‘মালকিন, শুয়ে পড়ুন। সুতির ঘামে ভেজা চাদর সে যার উপরে শুয়ে ছিল শক্তিশালী হাত তাকে পুনরায় তার উপরে শুতে বাধ্য করে। সে কোনো কিছু না ভেবেই জানালার কাছে গিয়ে রাতের আকাশ চিরে উৎসবের আতশবাজি দেখার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে বসার চেষ্টা করেছিল। তারা যখন এসব শুরু করবে তার মানে হল যে নতুন বিয়েকে সম্পূর্ণতা দানের সময় আসন্ন…
‘আপনার শরীরকে শীথিল করতে চেষ্টা করুন। ব্যাথার জন্য অপেক্ষা করুন। ধাত্রীদের একজন তাঁর উঠে বসবার চেষ্টাকে ভুল করে সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য শক্তি প্রয়োগের আকাঙ্খ ভেবেছে। আরজুমান্দ নিজেকে চুপ করে শুয়ে থাকতে বলে, ধাত্রীরা তাকে ঠিক যেমন করতে বলেছে।
মালকিন, এবার, চাপ দিন!
নিজের দেহের অবশিষ্ট শক্তিটুকু একত্রিত করে এবং দুপাশ থেকে ধাত্রী দুজন তার দুই কাঁধ শক্ত করে চেপে ধরে থাকলে, আরজুমান্দ তার পক্ষে যত জোরে সম্ভব চাপ দেয়। তার চারপাশের সব কিছু কেমন ঘোলাটে হয়ে যায়। সে তাকিয়ার উপরে আবার এলিয়ে পড়ে। তার কানে ভেসে আসা এই তীক্ষ্ণ স্বরের কান্না কে করছে? এই আতঙ্কিত শব্দটা কি সেই করছে? সে নিজের চোখ বন্ধ করে এবং পালকের মত নির্ভার হয়ে ভাসতে থাকার একটা অনুভূতি তাকে আচ্ছন্ন করে…
‘মালকিন…’ একটা হাত আলতো করে তাঁর কাঁধ স্পর্শ করে। সে ভাবে, নির্ঘাত ধাত্রীদের একজন হবে আর চেষ্টা করে নিজেকে সরিয়ে নিতে। কোনো লাভ হয় না–সে কিছুই করতে পারে না। যেকোনো মুহূর্তে ব্যাথাটা আবার শুরু হবে এবং তার মাঝে ব্যাথাটার সাথে লড়াই করার মত আর বিন্দুমাত্র শক্তি অবশিষ্ট নেই।
‘আমাদের একা থাকতে দাও, আরেকটা উঁচু আর পুরুষ কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। একটা দরজা খুলে আবার বন্ধ হয়ে যায়। সে চোখ খুলে তাকায়। উল্টোদিকের দেয়ালের জানালা দিয়ে চুঁইয়ে প্রবেশ করা সকালের আলোয় প্রথমে তার দেখতে কষ্ট হয়।
‘আরজুমান্দ, তোমার কি নিজের স্বামী আর কন্যাকে কিছুই বলার নেই? খুররম চোখ ধাঁধানো আলোর মাঝ থেকে বের হয়ে আসে। তার বাহুতে কারুকাজ করা সবুজ রেশমের কাপড়ে জড়ানো একটা পোটলা। তাঁর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে সে বাচ্চাটাকে তাঁর বাহুতে আলতো করে শুইয়ে দেয়।
*
শীতের সন্ধ্যাবেলা সূর্য যখন অস্তাচলে যেতে বসেছে এবং জাহাঙ্গীর দ্রুত তার মন্ত্রণা কক্ষের দিকে হেঁটে যাবার সময়, যমুনার পানির দিকে তাকিয়ে তার মনে হয় পানিতে বুঝি কেউ স্বর্ণকুচি মিশিয়ে দিয়েছে, জাফরশানকে সমরকন্দের দেয়ালের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তথাকথিত স্বর্ণবাহী নদী এবং যার কথা সে তার মহান পূর্ব পুরুষ মহামতি বাবরের রোজনামচায় পড়েছে–সে ঠিক যেমন কল্পনা করেছে। মোগলদের জন্য সাম্রাজ্য জয় করতে বাবর প্রাণপণ করে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করতে আশাবাদী এমন লোক সবসময়েই থাকবে। হিন্দুস্তানের লাল মাটিতে তাঁরা তাঁদের সবুজ নিশান প্রোথিত করার পর থেকে বহুবার তাঁদের যুদ্ধ করতে হয়েছে এবং এখন তারা আবারও সেই সম্ভাবনার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সাম্রাজ্যের দক্ষিণ সীমান্ত থেকে প্রাপ্ত শান্তি বিঘ্নিতকারী সংবাদ পর্যালোচনার জন্য সে তার সমর উপদেষ্টাদের বৈঠক আহ্বান করেছে।
দক্ষিণে দাক্ষিণাত্যের মালভূমির ধনী মুসলিম সালতানাত–গোলকুণ্ডা এবং বিশেষ করে আহমেদনগর আর বিজাপুর–সবসময়ে চেষ্টা করেছে নিজেদের স্বাধীনতা আর তারচেয়েও বেশি প্রয়াস নিয়েছে নিজেদের ভূখণ্ডে অবস্থিত রত্নখনির প্রভূত সম্পদ প্রবলভাবে রক্ষা করতে এবং দীর্ঘকাল যাবত মোগলদের জন্য একটা সমস্যা হয়ে রয়েছে। এই রাজ্যগুলো মাঝে মাঝে যদিও পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়, কিন্তু অনেকবারই তারা সম্মিলিতভাবে তাদের অধিরাজের বিরুদ্ধে নিজেদের বাহিনী একত্রিত করেছে। তার মনে আছে আকবর তাকে বলেছিলেন কীভাবে তিনি তাদের মোগল কর্তৃত্বের অধীনে এনেছিলেন আর কীভাবে বিজাপুর এবং আহমেদনগরের শাসকেরা সহসা খাজনা পাঠাতে অস্বীকার করায়, তাদের ভূখণ্ডের কিছু অংশ দখল করার জন্য সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে তাঁদের তিনি ভয় দেখিয়েছিলেন।
দক্ষিণের এই রাজ্যগুলো এখন আবার মোগলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ঝাণ্ডা তুলেছে। শত্রুপক্ষের এবারের সেনাপতি মালিক আম্মার নামে এক অপরিচিত আবিসিনিয়ান। ক্রীতদাস হিসাবে ভারতবর্ষে আগমনের পর সে আহমেদনগরের সুলতানের অধীনে অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ক্ষমতার শিখরে উঠে আসে এবং এখন আহমেদনগর আর বিজাপুর উভয় রাজ্যের শাসকরা তাঁদের পক্ষে মোগলদের বিরুদ্ধে গুপ্ত গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য তাকে নিয়োগ করেছে। মালিক আম্বার নিজের তুচ্ছ অবস্থান থেকে ক্ষমতার শিখরে উঠে আসায় নিশ্চিতভাবেই সংকল্প, উচ্চাশা আর চারিত্রিক দৃঢ়তার অধিকারী হবার সাথে সাথে অবশ্যই একজন চতুর আর দক্ষ যোদ্ধা। জাহাঙ্গীর ভাবে নিশ্চিতভাবেই পারভেজের চেয়ে ধূর্ত, ছয়মাস পূর্বে মালিক আম্বারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে প্রথমবারের মত অবহিত হবার পরে বিদ্রোহ সমূলে দমন করার আদেশ দিয়ে যাকে দাক্ষিণাত্যে প্রেরণ করেছিল।
জাহাঙ্গীর তার মন্ত্রণা কক্ষে প্রবেশ করার সময় তার সেনাপতি আর উপদেষ্টারা তাকে স্বাগত জানাতে উঠে দাঁড়ালে সে তাদের প্রত্যেকের চেহারায় একায়ত অভিব্যক্তি দেখতে পায়। তাদের ভিতরে ইকবাল বেগের দীর্ঘদেহী অবয়ব, পারভেজের সাথে প্রেরিত তাঁর বয়োজ্যেষ্ঠ আধিকারিকদের অন্যতম, তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর মুখাবয়বের বলিরেখায় চরম পরিশ্রান্তির ছাপ। তাঁর একহাতে পট্টি বাঁধা আর সেটা একটা দড়ির সাহায্যে কাঁধ থেকে ঝোলানো রয়েছে। পট্টির উপরে ভেসে উঠা রক্তের ছোপ দেখে বোঝা যায় তার ক্ষতস্থান এখনও পুরোপুরি সারে নি।
