আকাশের বুক চিরে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর তাঁর বল্পিত গতিতে ধাবমান লোকদের উপরে আছড়ে পড়তে শুরু করে। তাঁর কানের পাশ দিয়ে গাদাবন্দুকের গুলি মৃত্যুর শিস বাজিয়ে যায় আর মালিক আম্বারের প্রতিরক্ষা ব্যুহ থেকে আলোর ঝলকানি আর সাদা ধোয়ার কুণ্ডলী দেখা যেতে বোঝা যায় যে শত্রুপক্ষের গুটিকয়েক তবকি এখন অন্তত গুলিবর্ষণ শুরু করেছে। সে এর কিছুক্ষণ পরেই আরো মন্দ্র একটা অভিঘাত আর উত্তাল তরঙ্গের ন্যায় ধোয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখলে তার মাঝে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকে না যে এইমাত্র মালিক আম্বারের একটা কামানও যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। খুররম দশ গজেরও কম দূরত্বে তাঁর সামনের সারির একজন যোদ্ধাকে–এক তরুণ রাজপুত নিশানা বাহক–তার পর্যাণ থেকে পেছনের দিকে ছিটকে মাটিতে আছড়ে পড়তে দেখে, হতভাগ্য অশ্বারোহী ভূপাতিত হবার সময় তার হাত থেকে সবুজ রঙের মোগল নিশানা ছিটকে যায়। তাকে অনুসরণরত–আরেকজন রাজপুত–অশ্বারোহীর বাহন ভূপাতিত দেহের কারণে হুমড়ি খায় এবং তারপরে নিশানের সাথে পা জড়িয়ে যেতে এটাও মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে, তাঁর রাজপুত সওয়ারীকে মাথার উপর দিয়ে মাটিতে ছিটকে ফেলে এবং তারপরে আরো একটা ঘোড়াকে তার আরোহীসহ ধূলোয় ফেলে দেয়। খুররম ভাবে, মালিক আম্বারের সৈন্যসারি আর মাত্র সোয়া মাইল দূরে রয়েছে। এই দূরত্ব অতিক্রম করতে যে সময় প্রয়োজন সেই অবসরে শত্রুপক্ষ খুব বেশি একটা ক্ষতিসাধন করতে পারবে বলে তার কাছে মনে হয় না। সে তার ঘোড়ার গলার কাছে সহজাত প্রবৃত্তির বশে নুয়ে এসে, সে মালিক আম্বারের কামানের অবস্থান অভিমুখে আরো সরাসরি অগ্রসর হবার অভিপ্রায়ে লাগামে মোচড় দেয় এবং ছোটার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকা কালো ঘোড়ার পাজরে দিনের প্রথমবারের মত গুঁতো দেয়।
সে এরপরেই নিজেকে মালিক আম্বারের সৈন্যসারির মাঝে নিজেকে দেখতে পেয়ে, কামানগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে সেগুলোর কয়েক গজ সামনে একটা ব্যুহ রচনা করে নিজের সহযোদ্ধাদের সাথে অবস্থানরত বেগুনী রঙের পাগড়ি পরিহিত এক তবকীর উদ্দেশ্যে তরবারি কোপ বসিয়ে দেয়। সে ইতিমধ্যে একবার গুলি করেছে এবং সে বন্দুকে পুনরায় গুলি ভর্তি করতে তাঁর পাশে সীসার গুলিভর্তি সাদা সুতির থলে থেকে একটা গুলি নিয়ে ইস্পাতের দণ্ডের সাহায্যে লম্বা ব্যারেলে প্রবেশ করাতে মরীয়া হয়ে চেষ্টা করছে। সে তাঁর আরাধ্য কাজ আর কখনও শেষ করতে পারবে না। খুররমের তরবারি, সেদিন সকালেই অস্ত্রাগারের তত্ত্বাবধায়ক নিখুঁতভাবে শান দিয়ে ধারালো করে তুলেছে, তবকীর মুখের একপাশে আঘাত হেনে বেচারার চোয়াল প্রায় বিচ্ছিন্ন করে তার সাদা দাঁতের সারি অনাবৃত করে ফেলে। হাতের বন্দুক ফেলে দিয়ে লোকটা মাটিতে পড়ে যেতে খুররম পেছনের দিকে একবারও না তাকিয়ে সামনের কামান আর গোলাবারুদবাহী শকটের দিকে দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত অবস্থায় দিকে ছুটে যায়। খুররমের অবস্থান থেকে মাত্র দশ গজ দূরে একটা কামান কানে তালা ধরিয়ে দেয়া শব্দ আর সাদা ধোয়ার মেঘ সৃষ্টি করে গোলাবর্ষণ করে। খুররমের আরেকজন দেহরক্ষীর উদরে গিয়ে গোলাটা আঘাত করতে তার দেহের উপরের অংশ নিমেষে স্থানচ্যুত হয় আর তার রক্তাক্ত ঘোড়াটা সহসা তাল হারিয়ে আরেক দিকে দৌড়ে যায় তখনও তার দেহের নিচের অংশ পর্যাণে বসে রয়েছে।
বারুদের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় কাশতে শুরু করে, তার কান ভোঁ-ভোঁ করতে থাকে, খুররম তার ঘোড়াকে পুনরায় সামনের দিকে অগ্রসর হবার ইঙ্গিত করে, আরেকজন তোপচীকে লক্ষ্য করে তরবারি চালায় যে পাথরের অসম্ভব ভারি কামানের একটা গোলার ওজনে নুয়ে প্রায় বাঁকা হয়ে গিয়ে নিজের অস্ত্রের দিকে যাবার জন্য প্রাণান্তকর পরিশ্রম করছে। পিঠে আঘাত প্রাপ্ত হতে, লোকটার হাত থেকে পাথরের গোলাটা পড়ে যায় এবং তার সাদা রঙের নোংরা জোব্বাটা রক্ত শুষে নিতে থাকলে, সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। এক মিনিট বা সম্ভবত তারও কম হবে–যুদ্ধক্ষেত্রে সময় যেন সহসাই স্থবির হয়ে উঠে–খুররম সৈন্যসারির অন্যপাশে পৌঁছে যায়। নিজের চারপাশে তাকিয়ে সে দেখতে পায় যে আরো অনেক তোপচি হাতের ইস্পাতের দণ্ড ফেলে দিয়ে নিজের অবস্থান পরিত্যাগ করে দৌড়ে পালাতে শুরু করেছে। অধিকাংশের প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয় যেহেতু তাঁর অনুগত অশ্বারোহী যোদ্ধারা তাদের তরবারি নিয়ে পেছন থেকে তাঁদের উপর চড়াও হয় তারা দৌড়াতে করায় বা বর্শা দিয়ে তাদের গেঁথে ফেলে।
খুররমের লোকজন দ্রুত তার চারপাশে সমবেত হতে আরম্ভ করে। ‘তোমাদের ভিতরে যাঁদের কীলক বিতরণ করা হয়েছে সেগুলো কামানের পশ্চাদভাগে সর্বশক্তি দিয়ে ঢুকিয়ে দেবে, সে আদেশ দেয়। যাদের কাছে কাঠের ছোট হাতুড়ি রয়েছে তারা চেষ্টা করবে কামানের সম্মুখভাগের বহনকারী শকটের চাকাগুলো ভেঙে দিতে। আর যাদের উপরে বারুদের চিহ্নরেখা তৈরি করে বারুদ বহনকারী শকটগুলো গুঁড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা আমরা প্রস্থান করার সাথে সাথে কাজ শুরু করে দেবে। তোমাদের কাজের সময়ে মালিক আম্বারের লোকদের আমরা বাকি যারা রয়েছি তারা ব্যস্ত রাখবো।
তার সৈন্যরা ঘোড়া থেকে নেমে যখন কাজ শুরু করবে খুররম একটা তূর্যধ্বনি শুনতে পায় এবং পোয়র স্রোতের মাঝে বিদ্যমান একটা ফাঁক দিয়ে–সে ইতিমধ্যেই বুঝতে পেরেছে যা রণক্ষেত্রকে এমন বিভ্রান্তিকর স্থানে পরিণত করে–সে মালিক আম্বারের বিশৃঙ্খল সৈন্যসারির পেছন থেকে তাঁর একদল অশ্বারোহীকে আবির্ভূত হতে দেখে এবং কৃতসংকল্প ভঙ্গিতে তাঁরই অবস্থানের দিকে হামলা করতে এগিয়ে আসতে দেখে। ‘এসো, আমরা তাঁদের মুখোমুখি হই,’ খুররম চিৎকার করে এবং তাঁর কালো ঘোড়াকে সামনে অগ্রসর হতে ইঙ্গিত করে।
