‘আর কথা নয়, খসরু ফিসফিস করে বলে এবং তাকে নিজের কাছে টেনে নেয়।
*
মালকিন। যুবরাজ খুররম আর তাঁর নবপরিণীতা বধূর বাসর শয্যার নিরীক্ষণ সমাপ্ত হয়েছে। বিয়ে সম্পূর্ণ হয়েছে এবং আরজুমান্দ বানু বাস্তবিকই একজন কুমারী ছিল। মেহেরুন্নিসা আর জাহাঙ্গীরের সামনে নতজানু হয়ে খুররমের হেরেমের তত্ত্বাবধায়ক কথাগুলো বলার পরে নতুন দম্পতির সন্ত নি কামনায় প্রথাগত মোনাজাত করে। দোয়া করি আল্লাহতা’লা তাঁদের যেন এত সন্তান দেন যাতে নববধূ রাজবংশের রত্নগর্ভা হিসাবে ভাস্বর হয়ে থাকে। মেহেরুন্নিসা জাহাঙ্গীরের দিকে তাকিয়ে প্রণয়মিশ্রিত হাসি হাসে। সে একজন সম্রাজ্ঞী এবং তাঁর ভাইঝি সম্রাটের প্রিয় সন্তানের স্ত্রী। ভবিষ্যত এত সম্ভাবনাময় আগে কখনও মনে হয় নি…
১.০৯ জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ
‘খুররম, বিবাহিত জীবনের সাথে তুমি মানিয়ে নিয়েছে।’ কথাটা সত্যি, জাহাঙ্গীর শ্বেতপাথরের দাবার ছকের দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিজের পরবর্তী চাল নিয়ে চিন্তা করার অবসরে ভাবে। খুররমকে দেখে পরিতৃপ্ত মনে হয়। জাগতিক সবকিছুর চেয়ে তুমি ভালোবাস এমন একজন রমণীকে খুঁজে পাওয়া বেহেশতের আশীর্বাদ। সে খুবই খুশি যে তাঁর নিজের মত তাঁর সন্তানও এমন আনন্দের সন্ধান লাভ করেছে।
খুররম মৃদু হাসে কিন্তু কোনো উত্তর দেয় না। আরো কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে তার একটা হাতিকে সামনের দিকে দুই ঘর বাড়িয়ে দেয়। জাহাঙ্গীর ছেলের চোখে মুখে ফুটে উঠা সন্তুষ্ট অভিব্যক্তি দেখে বুঝে যে তাঁর ধারণা সে একটা মোক্ষম চাল দিয়েছে। বস্তুতপক্ষে, বেটা তাঁর চালে ভুল করেছে। আর দুটো চাল এবং সে তাহলে কিস্তিমাত করবে।
‘সুখ তোমায় অসতর্ক করে তুলেছে। গত কয়েক মাস তুমি আমার কাছে দাবায় পরাজিত হও নি কিন্তু আজ রাতে তুমি হারবে। দশ মিনিট পরে খেলা শেষ হয় এবং পরাজিত আর খানিকটা হতাশ খুররম উঠে দাঁড়ায়, তাঁর ঘোড়া নিয়ে আসবার আদেশ দেবে। কিন্তু জাহাঙ্গীর মনে কিছু একটা রয়েছে সে বলতে চায়। সে ঠিক নিশ্চিত নয় আরজুমান্দের সাথে তার বিয়ের কয়েক দিনের ভিতরে এমন একটা সংবাদ শুনে তার ছেলের কি প্রতিক্রিয়া হবে এবং সে জানে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টা সে এতদিন স্থগিত করে রেখেছিল। কিন্তু খুররম একজন মোগল যুবরাজ এবং তার অবশ্যই বোঝা উচিত তার আসল কর্তব্য কোথায়…
‘খুররম… তুমি বিদায় নেয়ার আগে আমি তোমায় একটা কথা বলতে চাই।’
কি আব্বাজান?”
সুস্থির হয়ে একটু বসো এবং মন দিয়ে আমি কি বলি শোন। আমি তোমায় যা বলতে যাচ্ছি সেটা আমাদের সাম্রাজ্য এবং আমাদের রাজবংশ উভয়ের জন্যেই মঙ্গলকর।’
খুররমের চোখে মুখে সহসা সতর্ক অভিব্যক্তি ফুটে উঠতে দেখে, জাহাঙ্গীর খানিকটা বিষণ্ণভাবে চিন্তা করে, কি দ্রুত একজনের মন মানসিকতা পরিবর্তিত হতে পারে। তারা কিছুক্ষণ আগেই আগ্রার নিদাঘতপ্ত রাতে পিতা পুত্রের ভূমিকায় কি চমৎকারভাবে দাবা খেলা উপভোগ করছিল। শাসক হওয়া মানে অবিরত একটা দুঃসহ বোঝা বহন করে চলা… সাধারণ মানুষ থেকে একেবারে আলাদা এবং তাঁদের কাছে একেবারে অজানা একটা চাপ সহ্য করা… কিন্তু সে নিজেকে অন্য কোনো পরিস্থিতির মাঝে কল্পনাও করতে পারে না। সে একেবারেই বাল্যকাল থেকেই, যখন সে বুঝতে শিখেছে সে কে, তখন থেকেই সে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হতে চেয়েছে। সে নিশ্চিত, খুররমও ঠিক তাই চায়। এহেন উচ্চাশার সাথে সাথে আসে রাজবংশের প্রতি একটা দায়িত্ববোধ, ব্যক্তিগত জীবনে সেটা যতই অনাকাঙ্খিত বা ধ্বংসকারী হোক। জাহাঙ্গীর গভীর একটা শ্বাস নিয়ে বলতে আরম্ভ করে।
*
আগ্রা দূর্গের নিকটে যমুনা নদীর অর্ধ বৃত্তাকার বাক বরাবর নির্মিত খুররমের হাভেলীর হেরেমের প্রাচীর বেষ্টিত উদ্যানে একটা রেশমের চাঁদোয়ার নিচে একটা লম্বা আর নিচু শয্যার উপরে স্থূপীকৃত তাকিয়ার মাঝে আরজুমান্দ শুয়ে রয়েছে। গ্রীষ্মকালের গনগনে উষ্ণ বায়ুপ্রবাহ শুরু হয়েছে। সে এখানে সেসব অস্বস্তি থেকে নিরাপদ এবং শহরে যারা কাদা বা পোড়ামাটির সাধারণ গুমোট বাড়িতে বাস করে তাদের সে মোটেই ঈর্ষা করে না। মাঝেমাঝে রান্নার আগুন থেকে নির্গত স্ফুলিঙ্গ বাতাসে ঘুরপাক খেয়ে অনেক উঁচুতে উঠে; বাড়িগুলোর শুকনো খড়ের ছাদে আগুন ধরিয়ে দেয়। তাঁর পরিচারিকা তাকে বলেছে যে তিনদিন আগে দুটো বাড়ি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়ে ভেতরে অবস্থানরত মহিলাদের পুড়িয়ে মেরেছে যারা আগুনের লেলিহান শিখার কবল থেকে দৌড়ে বাইরে বের হয় নি পর্দা তথা শালিনতার ভয়ে।
কিন্তু মনখারাপ করা ভাবনার সময় এখন না–যখন সে উফুল্ল থাকে তখনও না। তাঁর দু’হাত নিজের মসৃণ সমতল পেটের উপর আগলে রাখার ভঙ্গিতে রাখা থাকে যেখানে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। সে আট সপ্তাহের গর্ভবতী। খুররমের জন্য তাঁর ভালোবাসা ততটাই পরিপূর্ণ যতটা তার জন্য খুররমের ভালোবাসা। তাকে ছাড়া–সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসবার সাথে সাথে সে যে উত্তেজনা অনুভব করে সেটা ছাড়া–সে এখন আর কোনো কিছু চিন্তাও করতে পারে না এবং জানে যে নিজের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করে সে তার কাছে আসবে। তাঁদের বিয়ের রাতে সে যদিও লাজ ছিল, আজকাল তার শারীরিক আকাঙ্খ খুররমের সাথে পাল্লা দেয়। তার আলিঙ্গনের মাঝে নিজের খুঁজে পাওয়া উদ্দামতার জন্য তাঁর লজ্জা পাওয়া উচিত কিন্তু সে তারবদলে গর্ব অনুভব করে, জানে যে তাকেও সে একই রকম আনন্দ জারিত করে।
