যুদ্ধ উপদেষ্টাদের সভা শেষ হলে জাহাঙ্গীর খুররমকে অপেক্ষা করতে বলে। এই পরাজয় একটা অপমান যার অবশ্যই প্রতিশোধ নিতে হবে। আমরা যদি এটা করতে ব্যর্থ হই তাহলে আমাদের প্রতিবেশীরা এমনকি বিদ্রোহভাবাপন্ন সামন্ত রাজ্যগুলোও ব্যাপারটা থেকে প্রেরণা লাভ করতে পারে। আমি পারভেজকে ফেরত আসতে আদেশ দিচ্ছি। যুদ্ধ করার মত মন মানসিকতা তার নেই এবং ইকবাল বেগ যদিও বিষয়টা উল্লেখ করার মত অবস্থানে নেই কিন্তু আমার অন্য সেনাপতিদের কথা যদি ঠিক হয় তাহলে খুব কম সময়েই সে সংযত অবস্থায় থাকে। আমার মনে হয় শিবিরের চারপাশে যথেষ্ট সংখ্যক প্রহরী মোতায়েন আর তাঁর দেহরক্ষীরা যখন সজাগ এবং বাইরে গিয়ে শক্রর মোকাবেলা করছে তখন তার তাবুতে অনর্থক সময়ক্ষেপন উভয়ের পেছনেই তার সুরাপানের একটা ভূমিকা রয়েছে। সে অভিযানের দায়িত্ব লাভের জন্য আমার কাছে রীতিমত অনুনয় করেছিল এবং আমিও ভেবেছিলাম দায়িত্ব লাভ করলে সে নিজেকে শুধরে নিতে চেষ্টা করবে, কিন্তু আমি ভুল ভেবেছিলাম।
খুররম কোনো উত্তর দেয় না। সে আর পারভেজ যদিও কেবল দুই বছরের ছোটবড়, তাঁরা দুজনে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বড় হয়েছে আর তাদের ভিতরে কখনও কোনো ধরনের ঘনিষ্ঠতা ছিল না। জাহাঙ্গীর আলোচনা চালিয়ে যায়, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি তার পরিবর্তে তোমায় রাজকীয় সেনাবাহিনীর সেনাপতি করে দাক্ষিণাত্যে প্রেরণ করবো। মহামান্য সম্রাজ্ঞী তাই বলেছেন এবং আমিও তার সাথে একমত যে তুমি তার চেয়ে অনেক বেশি যোগ্য। মালিক আম্বারের বিরুদ্ধে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করো এবং তখন দেখবে আরো অনেক সম্মান তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
‘আব্বাজান, আমি আপনাকে নিরাশ করবো না, খুররম, জীবনে প্রথমবারের মত স্বাধীন নেতৃত্ব লাভের উত্তেজনা কোনোমতে গোপন করে, বলে।
‘খুশি হলাম। আজ থেকে তোমার অভিযান শুরু হওয়া পর্যন্ত–যা আমার ইচ্ছা তোমার জন্য নতুন সৈন্য আর উপকরণ প্রস্তুত হওয়া মাত্র শুরু হোক–আমি চাই যুদ্ধ উপদেষ্টাদের প্রতিটা বৈঠকে তুমি উপস্থিত থাকো।
*
আগ্রা দূর্গ থেকে নিজের হাভেলীর সদর দরজা পর্যন্ত পুরোটা পথ খুররমের তূরীয় আনন্দ বজায় থাকে, সেখানে পৌঁছে সে আরজুমান্দকে কি বলবে সেটা চিন্তা করতে গিয়ে তার আনন্দের সলিল সমাধি ঘটে। তাঁদের কন্যা জাহানারার বয়স মাত্র দুই বছর। তাদের দুজনকে এখানে রেখে যাবার চিন্তাটাই অকল্পনীয়। আর তাছাড়া আরজুমান্দ কি বলবে? কিন্তু সে এমন একটা সুযোগের জন্যই অপেক্ষা করেছিল আর তার উচিত সুযোগটা গ্রহণ করা। সে যদি আরজুমান্দের মুখোমুখি হতে না পারে তাহলে শত্রুর মোকাবেলা কীভাবে করবে? সে হেরেমের দিকে অগ্রসর হবার সময় নিজেই নিজের কাছে প্রশ্ন করে।
আরজুমান্দ বরাবরের মতই তার জন্য অপেক্ষা করছিল। আজ তাঁর পরনে নীল রঙের স্বচ্ছ পাজামা আর আঁটসাট কাচুলি যার ফলে তার তলপেট অনাবৃত, এবং তার নাভীমূলে হীরকখচিত একটা পোখরাজ জ্বলজ্বল করছে। তার মনে হয় সে বোধহয় আগে কখনও তাকে এত সুন্দরী দেখেনি, ভাবনাটা আজ এজন্যই যে সম্ভবত সে জানে যে তাঁর রূপ উপভোগের বিলাসিতা থেকে সে অচিরেই বঞ্চিত হতে চলেছে।
সে আশ্লেষে তাঁর অধর চুম্বন করে তারপরে ব্যগ্র ভঙ্গিতে তাঁর দু’হাত ধরে।
‘আরজুমান্দ। আব্বাজান আজ আমায় বিশাল এক সম্মানে ভূষিত করেছেন। তিনি আমায় দাক্ষিণাত্যের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধমান রাজকীয় বাহিনীর অধিনায়কত্ব দান করেছেন। আমি যদি এই দায়িত্ব পালনে সফল হই তাহলে সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে তিনি সর্বসম্মক্ষে আমায় তার উত্তরাধিকার হিসাবে ঘোষণা করবেন…’।
সে কিছুক্ষণের জন্য নির্বাক হয়ে থাকে তারপরে গম্ভীর কণ্ঠে বলে, আমি আপনার জন্য গর্ব অনুভব করছি। আপনি আপনার আব্বাজানের প্রত্যাশা ছাপিয়ে যাবেন। আপনাকে কবে নাগাদ রওয়ানা দিতে হবে?
‘অচিরেই। আমার কেবল একটা বিষয়েই আক্ষেপ থাকবে… যে আমাকে আমার স্ত্রী কন্যাকে এখানে রেখে যেতে হচ্ছে।
আরজুমান্দ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে। আপনাকে কেন এমনটা করতে হবে?
‘আমি তোমায়–পাঁচশো মাইল কিংবা তারও বেশি পথ–যা বিপদসঙ্কুল, গরম আর অস্বস্তিকর সেখানে নিয়ে যেতে পারি না। তোমার সেখানেই থাকা উচিত যেখানে আমি জানবো যে তুমি নিরাপদে রয়েছে।’
‘খুররম, আপনি যখন বলেছিলেন আপনাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে হবে–যে এটা আপনার কর্তব্য–আমি সেটা মেনে নিয়েছিলাম। আমি এখন আপনাকে বলছি যে আমি অবশ্যই আপনার সাথে যাব–কারণ সেটা আমার কর্তব্য–আর আপনার সেটা মেনে নেয়া উচিত। আমার দাদাজান আর দাদিজান পরিস্থিতি যতই বিপদসঙ্কুল হোক সবসময়ে একত্রে থেকেছেন। তাঁরা ভালো করেই জানতেন যে অন্য যেকোনো সম্ভাবনার চেয়ে তাঁদের পৃথক হওয়াটা সবচেয়ে জঘন্য পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে। সম্রাট আর সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নিসাকেই দেখেন–তাঁরা কখনও পরস্পরের কাছ থেকে পৃথক হোন না। তিনি যখন শিকারে যান এমনকি তখনও তিনি তার সাথে থাকেন। সম্রাটের চেয়ে তিনি একজন দক্ষ নিশানাবাজ আর শিকারী। তারা যখন একা থাকেন তখন তিনি তাঁর সাথে একত্রে ঘোড়ার পিঠে পর্যন্ত আরোহণ করেন। আমি নিশ্চিত তিনি যদি যুদ্ধ যাত্রা করেন তাহলে মেহেরুন্নিসাও তাঁর সঙ্গী হবেন। আমি তাহলে কেন ভিন্ন আচরণ করবো?
