সে ইতিমধ্যে দিনও ঠিক করে ফেলেছে–১০ মে, ১৬১২, তাঁর জ্যোতিষীরা তাকে নিশ্চয়তা দিয়েছে দিনটা নববিবাহিত দম্পতির সর্বাত্মক শান্তি নিশ্চিত করবে। মোগল দরবারে এখন পর্যন্ত যা প্রত্যক্ষ করেছে তাঁর ভিতরে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করাই এখন কেবল তার দায়িত্ব। নিজের সন্তানের খাতিরে সে কেবল এমন আয়োজন করবে না সেই সাথে নিজের পরিবারকে এভাবে সম্মানিত হতে দেখে মেহেরুন্নিসা যে আনন্দ লাভ করবে সেটাও একটা বড় কারণ।
*
খুররম তাঁদের বাসর কক্ষে মিহি তাঁর দিয়ে তৈরি পর্দার কাছেই একাকী দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার পরনে কেবল ব্রোকেডের সুবজ রঙের একটা আলখাল্লা যা কোমরের কাছে একটা সরু সোনার পরিকর দিয়ে বাঁধা, পর্দার পেছনে আরজুমান্দ বানুর পরিচারিকারা তাকে তাঁদের বিয়ের পূর্ণতা অর্জনের জন্য প্রস্তুত করছে। সে নিজের হাতের দিকে তাকায়, সেদিনই সকালে তার আম্মিজান সৌভাগ্যের স্মারক হিসাবে সেখানে মেহেদী আর হলুদের সাহায্যে বিভিন্ন নক্সা এঁকে দিয়েছেন। সে এখনও জ্বলজ্বলে মুক্তোর তৈরি বিয়ের তাজ পরিধান করে রয়েছে যা আব্বাজান তাঁর মাথায় বেঁধে দিয়েছিলেন, সে দূর্গ থেকে হীরক খচিত মাথার সাজ পরিহিত হাতিতে, যা গ্রীষ্মের সূর্যালোকে সাদা আগুনের মত গনগন করছে, উপবিষ্ট হয়ে আসফ খানের প্রাসাদের উদ্দেশ্যে গমনকারী বিয়ের বিশাল শোভাযাত্রাকে অনুসরণ করার জন্য রওয়ানা দেবার ঠিক আগ মুহূর্তে। তাঁর হাতির ঠিক আগেই কুচকাওয়াজ করে এগিয়ে চলেছে তূর্যবাদক আর ঢুলীর দল, পেছনে রয়েছে সোনালী তশতরীর উপরে স্তূপ হয়ে থাকা মশলা বহনকারী পরিচারকদের সারি, তারপরে খুররমের বন্ধু আর দুধ-ভাইয়েরা সবাই একই রকম দেখতে কালো স্ট্যালিয়নে উপবিষ্ট।
বিয়ের অনুষ্ঠান আর আনুষ্ঠানিকতা উদ্যাপন মনে হয় যেন শেষ হবে না–মোল্লাদের সুললিত কণ্ঠের গম্ভীর উচ্চারণ, ফিসফিস করে বিয়েতে আরজুমান্দের সম্মতি প্রদান, গোলাপজলে তাঁর হাত ধুয়ে দেয়ার কৃত্যানুষ্ঠান এবং শুভ মিলন নিশ্চিত করতে হাতলবিহীন পানপাত্র থেকে পানি পান, সবশেষে ভোজসভা আর উপহার আদানপ্রদান। চকচক করতে থাকা পর্দার পরতের আড়ালে তার পাশে বসে থাকা আরজুমান্দের দিকে সে আড়চোখে তাকায় বুঝতে চেষ্টা করে তার মনে কি ভাবনা খেলা করছে। সে শীঘ্রই অবশ্য সেটা জানতে পারবে। সে তাকে প্রায় পুরোপুরি লাভ করেছে… তার হৃৎপিণ্ড ধকধক করে এবং সে বিস্মিত হয়ে অনুধাবন করে কতটা অনিশ্চিত সে বোধ করছে, খানিকটা হয়ত বিচলিত…তার প্রত্যাশা এত বেশি যে তাঁর ভয় হয় সবকিছু বোধহয় মিলবে না। আরজুমান্দ বানুর সাথে সহবাসের অভিজ্ঞতা যদি শেষ পর্যন্ত বিশেষ কোনো দ্যোতনা লাভ না করে তাহলে কি হবে? তার আপন মা, সচরাচর যিনি হাসিখুশি থাকেন, খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা না করার জন্য তাকে সতর্ক করে দিয়েছেন, কিন্তু সে জানে সবকিছুর পরে তাকে শেষ পর্যন্ত নিজের সহজাত প্রবৃত্তির উপরেই ভরসা রাখতে হবে। মেহেরুন্নিসাকে যোধা বাঈ অপছন্দ করেন এবং তার পরিবারের আরেকজন মহিলার সাথে নিজের ছেলের বিয়েকে তিনি স্বাভাবিক কারণে তাই স্বাগত জানাননি। আম্মিজানকে যখন বলা হয় যে মেহেরুন্নিসা জাহাঙ্গীরকে তার শক্তি আর নিঃশ্বাসের সৌরভের কারণে প্রশংসা করেছে তখন সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আম্মিজানকে বলতে শুনেছে যে বহুভোগ্যা একজন রমণীর পক্ষেই কেবল এমন তুলনা করা সম্ভব।
একজন পরিচারিকা অবশেষে হেঁচকা এক টানে পর্দা সরিয়ে দেয়। আরজুমান্দ গজদন্তবর্ণের রেশমের একটা তাকিয়ায় একেবারে নিরাভরণ হয়ে শুয়ে রয়েছে, তার লম্বা চুল কাঁধের উপরে খোঁপা করে বেঁধে দেয়া হয়েছে। তার দেহ সুগন্ধি তেলের কারণে মৃদু দীপ্তি ছড়ায় যা তার ত্বকে মালিশ করা হয়েছে–এই আনুষ্ঠানিকতা উদ্দেশ্য কেবল নববধূকে তার স্বামীর কাছে আকর্ষণীয় করে তোলাই নয় সেই সাথে রতিক্রিয়ার জন্য তাকে প্রস্তুত আর উত্তেজিত করে তোলা। হেরেমের পরিচারিকারা নিজেদের কাজ বেশ ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছে। খুররম তাঁর নিটোল স্ত নযুগলের উঠা নামা, কিশমিশের মত ছোট স্তনবৃন্তের টানটান আকর্ষণ এবং তাঁর চোখের দ্যুতিময়তা লক্ষ্য করে।
‘আমাদের একা থাকতে দাও, সে পরিচারিকাদের আদেশ দেয়ার সময় ঠিকই বুঝতে পারে যে তারা তাদের পাতলা নেকাবের ভিতর দিয়ে কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। সে তারপরে ধীরে শয্যার দিকে এগিয়ে যায় এবং আলখাল্লার পরিকরের বাধন খুলে সেটাকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেয়। সে তাঁর নবপরিণীতা বধূর পাশে শোয়, তার খুব কাছে তাকে স্পর্শ না করে। তাকে পুরোপুরি নিজের করে পাবার আগে সে তাকে কিছু বলতে চায় যদি কথাগুলো বলার মত শব্দ সে খুঁজে পায়। সে এক কনুইয়ের উপর উঁচু হয়ে তার জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখের মণির দিকে তাকায়। আরজুমান্দ। আমার আগামী অনাগত সময়ে যাই লেখা থাকুক আমি তোমায় ভালোবাসব এবং রক্ষা করবো। আল্লাহতালা যতদিন আমাদের একসঙ্গে থাকার ক্ষণ নির্দিষ্ট করেছেন ততক্ষণ আমার নিজের চেয়ে তোমার সুখই আমার কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হবে। আমি শপথ করে বলছি।
‘আর আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আমি নিজেকে আপনার যোগ্য স্ত্রী হিসাবে প্রমাণ করবো। আমার আব্বাজান প্রথম যখন আমাকে বলেন যে আপনি আমাকে বিয়ে করতে আগ্রহী আমি ভয় পেয়েছিলাম… আপনার সাথে আমার যোজন ব্যবধান, আপনি এমন একটা পৃথিবীর মানুষ যা আমার কাছে একেবারেই অজানা…কিন্তু আমার চাচাজানের বিশ্বাসঘাতকতা যখন আমাদের পরিবারের জন্য অসম্মান বয়ে আনে তখনও আপনি আমায় ভুলে যাননি। আজ রাতে আমি নিজেকে আপনার কাছে নিবেদন করবো যতটা সম্পূর্ণভাবে এবং যতটা বিশ্বস্ততার সাথে একজন মেয়ের পক্ষে করা সম্ভব। তার সুন্দর মুখশ্রী প্রায় মলিন দেখায় কথাটা বলার সময়।
