‘তুমি শারীরিকভাবে যথেষ্ট শক্তিশালী নও। জাহানারার জন্মের সময় তোমায় কঠিন সময় অতিবাহিত করতে হয়েছিল… তোমার এখানে থাকা উচিত যেখানে সবসময়ে সেরা হেকিম পাওয়া যাবে, তোমার আবারও গর্ভধারণ করা উচিত…’।
‘সেরা হেকিম আমাদের সাথেই যেতে পারে। খুররম আমি কাঠের পুতুল নই। আমি এখানে হারেমের স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করি কিন্তু আপনার সাথে একত্রে থাকার আনন্দের সাথে এসব কিছুর তুলনাই চলে না। আমায় যদি নগ্ন পায়ে জাহানারাকে কোলে নিয়ে আপনাকে অনুসরণ করতে হয় আমি করবো আর সেটা খুশি মনেই করবো।’ সে তার কব্জি আঁকড়ে ধরে এবং খুররম তার নখের তীক্ষ্ণতা নিজের পেশীতে বেশ অনুভব করে। সে তাকে কখনও এতটা সংকল্পবদ্ধ দেখেনি, তাঁর কোমল মুখাবয়বে এখন প্রায় যুদ্ধংদেহী একটা অভিব্যক্তি।
‘আমার আব্বাজানের সম্ভবত উচিত আমার বদলে আপনাকে মালিক আম্বারের বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করা–আপনাকে দারুণ হিংস্র দেখাচ্ছে। সে মুচকি হাসে, আশা করে প্রত্যুত্তর দিতে গিয়ে আরজুমান্দও হেসে ফেলবে, কিন্তু তাঁর অভিব্যক্তি সামান্য শীথিলও হয় না। তার এখন কি করা উচিত? পরবর্তী সম্রাট হিসাবে নিজের যোগ্যতা প্রদর্শনের সুযোগ আব্বাজান তাকে দিয়েছেন… সে যদিও সমরবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নিয়েছে, ঘন্টার পর ঘন্টা ওস্তাদের কাছে পূর্ববর্তী মোগল অভিযানের কৌশল অধ্যয়ন করেছে, খঞ্জর, তরবারি, গাদাবন্দুক আর গদা নিয়ে লড়াই করতে জানে কিন্তু সে পূর্বে কখনও কোনো অভিযান পরিচালনা করে নি। তার মনোনিবেশে কোনোকিছু–কোনো ব্যক্তিও–যেন বিঘ্ন ঘটাতে না পারে। সেই সাথে এটাও সত্যি আরজুমান্দকে এখানে রেখে যাবার অর্থ নিজের দেহের একটা অংশকেই নিজের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করা। সে যদি একটা বিষয়ে নিশ্চিত থাকে যে প্রতিটা দিনের শেষে সে এখানে তার জন্য প্রতিক্ষা করছে তাহলে সম্ভবত সে আরও পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে আরও দক্ষতার সাথে লড়াই করতে পারবে। সে নিশ্চিতভাবেই আনন্দিত হবে…
‘খুররম…’ তার নখ আরও গভীরভাবে আঁকড়ে বসে।
সবকিছুই সহসা অনেক সহজ হয়ে যায়। তাদের পরস্পরের কাছ থেকে পৃথক হতে হবে না আর সেও তাকে নিরাপদ রাখার জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই করবে। বেশ। চলো একসাথেই যাওয়া যাক।
‘আর সবসময়েই তাই হবে। তাঁর কণ্ঠস্বর আত্মপ্রত্যয়ে গমগম করে।
১.১০ ‘পৃথিবীর অধিশ্বর’
আগ্রার সাড়ে চারশ মাইল দক্ষিণপশ্চিমে, বুরহানপুরের বেলেপাথরের তৈরি দূর্গ-প্রাসাদের সম্পূর্ণ অবয়ব প্রশস্ত তপতী নদীর শান্ত জলস্রোতে প্রতিফলিত হয়। খুররম শহরটায়-দাক্ষিণাত্যে মোগল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহৃত–মাসখানেক পূর্বে এসেছিল এবং এখন মালিক আম্বারের বিরুদ্ধে তাঁর অভিযান শুরুর বাসনায় কৃতসংকল্প হয়ে পুনরায় শহরটা ত্যাগ করছে। চারতলা বিশিষ্ট হাতির আস্তাবল, হাতিমহল থেকে বাকান ঢালু পথ দিয়ে যূথবদ্ধ হস্তিবাহিনী একপাশে প্রসারিত হয়ে অংশত আবৃতকারী ইস্পাতের বর্মে সজ্জিত হয়ে দূর্গের পাশে অবস্থিত কুচকাওয়াজ ময়দানে সমবেত হতে শুরু করেছে। তাঁদের মাহুতেরা সেখানে জম্ভগুলোর কানের পেছনে বসে, তাদের হাতে থাকা লোহার লোহার দণ্ড দিয়ে অতিকায় প্রাণীগুলোর কানের পিছনে আলতো করে টোকা দিতে তারা হাঁটু ভেঙে বসে পড়লে অন্য সহকারীরা তাঁদের পিঠে গিল্টি করা হাওদা স্থাপন করছে। হাওদাগুলো চামড়া ফালি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা হতে খুররমের প্রধান সেনাপতিরা তাদের কর্চি আর দেহরক্ষীদের নিয়ে সেখানে চার হাত পায়ের সাহায্যে উঠে বসছে, প্রতিটা হাওদায় সাধারণত তিনজন আরোহণ করছে কিন্তু বড় হাতির ক্ষেত্রে সংখ্যাটা চার। ঘর্মাক্ত দেহে কেবলমাত্র সাদা লেঙ্গট পরিহিত অবস্থায় শ্রমিকের দল অন্য হাওদাগুলোয় ছোট ছিদ্রব্যাসের কামান, গজনল তুলছে।
সবার প্রস্তুতি সম্পন্ন শেষ হতে দূর্গের প্রধান তোরণদ্বার খুলে যায় এবং সেখান দিয়ে খুররমের নিজের রণহস্তী বাইরে বের হয়ে আসে। অন্য যেকোনো হাতির চেয়ে বৃহদাকৃতি, এর পিঠে সবুজ চাঁদোয়া বিশিষ্ট একটা হাওদা যেখানে খুররম ইতিমধ্যেই, মাথায় সোনালী গিল্টি করা শিয়োস্ত্রাণ আর ফিরোজা খচিত কারুকাজ করা ইস্পাতের বর্ম পরিহিত অবস্থায় যুদ্ধের জন্য নিখুঁতভাবে সজ্জিত হয়ে, অবস্থান গ্রহণ করেছে। আরো চারটা হাতির একটা দল তাকে অনুসরণ করে। প্রথম হাতিটার হাওদার চারপাশ কারুকাজ করা মসলিনের পর্দা সোনালী ফিতে দিয়ে শক্ত করে বাঁধা রয়েছে আরজুমান্দ বানুকে কোনো ধরনের কৌতূহলী দৃষ্টি থেকে আড়াল করতে; অবশিষ্ট তিনটা হাতির প্রতিটায় চারজন করে কমলা-পাগড়ি পরিহিত রাজপুত যোদ্ধা রয়েছে, খুররমের দেহরক্ষীদের ভিতরে সবচেয়ে বিশ্বস্ত, তার আদেশ অনুযায়ী আরজুমান্দকে যেকোনো ধরনের অপমানের হাত থেকে তারা নিজেদের প্রাণের বিনিময়ে রক্ষা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। চৌকষভাবে অস্ত্র সজ্জিত প্রত্যেক রাজপুত যোদ্ধার সাথে সর্বাধুনিক গাদাবন্দুক ছাড়াও রয়েছে অপেক্ষাকৃত কম প্রাণঘাতি কিন্তু দ্রুত নিক্ষেপযোগ্য তীর আর ধুনক এবং অবশ্যই তরবারি। সযত্ন চর্চিত চওড়া গোফের আড়ালে তাদের মুখে কঠোর একটা অভিব্যক্তি ফুটে রয়েছে। তোরণদ্বারের পাশে সমবেত হওয়া অল্প সংখ্যক মানুষের ভীড়ে সামান্যতম ঝামেলার ইঙ্গিত পেতে, মোগল বাহিনীকে নেতৃত্ব শূন্য করতে বা তাঁদের নেতাকে তার সুন্দরী স্ত্রীর সাহচর্য বঞ্চিত করতে ওঁত পেতে থাকা সম্ভাব্য আততায়ীল সন্ধানে যাকে হয়ত মালিক আম্বার পাঠিয়েছে, তারা সতর্ক দৃষ্টিতে এখনও আবেক্ষণ করছে। সমবেত জনতার মাঝে অবশ্য কেবল ভক্তি ভরে মাথা নত করা আর খালি হাতে হাততালি দেয়া আর হাত নেড়ে বিদায় জানানোই চোখে পড়ে।
