাহন থেকে কাত হয়ে একপাশে পড়ে যাচ্ছে। হতভাগ্য লোকটার পা রেকাবে আটকে যায় এবং রেকাবের চামড়া ছিঁড়ে যাবার আগে বেশ কিছুটা দূরত্ব সে ঘোড়ার পেছনে ছেচড়ে যায়।
খুররম সহসা অনুভব করে গরম বাতাসের একটা হলকা তার পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এবং আবারও একটা বিকট বিস্ফোরনের শব্দ তাঁর কানে তালা ধরিয়ে দেয়। বারুদবাহী শকটগুলোর একটা অন্তত বিস্ফোরিত হয়েছে। আরেকটা বিস্ফোরণের আওয়াজ ভেসে আসে এবং খুররম তাঁর বাম গালের নাকের কাছে তীব্র একটা যন্ত্রণা অনুভব করে আর তরল কিছু একটা তার মুখের উপর দিয়ে গড়িয়ে ঠোঁটের কাছে আসে। জিনিষটার স্বাদ নোনতা আর তার জীহ্বায় কেমন ধাতব একটা অনুভূতি–রক্ত। সে ঘোড়ায় চেপে ছোটার মাঝেই গালে হাত দিয়ে একটা পাতলা ধাতুব টুকরো টেনে বের করে। সে ভাবে, জিনিষটা সম্ভবত টিনের তৈরি বারুদ রাখার তোড়ং।
সে অচিরেই আবার সেই রিজের চূড়ায় ফিরে আসে যেখান থেকে সে আক্রমণ আরম্ভ করেছিল, যেখানে তাঁর বাকি সৈন্যরা পুনরায় নতুন করে গোষ্ঠীবদ্ধ হচ্ছে। সে তার ঘোড়ার প্রবলভাবে স্পন্দিত হতে থাকা পাজরে করতল দিয়ে মৃদু আঘাত করে জটাকে আদর করে, এবং আবারও নিজের পেছন দিকে তাকালে, সে দেখে যে গুটিকয়েক পিছিয়ে পড়া দলছুট মোগল সৈন্য তখনও মালিক আম্বারের বিভ্রান্ত সৈন্যদের কাছ থেকে পালিয়ে আসছে। একটা ধুসর ঘোড়ার সামনের পা ঢাল দিয়ে উপরের দিকে উঠার সময়ে নিজের দেহের ভারে বেঁকে যায় এবং বিশাল প্রাণীটা ভূপাতিত হয়, পিঠের গাট্টাগোট্টা দেখতে, ধনুকের মত বাঁকানো পায়ের আরোহী সময়মত পর্যাণ থেকে লাফ দিয়ে সরে যায়। খুররম ভালো করে খেয়াল করলে দেখে যে ঘোড়াটার পার্শ্বদেশে তরবারির বিশাল একটা ক্ষত রয়েছে। প্রাণীটা তার উপরে অর্পিত দায়িত্ব ভালোমতই পালন করেছে এবং সাহসিকতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে পিঠের আরোহীকে এত দূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে।
