‘যাত্রা করা যাক, সে তার অশ্বারোহী বাহিনী স্থূলকায় তরুণ সেনাপতি কামরান ইকবালকে বলে এবং তাঁরা যাত্রা শুরু করে। খুররম তার শিবিরের বহিঃসীমানার শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যুহের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করার সময় সে শেষবারের মত দীর্ঘক্ষণ হেরেমের তাবুর দিকে তাকিয়ে থাকে। আরজুমান্দ সেখানে রয়েছে বলে সে খুশি। গতরাতে, আজকের সকালের এই আক্রমণ পরিকল্পনা চূড়ান্ত হবার পরে, আরজুমান্দের প্রশান্ত উপস্থিতি তাঁর দেহমন শমিত করতে সহায়তা করেছে এবং আজকের যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে সে খানিকটা ঘুমিয়ে নিতে পেরেছে। সে কালো ঘোড়ার পাজরে গুঁতো দিয়ে রুক্ষ পল্লীপ্রান্তরের উপর দিয়ে নিজের লোকদের নিয়ে প্রায় বারো মাইল দূরে অবস্থিত নির্দিষ্ট স্থানের দিকে এগিয়ে যায় যেখানে, যদি তার গুপ্তদূতদের অনুমান সঠিক হয়ে থাকে, আজ সকালের মাঝামাঝি কোনো একটা সময়ে মালিক আম্বারের বাহিনীর উপস্থিত হবার কথা।
খুররম সকাল প্রায় নয়টা নাগাদ একটা নিচু রিজের ছায়ায় তাঁর লোকদের নিয়ে যাত্রা বিরতি করে যা তাঁর অনুমিত দিক থেকে যদি মালিক আম্বারের লোকের অগ্রসর হয় তাহলে তাকে তাদের দৃষ্টিপটের আড়ালে রাখবে। সে গিল্টি করা ভঁজু-অগ্রভাগ বিশিষ্ট পর্যাণের উপর থেকে পিছলে মাটিতে নেমে এসে রিজের শীর্ষদেশের দিকে দ্রুত দৌড়ে যায়। শীর্ষের কাছাকাছি পৌঁছাবার ঠিক আগ মুহূর্তে সে পেটের উপর ভর দিয়ে মাটিতে সটান শুয়ে পড়ে এবং উঁকি দেয়। তার কয়েকজন সেনাপতি অচিরেই তার সাথে এসে যোগ দেয়। কয়েকটা ছাগল ছাড়া কেউই নড়াচড়া করছে এমন আর কিছু খুঁজে পায় না। শঙ্কাকুল দৃষ্টিতে দিগন্ত তন্নতন্ন করে প্রায় পৌনে এক ঘন্টা আবেক্ষন করার সময় তার মাথার ভিতরে দুশ্চিন্তার ঝড় বইতে থাকে যে তার গুপ্তদূতেরা হয়তো কোথাও ভুল করেছে বা মালিক আম্বার কোনোভাবে তার অভিপ্রায়ের কথা জানতে পেরেছেন এবং গুপ্তদূতদের বিভ্রান্ত করে নিজের গতিপথ পরিবর্তিত করেছেন বা এমনকি মোগল ছাউনি হয়তো আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তারপরেও খুররমের দৃষ্টিতে কিছুই আটকায় না। সে নিজেই নিজের সাথে তর্ক করতে থাকে তার কি নিজের বাহিনীর একাংশ প্রেরণ করা উচিত শিবিরে সবকিছু ঠিক আছে কিনা দেখে আসবার জন্য কিন্তু শেষে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সে দশ মিনিট পরে পরম স্বস্তির সাথে পূর্বদিকে ধূলোর একটা দেখতে পায়–মালিক আম্বার যেদিক থেকে আসবে বলে সে প্রত্যাশা করেছিল। তাঁর গুপ্তদূতের দলের একজন সদস্য কয়েক মিনিট পরেই, নিরাপদ দূরত্ব থেকে মালিক আম্বারের বাহিনীর উপর পর্যায়ক্রমে নজর রাখার জন্য যাদের আদেশ দেয়া হয়েছিল, তাঁর ঘর্মাক্ত হবার কারণে চিত্রবিচিত্র খয়েরী রঙের ঘোড়ায় চেপে হাজির হয়।
‘তারা কতদূরে অবস্থান করছে?’ খুররম জানতে চায়। গ্রীষ্মের দাবদাহের কারণে দূরত্বের ধারণা অনেক সময় ভ্রান্তিজনক হয়ে উঠে।
‘জাহাপনা, দুই কি তিন মাইল হবে।
‘আমি যা ভেবেছিলাম এটা তারচেয়েও কম। তাঁরা কি ধরনের ব্যুহ বজায় রাখছে?
‘তাদের মূল বাহিনী থেকে প্রায় সোয়া মাইল দূরে পুরো বাহিনীকে ঘিরে নিজেদের গুপ্তদূতেরা বৈরী প্রতিপক্ষের সন্ধানে ভ্রমণ করছে কিন্তু আমি যেখানে অবস্থান করছিলাম সেখান থেকে দেখে অবশিষ্ট বাহিনীকে আমার বেশ শমিত মনে হয়েছে। কামান আর বারুদবাহী শকটগুলো এখনও আচ্ছাদিত রয়েছে–এই বিষয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত।
‘তার মানে আমরা এত কাছে থাকতে পারি সেটা তারা এখনও সন্দেহ করে নি?’
‘জাহাপনা, আমার সেটা মনে হয় না।’
‘বেশ, তাঁরা অচিরেই অবগত হবে, খুররম কথা বলে, রিজ থেকে নামার জন্য সে ইতিমধ্যেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সে চিৎকার করে নিজের সেনাপতিদের ডাকে, আমরা সরাসরি তাদের আক্রমণ করতে যাচ্ছি। সবাই মনে রাখবেন তাঁদের কামানগুলো অকেজো করে দেয়াই আমাদের লক্ষ্য। আমরা তাঁদের যতবেশি সংখ্যক কামান ধ্বংস বা অকেজো করে দিতে পারবো আমরা আমাদের শত্রুর লড়াই করার ক্ষমতা ততবেশি হ্রাস করতে পারবো।’
খুররম সোয়া ঘন্টা পরে নিজের বাহিনীর পুরোভাগে অবস্থান করে মালিক আম্বারের সৈন্যসারির দিকে আস্কন্দিত বেগে ঘোড়া হাকিয়ে এগিয়ে যায়। শুষ্ক মাটির বুকে ঘোড়ার খুরের আঘাতে ঢাকের বোল উঠে আর ছিটকে উঠা ধূলিকণা তাঁদের সওয়ারীর চোখে বিদ্ধ হয় এবং তাঁদের নাক মুখ ধূলোয় কিচকিচ করতে থাকে। খুররম মৃত্যুদায়ী অভিপ্রায়ে অগ্রসর হবার সময় চারপাশ অন্ধকার করে থাকা ধূলোর মেঘের ভিতর দিয়ে দেখতে পায় যে মালিক আম্বারের লোকেরা এতক্ষণে বিপদ বুঝতে পেরেছে। অশ্বারোহী যোদ্ধারা আক্রমণ প্রতিহত করতে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিতে শুরু করে আর তোপচিরা হন্তদন্ত হয়ে কামানের উপর থেকে আবরণ সরাতে থাকে আর কামানের মুখ প্রতিপক্ষের দিকে ঘোরাবার জন্য ষাড়ের পালকে নির্বিচারে চাবুক দিয়ে আঘাত করতে থাকে, যখন অন্যেরা গোলাবারুদ বহনকারী শকট থেকে কামানের গোলা আর বারুদের বস্তা টেনে নামায়। তীরন্দাজেরা রণহস্তীর হাওদায় অবস্থান গ্রহণের জন্য বেয়ে উঠতে থাকে। তবকীরা তাঁদের বন্দুকগুলোকে প্রস্তুত করে এবং সেগুলোর দীর্ঘ ব্যারেল তেপায়ার উপর স্থাপন করে যাতে করে আরো নিখুঁতভাবে নিশানাভেদ করা যায়। খুররম আরো দেখতে পায় সূর্যের আলোয় ঝকঝক করতে থাকা বক্ষস্থল আবৃতকারী বর্ম পরিহিত একদল লোক সৈন্যব্যুহের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ব্যস্তভাবে ঘোড়া নিয়ে ছোটাছুটি করছে। তারা সম্ভবত মালিক আম্বার আর তার আধিকারিকেরা, সৈন্যদের উৎসাহ জোগাচ্ছে আর প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছে।
