খুররম, আরজুমান্দ আর তাদের দেহরক্ষীদের বহনকারী হাতির পেছনে অন্য রণহস্তীগুলো এবার বিন্যস্ত হয়। পুরো দলটা একসাথে কাঠের মালবাহী ভারি শকটে স্থাপিত সূক্ষ কারুকাজ করা ব্রোঞ্জের কামান আর সেগুলোর সাথে ইতিমধ্যে জোয়াল দিয়ে বাঁধা ষাড়ের পালের পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে ধূলিধূসরিত কুচকাওয়াজ ময়দান অতিক্রম করে। সবচেয়ে বড় কামানগুলো টেনে নেয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত দলগুলোয় সর্বোচ্চ সংখ্যক ত্রিশটি ষাড় রয়েছে সবগুলোর শিং মোগল বাহিনীর স্মারক সবুজ রঙে রঞ্জিত, প্রতি তিনটা পশুর জন্য রয়েছে একজন করে চাবুকধারী গাড়োয়ান যাতে কেউ নিজেদের কাজে অবহেলা করতে না পারে। কামানবাহী শকটগুলোর মাঝে মাঝে রয়েছে আট চাকাবিশিষ্ট উট বা খচ্চর বাহিত গোলা-বারুদ বহনকারী শকট, কামানের জন্য যেগুলোতে বারুদের বস্তা রয়েছে, বৃষ্টি আর আদ্রতার হাত থেকে রক্ষা করতে বাগুলো পানিনিরোধক বস্ত্র দিয়ে ভালো করে আবৃত করা রয়েছে আর বস্তাগুলোর পাশেই রয়েছে পাথরের অথবা লোহার তৈরি কামানের গোলা।
খুররম আর তাঁর সঙ্গীদের বহনকারী হাতির বহর অবশেষে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তার উৎকৃষ্ট অশ্বারোহীদের বারো জনের আড়াআড়িভাবে বিন্যস্ত একটা সেনাপুরঃসর অগ্রদলের পেছনে নির্ধারিত স্থান গ্রহণ করে এবং খুররমের আদেশে তাদের প্রত্যেকের পরনে একই ধরনের সোনালী কাপড়ের পোষাক সাথে একই কাপড় দিয়ে তৈরি পাগড়ির শীর্ষভাগে সারসের লম্বা সাদা পালক পতপত করে উড়ছে। গাঢ় বর্ণের ঘোড়া তাদের সবাইকে বহন করছে এবং তাদের বর্শার অগ্রভাগে সবুজ আর সোনালী রঙের নিশান উড়ছে। আমি একটা বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত মালিক আম্বার যখন গুপ্তচর মারফত আমাদের সৈন্য সজ্জার সংবাদ জানতে পারবে, খুররম তার পাশে অবস্থানরত কর্চির উদ্দেশ্যে বলে, সে অনুধাবন করবে একজন সেনাপতি অস্ত্র আর রসদের সংস্থান ছাড়াও জনসমক্ষে নিজেদের উপস্থাপনের মত খুটিনাটি ব্যাপারেও যার মনোযোগ রয়েছে এমন একজনকে তাঁর ভয় পাওয়া উচিত। তারপরে, গর্ব আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর খুররম চিৎকার করে অগ্রসর হবার আদেশ দেয়। দূর্গের প্রাকার থেকে ব্রোঞ্জের তূর্য ধ্বনি ভেসে আসবার সাথে সাথে সেনাপুরঃসর অগ্রদলের মাঝ থেকে অশ্বারূঢ় তূর্যবাদকেরা প্রত্যুত্তর দেয়। তোরণগৃহ থেকে দশ ফুট পরিধির বিরাটাকৃতি নাকাড়াগুলো মন্দ্র শব্দে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয় এবং অশ্বারোহী বাদকদলের লোকেরা ঘোড়ার পিঠের দু’পাশে ঝোলানো ঢাকে সংবদ্ধ বোল বাজাতে শুরু করলে এর সাথে সঙ্গতি রেখে সৈন্যবাহিনীর সারিগুলো ধীরে ধীরে গতিশীল হয়ে উঠে।
দক্ষিণে তপতীর বালুকাময় তীরের দিকে এবং দূর্গ থেকে দূরে বহরটা এগিয়ে যেতে শুরু করলে আরও অশ্বারোহী বাহিনী তাদের সাথে এসে যোগ দেয় আর তারপরে যোগ দেয় নিম্নমানের চলনসই পোষাক পরিহিত কিন্তু তারপরেও পর্যাপ্ত অস্ত্র সজ্জিত পদাতিক বাহিনীর সারি। এঁদের পেছনে থাকে মূল মালবাহী বহরের বিভিন্ন আকৃতির শকট। সবশেষে, যখনই কোনো সেনাবাহিনী যাত্রা আরম্ভ করে, যারা পূর্বে গমন করেছে তাঁদের বাহনের খুর থেকে উত্থিত ধুলার মাঝে কাশতে কাশতে আসে সৈন্যদের প্রয়োজনীয় সেবা করতে উদ্গ্রীব সেনাছাউনি অনুসরণকারী বিশৃঙ্খল আর উচ্ছঙ্খল জনতার একটা দল এবং অস্থায়ী ছাউনিতে তারাই মনোরঞ্জন আর বিশ্রামের সুযোগ করে দেয়। যাত্রার কারণে ক্ষয়ে যাওয়া জুতো আর নতুন পোষাক তৈরি করার জন্য বহরের সাথেই রয়েছে দর্জি আর মুচির দল। তাদের সাথে আরো রয়েছে মিষ্টান্ন বিক্রিকারী হালুইকর আর সুরা বিক্রেতা। তাদের ভিতরে রয়েছে আগুন খেকোর দল, দড়াবাজ আর জাদুকরের পাশাপাশি রয়েছে আত্মমগ্ন দরবেশের একটা দল। প্রাতিজনিক প্রবোধ আর বিমুক্তি দেয়ার জন্য সৈন্যসারির সাথে যোগ দেয় অগণিত বেশ্যা, তাঁদের সবাই দেখতে সুন্দরী বা অল্পবয়সী নয় কিন্তু একবেলার ডাল ভাতের মূল্যের বিনিময়ে তাঁরা নিজেদের দেহ বিক্রি করতে উদ্গ্রীব।
*
খুররম ছয় সপ্তাহ পরে হেরেমের নির্ধারিত তাবুতে আরজুমান্দের সাথে একই শয্যায় শুয়ে থাকা অবস্থায় সে চোখ খুলে এবং দেখে ইতিমধ্যেই তার ঘুম ভেঙেছে। সে তাকে নিজের বাহুর মাঝে আলিঙ্গণ করে, দিনের লড়াইয়ের সময়ে সাবধানতা অবলম্বনের জন্য তার কাছে মিনতি করে। সে সতর্ক থাকবে বলে তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং আশ্বস্ত করে মালিক আম্বারের বাহিনীকে দুর্বল করতে সে কেবল তাদের উপরে একটা ঝটিকা আক্রমণ পরিচালনার পরিকল্পনা করেছে, সে তাঁর উষ্ণ অধর চুম্বন করে। সে তারপরে আলতো করে নিজেকে তাঁর আলিঙ্গন থেকে মুক্ত করে এবং শয্যার কারুকাজ করা নীল পশমের আচ্ছাদনী একপাশে সরিয়ে দেয়। সে উঠে দাঁড়ায়, নিজের নগ্ন পেষল দেহে সবুজ রেশমের একটা আলখাল্লা জড়িয়ে নেয় এবং ভোরের প্রথম আলো অস্থায়ী শিবিরের চারপাশের নিচু পাহাড়ী এলাকাকে সোনালী আভায় গিলটি শুরু করার মুহূর্তে সে মাথা নিচু করে দ্রুত হেরেমের তাবু থেকে বের হয়ে আসে। ভোরের শীতল তাজা বাতাসে শ্বাস নেয়ার জন্য কয়েক মুহূর্ত থমকে দাঁড়িয়ে সে পার্শ্ববর্তী একটা তাবুর দিকে এগিয়ে যায় যেখানে তার কচিঁ যুদ্ধের উপযুক্ত পোষাকে সজ্জিত হতে তাকে সাহায্য করার জন্য অপেক্ষা করছে। খুররম দ্রুত নিজের কারুকাজ করা বক্ষস্থল রক্ষাকারী বর্ম বেঁধে নেয় এবং তাঁর গলাকে সুরক্ষিত রাখতে লোহার জালির তৈরি সঞ্জাবযুক্ত তাঁর চূড়াকৃতি শিরোস্ত্রাণ পরিধান করে। সে মশলা দিয়ে তন্দুরে ঝলসান মুরগী আর গরম দুটো নান দিয়ে দ্রুত প্রাতরাশ সমাপ্ত করে, তারপরে তার কালো ঘোড়ায় আরোহণ করে এবং যেখানে তার শ্রেষ্ঠ অশ্বারোহী যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত প্রায় পাঁচ হাজারের একটা আক্রমণকারী বাহিনী অপেক্ষা করছে সেদিকে দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত অবস্থায় এগিয়ে যায়, আক্রমণ শুরু করার জন্য মুখিয়ে থাকায়, তাঁদের বাহনগুলো অস্থির ভঙ্গিতে মাটিতে খুর দিয়ে আঘাত করছে।
