সহসা সে হেরেমের উদ্যান থেকে প্রাসাদের আঙিনাকে পৃথককারী কাঠের উঁচু তোরণদ্বারের ওপাশে ঢালু পথ বেয়ে উঠে আসা ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পায়। খুররম সম্ভবত একটু আগেই ফিরে এসেছে। তূর্যধ্বনির একটা সংক্ষিপ্ত বাজনা তাকে আশ্বস্ত করে তার ধারণাই সঠিক। উদ্যানের দূরবর্তী প্রান্তে অবস্থিত দরজার পাল্লা খুলে গিয়ে তাকে প্রকটিত করতে, সে সাদা কালো টালি বসান পথের উপর দিয়ে তার দিকে দৌড়ে যাবার সময় সে খালি পায়ের তালুতে টালির উষ্ণতা অনুভব করতে পারে। সে তাকে আশ্লেষে জড়িয়ে ধরে কিন্তু চুম্বন না করে এমন এক অব্যক্ত আবেগে তাকে জড়িয়ে থাকে যে তার চোখে মুখে ফুটে থাকা আন্তরিক অভিব্যক্তি সত্ত্বেও সে ঠিকই বুঝতে পারে কোথাও মারাত্মক কোনো একটা ঝামেলা হয়েছে। ‘খুররম, মালিক আমার কি হয়েছে? কি ব্যাপার?’ সে তাকে আলিঙ্গন থেকে মুক্তি দিলে অবশেষে সে জানতে চায়।
‘আমি তোমায় একটা কথা বলতে চাই।’ তাঁর কণ্ঠস্বর কেমন ধারালো শোনায় কিন্তু তার অভিব্যক্তিতে সে তার জন্য ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। ব্যাপারটা যাই হোক না কেন নিশ্চয়ই ততটা খারাপ…
‘আমার আব্বাজান বলেছেন আমার পুনরায় বিয়ে করা উচিত।’
নাহ্…’ মাতৃত্বের সহজাত প্রবৃত্তির বশে সে নিজের উদর স্পর্শ করে। তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করে খুররম তাকে পুনরায় নিজের বাহুর মাঝে টেনে নেয় এবং তাকে নিজের খুব কাছে নিয়ে আসে। আরজুমান্দ…সোনা আমার… এতটা ভেঙে পড়ো না…’
‘মেয়েটা কে?
‘মোঘল সাম্রাজ্যের প্রতি সদিচ্ছার স্মারক হিসাবে রাজকুল বধূ হবার জন্য শাহের প্রেরিত এক পার্সী রাজকন্যা। আমার আব্বাজানের ধারণা তাকে প্রত্যাখান করার বোকামীর পরিচায়ক হবে।
কিন্তু খুররম আপনিই কেন? কেন পারভেজ নয়? সে আপনার চেয়ে বয়সে বড়।
‘আব্বাজানকে ঠিক এই কথাটাই আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি আমাকে বলেছেন যে তার সব সন্তানের ভিতরে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসাবে আমিই যোগ্যতম। খসরু বিশ্বাসঘাতক, পারভেজ সুরা আর আফিমে মাত্রাতিরিক্ত রকমের আসক্ত, আর তরুণ শাহরিয়ার ভীতু আর লাজুক। তিনি বলেছেন যে আমি যদি আদতেই পরবর্তী মোগল সম্রাট হিসাবে অভিষিক্ত হই তাহলে তিনি চান আমার সিংহাসনকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত করতে। শাহের পরিবারের সাথে মৈত্রীর সম্বন্ধ ভবিষ্যতে সহায়তা করবে।
‘আপনি কি উত্তর দিয়েছেন?
‘আমার আর কিইবা বলার আছে? আমি একজন যুবরাজ এবং আমার আব্বাজানের উত্তরাধিকারী হতে আগ্রহী… আমার পক্ষে কেবল নিজের খেয়াল খুশিমত আচরণ করা সম্ভব নয়। আমি তাকে বলেছি যে আমার আর কাউকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করার আগ্রহ নেই–বলেছি যে মনে প্রাণে আমি তোমাকেই আমার স্ত্রী হিসাবে গন্য করি–কিন্তু আমি তাঁর আদেশ পালন করবো।’
আরজুমান্দ নিজেকে তাঁর আলিঙ্গণ থেকে সরিয়ে নেয়। আপনি তাকে কবে বিয়ে করবেন?
‘দরবারের জ্যোতিষী নির্দিষ্ট দিন ঠিক করবে কিন্তু যথাযথভাবে রাজকুমারীর আগ্রায় উপস্থিত হওয়া আর যৌতুকের পরিমাণ নিয়ে সম্মতিতে পৌঁছাবার জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের কথা বিবেচনা করলে বলা যায় আগামী কয়েক মাসের আগে নয়। আমার আব্বাজান পরিকল্পনা করছেন তাকে আর তার সাথে আগত সফরসঙ্গীদের পারস্যের সীমান্তে স্বাগত জানাবার জন্য উপযুক্ত সংখ্যক রক্ষীবাহিনী প্রেরণ করবেন।’
“আর আমাকে কি জাফরি কাটা অন্তঃপটের পেছন থেকে দেখতে হবে যে বাসর শয্যার জন্য তাঁর দেহকে তেল আর সুগন্ধি সিক্ত করতে এবং মেহেদী দিয়ে পরিচারিকার দল তাঁর শরীরে আল্পনা করছে?’ আরজুমান্দের পুরো দেহ এখন থরথর করে কাঁপছে এবং সে আর পরোয়া করে না তার অশ্রু সে এখন দেখল কি না।
‘আমি আর তুমি দুজনেই হতভাগ্য। আমাদের মত অবস্থানের মানুষ জীবনে খুব কমই ভালোবাসার জন্য বিয়ে করে এবং আমার আব্বাজান ইচ্ছে করলে আমাদের বাধা দিতে পারতেন। সাম্রাজ্যের প্রতি আর তাঁর প্রতি নিজের কর্তব্য থেকে আমি কখনও বিচ্যুত হব না। কিন্তু আমি তোমায় একটা প্রতিশ্রুতি করছি–তুমিই আমার পুরো পৃথিবী। তুমি আমার মুমতাজ–এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যেকোনো রমণীর চেয়ে তুমি আমার কাছে অনন্য–তুমি সেই রমণী যাকে আমি আমার সন্তানদের জননী হিসাবে কামনা করি। এই রাজকন্যা কখনও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে না, আমি শপথ করে বলছি। সে এখানে নয় অন্য আরেকটা প্রাসাদে বাস করবে। তাঁর কণ্ঠস্বর সামান্য কেঁপে যায় এবং সে তাকে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ মুছতে দেখে।
খুররমের যেকোনো কথার চেয়ে তাঁর এই সামান্য অঙ্গভঙ্গিই তাকে অনেক কিছু বলে দেয়। কিন্তু আরজুমান্দের কাছে পৃথিবী সহসাই একটা খাপছাড়া জায়গা বলে মনে হয়।
*
সে আগে কখনও এমন যন্ত্রণার সাথে পরিচিত ছিল না–দু’জন ধাত্রীর তত্ত্বাবধায়নে তাঁদের কথা অনুযায়ী দায়িত্ব নিয়ে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করার সময় তার শরীর যে শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করছে কেবল সেটাই নয় এর সাথে যুক্ত হয়েছে মাত্র আধ মাইল দূরে আগ্রা দূর্গে খুররম আরেকজনকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করছে সেটা জানা থাকায় অবর্ণনীয় মানসিক কষ্ট। তার পুরো দেহ ঘামে জবজব করছে এবং ব্যাথায় কুঁকড়ে যাবার মাত্রা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকলেও তাঁর মাথায় কেবল একটা কথাই ঘুরছে যে জাহাঙ্গীর তার ছেলের মাথায় বিয়ের তাজ বেঁধে দিচ্ছেন আর পার্সী রাজকন্যা নেকাবের আড়ালে বসে রয়েছে। মেয়েটা যদি অপরূপ সুন্দরী হয়? খুররম কীভাবে যে মেয়েকে জীবনেও দেখেনি তাকে ভালো না বাসবার প্রতিশ্রুতি দেয়?
