‘ইকবাল বেগ, আপনার অভিযানের পুরো প্রতিবেদন আমাদের সামনে পেশ করেন, জাহাঙ্গীর বৃত্তাকারে উপবিষ্ট উপদেষ্টাদের কেন্দ্রে নিজের নির্ধারিত আসনে অধিষ্ঠিত হয়ে বলে।
‘জাহাপনা, আমি খেদের সাথে জানাচ্ছি মালিক আম্বার আমাদের বাহিনীর ললাটে দুর্ভাগ্যজনক এক পরাজয়ের কলঙ্ক এঁকে দিয়েছে। আমরা অতর্কিত আক্রমণের শিকার হয়েছি এবং আমাদের সহস্রাধিক সৈন্য নিহত হয়েছে আর ততোধিক সৈন্য আহত হয়েছে। আমরা বিশাল একটা ভূখণ্ড হারিয়েছি।’
‘আমাকে ঠিক কি ঘটেছিল বিস্তারিতভাবে খুলে বলো, জাহাঙ্গীর আদেশ দেয়, চেষ্টা করে তাঁর অনুভূত উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার কোনো লক্ষণই যেন তার অভিব্যক্তিতে প্রকাশ না পায়।
ইকবাল বেগকে, অবশ্য দৃশ্যত বিপর্যস্ত দেখায়, সে তার অক্ষত হাত দিয়ে নিজে আচকানের প্রান্তদেশ অস্বস্তির সাথে মোচড়ায় নিজের বিপর্যয়ের কাহিনী পুনরাবৃত্তি করার সময়। একদিন সকাল বেলা দাক্ষিণাত্যের পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত সংকীর্ণ এক উপত্যকায় আমাদের অস্থায়ী ছাউনিতে আমার লোকেরা তাদের তৈরি করা রান্নার আগুনের চারপাশে জটলাবদ্ধ হয়ে অবস্থান করে, ওম পোহাচ্ছিল আর ডাল এবং চাপাটি সহযোগে যখন সকালের প্রাতরাশ করছিল ঠিক সেই সময় মালিক আম্বারের অশ্বারোহী বাহিনী অতর্কিতে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আপনার সন্তানের আদেশে মোতায়েন করা আমাদের গুটিকয়েক প্রহরী চৌকিকে শস্য মাড়াইয়ের কস্তুনীর সামনে পড়া তুষের ন্যায় ছত্রভঙ্গ করে তারা আমাদের শিবিরের মাঝে উন্মত্তের ন্যায় বিচরণ শুরু করে, আমরা যখন আমাদের কোষবদ্ধ অস্ত্র আর অন্যান্য উপকরণের জন্য সংবেগে ছুটোছুটি করছি বা তাদের উদ্যত তরবারি আর বর্শার ফলা তাবুর অগ্নিকুণ্ড থেকে তুলে নেয়া জ্বলন্ত কাঠের টুকরোর সাহায্যে প্রতিরোধের চেষ্টা করছি, তারা নির্বিচারে আমাদের অসংখ্য সৈন্যকে হতাহত করে।
জাহাঙ্গীর লক্ষ্য করে ইকবাল বেগ যখন তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছে তাঁর মুখ তখন অশ্রুতে ভিজে গিয়েছে। একদল অশ্বারোহী আমার পুত্র আসিফ আর তাঁর গুটিকয়েক সঙ্গীকে কয়েকটা মালবাহী শকটের কাছে কোণঠাসা করে ফেলে তারা যখন সেসব শকটে রক্ষিত সিন্দুকের অর্থ আর অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। সে আর তার সহযোদ্ধারা যদিও বীরত্বের সাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল কিন্তু তাঁরা লড়াই করছিল মাটিতে দাঁড়িয়ে আর তাঁদের সাথে ছিল কেবল তরবারি। তাঁরা অশ্বারোহীদের আহত করার জন্য তাদের কাছে যেতেই ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, মালিক আম্বারের একজন যোদ্ধা আসিফকে তার বর্শার ধারালো ইস্পাতের ফলায় বিদ্ধ করে। আঘাতটা তাকে হতবিহ্বল করে ফেলে, মালবাহী শকটের কাঠের কাঠামোর এতটাই গভীরে প্রোথিত হয় যে বর্শার অধিকারী সেটা সেখানেই পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়। আমি তার কাছে পৌঁছাবার পূর্বেই আসিফ মারা যায়…’ ইকবাল বেগের কণ্ঠস্বর মিলিয়ে গিয়ে ধারাবাহিত ফোঁপানিতে পরিণত হয়। জাহাঙ্গীর জানে আসিফ ছিল তার একমাত্র জীবিত সন্তান।
ইকবাল বেগ আরেকদফা কথা থামিয়ে নিজের রুমাল দিয়ে মুখ থেকে অশ্রু মোছে এবং ধীরে ধীরে আত্মসংবরণ করে, সে বলতে শুরু করে। সংগঠিত প্রতিরোধের ন্যূনতম সম্ভাবনা নাকচ করে, মালিক আম্বারের লোকেরা এরপর নিজেরা তিনটি দলে বিভক্ত হয়। প্রথম দলটা মনোনিবেশ করে আমাদের যত বেশি সংখ্যক রণহস্তী হত্যা করা যায় সেই প্রচেষ্টায়, তাঁরা জম্ভগুলোর মুখে বর্শার ফলা আমূল বিদ্ধ করে কিংবা স্রেফ তাঁদের শূড়গুলো কেটে দেয় যা ছাড়া প্রাণীগুলো বাঁচতে পারবে না। দ্বিতীয় দলটা আমার ছেলে যে মালবাহী শকটের বহর রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছে সেখান থেকে নগদ অর্থ আর যত বেশি সংখ্যক অন্যান্য উপকরণ তাঁরা বহন করতে পারবে সেই প্রয়াস নেয় এবং তৃতীয় দলটা আমাদের অস্থায়ী শিবিরে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিকুণ্ড থেকে জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে আমাদেরই শিবিরে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারা এরপরে যেমন ঝড়ের বেগে নেমে এসেছিল ঠিক সেই দ্রুততায় ফিরে যায়। আমাদের পক্ষে হতাহতের সংখ্যা এতবেশি ছিল আর সত্যি কথা বলতে আমাদের আত্মবিশ্বাসে এমনই চিড় খেয়েছিল যে তাদের পিছু ধাওয়া করার মানসিকতাও আমাদের তখন ছিল না। আহত পশুর মত নিজেদের ক্ষতস্থান পরিচর্যা করা ছাড়া আমরা কিছুই করতে পারি নি।
‘তাঁরা এত সহজে কীভাবে আপনাদের শিবিরে হামলা করলো? জাহাঙ্গীর কঠো কণ্ঠে জানতে চায়।
‘তারা পাহাড় টপকে এসে আক্রমণ করেছিল বিশাল কোনো বাহিনীর পক্ষে যা অনতিক্রম্য বলে আমরা ধরে নিয়েছিলাম। সেনাপতি মাথা নত করে বলে। জাহাপনা, আমার স্বীকার করে লজ্জা নেই, তাঁরা আমাদের চেয়ে এলাকাটা ভালো করে চিনে।
‘আর আমার ছেলে পারভেজ?’
‘আক্রমণ যখন শুরু হয় তিনি তখনও নিজের তাবুতেই অবস্থান করছিলেন। তার দেহরক্ষী দল সর্তক আর সশস্ত্র ছিল যেমনটা তারা সবসময়েই থাকে। তারা আপনার সন্তানের তাবুর চারপাশে ভালোমতই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। আর তাছাড়া, মালিক আম্বার সহজ লক্ষ্যবস্তুকে আক্রমণের নিশানা করেছিল। আমাদের আরও সর্তক থাকা উচিত ছিল… আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত, জাঁহাপনা।
‘আমি আপনার মনোভাব অনুধাবন করতে পারছি এবং আপনার সন্তান বিয়োগে আমিও আপনার সাথে শোকাগ্রস্থ। যা হবার হয়ে গিয়েছে। মালিক আম্বারের এই ধৃষ্টতা আর আমাদের ভূখণ্ড থেকে তাকে বিতাড়িত করার প্রতি আমাদের এখন নিজেদের সমস্ত প্রয়াস নিবদ্ধ করতে হবে। এটা কীভাবে সর্বোত্তম উপায়ে হাসিল করা সম্ভব আসুন আমরা সবাই মিলে সেটা আলোচনা করি। আমরা আগামীকাল সকালে আমাদের আলোচনা শুরু করবো।
