‘এখন!’ জাহাঙ্গীর বলে। তুমি ডানপাশের বাঘটাকে নিশানা করো। আমি বাম পাশেরটাকে সামলাচ্ছি।’
মেহেরুন্নিসা তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা খোঁজাটার কাছ থেকে মোম দেয়া জ্বলন্ত সুতাটা নিয়ে সে তার লক্ষ্যবস্তুর চওড়া বুকে জমে থাকা ছাগলের রক্ত নিশানা করে। সে গুলি করার সাথে সাথে আকষ্মিক তীক্ষ্ণ একটা শব্দ শুনতে পায়, এবং তারপরেই তাঁর গুলিবিদ্ধ বাঘটা একপাশে কাত হয়ে পড়ে যায়, জন্তুটার সাদা গলা তাজা লাল রক্তে ক্রমশ লাল হয়ে উঠে। জাহাঙ্গীরের গুলি করা বাঘটাও প্রায় একই সময়ে বিকট একটা গর্জন করে হুড়মুড় করে মাটিতে আছড়ে পড়ে এবং কিছু সময় থরথর করে কাঁপার পরে নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকে, গোলাপি আর কালচে রঙের জীহ্বা জন্তুটার আধ খোলা মুখ থেকে বের হয়ে থাকে। নতুন এক ধরনের আন্ত্রিক রোমাঞ্চ মেহেরুন্নিসার ভিতর দিয়ে বিদ্যুৎ চমকের মত বয়ে যায়। জ্বলজ্বলে চোখে এবং ঠোঁট ভাঁজ করে সে জাহাঙ্গীরের দিকে ঘুরে তাকায়।
তাঁদের বহনকারী হাতির পেছন থেকে ঠিক সেই সময়ে উচ্চ স্বরগ্রামের একটা প্রলম্বিত চিৎকার ভেসে আসে এবং পিঙ্গল বর্ণের মাদী ঘোড়ায় উপবিষ্ট এক তরুণ কর্চি মাস্কেটের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে তাঁদের পাশ দিয়ে দ্বিগ্বিদিক শূন্য হয়ে ঘোড়া হাঁকায়। তাঁদের হাতিটা আতঙ্কিত হয়ে শুড় উঁচু করে এবং পা নাড়ায় কিন্তু মাহুত কোনোমতে তাকে শান্ত করে। কনুই আর গোড়ালী উন্মত্তের ন্যায় ঝাপটাতে ঝাপটাতে তরুণ অশ্বারোহী বৃথাই লাগাম টেনে ধরতে চেষ্টা করে। হতভাগ্য লোকটাকে নিজের ঘোটকীর মাথার উপর দিয়ে নিখুঁতভাবে সামনের দিকে মৃত বাঘ দুটোর কয়েক গজের ভিতরে আছড়ে পড়ে সেখানেই বিমূঢ়ভাবে শুয়ে থাকতে দেখে মেহেরুন্নিসা আরেকটু হলেই হেসে ফেলেছিল। মেহেরুন্নিসাকে সহসাই সহজাত একটা প্রবৃত্তি অধোমুখ হয়ে পড়ে থাকা তরুণের বদলে উপরে পাথরের দিকে তাকাতে বলে। কালো আর কমলা রঙের কিছু একটা সেখানে নড়াচড়া করছে। ‘আমার অন্য মাস্কেটটা দাও-জলদি!’ হাতে ধরা মাস্কেটটা ফেলে দিয়ে সে খোঁজার হাত থেকে নতুন আরেকটা নেয় এবং দ্রুত দু’বার নড়িয়ে হাওদার প্রান্তদেশে সেটা স্থাপণ করে এবং পাথরের দিকে ব্যারেলটা তাক করে। বাঘটা যখন নিচে পড়ে থাকা পরিচারক যুবককে লক্ষ্য করে, যে তখনও মাটিতে পড়ে রয়েছে, বিশাল একটা বক্ররেখায় লাফ দিতে বোঝা যায় এটা আগের দুটোর চেয়েও বিশালদেহী মেহেরুন্নিসা একেবারে সময়মত নিশানা স্থির করে। সে গুলি চালায়। সে তাড়াহুড়োর কারণে নিজেকে ঠিকমত অবলম্বন প্রদান করতে ভুলে গিয়েছিল এবং মাস্কেটটা থেকে গুলিবর্ষণের সময়ের পশ্চাদাভিঘাত তাকে পিছনের দিকে ছিটকে ফেলে দেয়। সে টলমল করে কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে দেখে বাঘটা পরিচারক ছেলেটার দেহের উপরে, যে এই মুহূর্তে নিজেকে প্রাণপনে মুক্ত করতে চেষ্টা করছে, আড়াআড়িভাবে পড়ে রয়েছে।
দারুণ নিশানাভেদ। তুমি ঠিক আছে তো?’ জাহাঙ্গীর জানতে চায়। জোরে শ্বাস নিতে নিতে সে মাথা নাড়ে। আমায় তুমি সবসময়ে বিস্মিত করো।’ তিনি মেহেরুন্নিসার দিকে নিখাদ প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন। আমার চেয়েও দ্রুত তোমার প্রতিক্রিয়ার গতি।
‘বাঘটা একটা হুমকি ছিল। আমি সহজাত প্রবৃত্তির বশে যা করার করেছি।’
‘বাঘের বদলে যদি একটা লোক থাকতো তাহলেও কি তুমি গুলি চালাতে? হ্যাঁ, যদি সে আমার শত্রু হয়… বা আপনার, তাহলে কেন নয়।
*
খুররম তার হবু-স্ত্রীর এই চিত্রকর্মটা উপহার হিসাবে পেয়ে খুশিই হবে, জাহাঙ্গীর প্রতিকৃতিটা খুটিয়ে অবেক্ষণ করার সময় মনে মনে চিন্তা করে যা মুসক খান, তাঁর দরবারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিত্রকর, তাঁর ব্যক্তিগত আবাসন কক্ষে কারুকাজ করা রোজউডের একটা কাঠামোর উপর সাজিয়ে রেখেছে। ইংল্যান্ড নামে বহুদূরের একটা ছোট রাজ্যের শাসক সম্প্রতি দরবারে কিছু উপহার প্রেরণ করেছেন যার ভিতরে তার নিজের আর তার পরিবারের প্রতিকৃতিও রয়েছে। তাঁদের আঁটসাঁট পোষাক আর উঁচু-চূড়াযুক্ত এবং পালকশোভিত ঢেউ-খেলান প্রান্তযুক্ত টুপিতে যদিও তাদের দেখতে অদ্ভুত লাগলেও, তার চারপাশে যারা রয়েছে তাঁদের প্রতিকৃতি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার ধারণাটা জাহাঙ্গীরের পছন্দ হয়েছে এবং সে বেশ কয়েকটা প্রতিকৃতি তৈরীর নির্দেশ দিয়েছে। মোল্লারা ব্যাপারটা পছন্দ করে নি, তাদের দাবি মনুষ্য সৃষ্টি এমন প্রতিকৃতি স্রষ্ঠার দৃষ্টিতে তাঁর প্রতি কটাক্ষপূর্ণ, কিন্তু তাকে তুষ্ট করতে উদ্গ্রীব কিছু অমাত্যের দল, এখন আবার পাগড়ির অলঙ্কার হিসাবে নিজেদের সম্রাটের প্রতিকৃতির অলঙ্কৃত অনুচিত্র পরিধান করতে আরম্ভ করেছে।
আরজুমান্দের মুখাবয়ব যত্নের সাথে পর্যবেক্ষণ করে, জাহাঙ্গীর মেহেরুন্নিসার সাথে একটা সাদৃশ্য খুঁজে পায়, যদিও তাঁর কাছে মনে হয় তাঁর স্ত্রীর মুখাবয়বে বিদ্যমান ঐশ্বরিক সৌন্দর্য এখানে অনুপস্থিত যা তাঁদের বিয়ের ছয় মাস পরে তাকে এখনও ক্রমাগতভাবে মুগ্ধ করছে। মেহেরুন্নিসার সাথে সে নিজেকে সম্পূর্ণ বোধ করে যেমনটা সে আগে কখনও অনুভব করে নি। তাঁর ভালোবাসা তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। মেহেরুন্নিসা যে কেবল তার মানসিক স্থিতি বুঝতে পারে তাই নয় সে সেটা পরিবর্তনও করতে সক্ষম। সে যদি কখনও বিষণবোধ করে তাহলে সে তাকে হাসাতে পারে। সে যদি কোনো কারণে উদ্বিগ্ন হয় সে। তখন সুন্দর কথা বলেই কেবল তার দুশ্চিন্তা প্রশমিত করে না সেই সাথে বাস্তবসম্মত বিচক্ষণ পরামর্শও দেয়–কখনও কোনো কিছুতেই উত্তেজিত হয় না এবং সবসময়েই প্রাসঙ্গিক। সে তার উজির মাজিদ খান এবং মন্ত্রিপরিষদের বাকি সদস্যদের সাথে সাথে তার পরামর্শ শোনার জন্যও প্রায় সমান সময় ব্যয় করে, যাদের কথা থেকে তাকে ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রণোদিত বক্তব্য থেকে বিজ্ঞ জনোচিত পরামর্শ আলাদা করতে হয়। এক মাসের ভিতরে সে তার পরামর্শ অনুযায়ী আরজুমান্দ বানুর সাথে তাঁর সন্তান খুররমের বিয়ের অনুমতি প্রদান করবে। যোধা বাঈ তাকে বোঝাতে চেয়েছিল যে বিয়েটা মোটেই পাল্টাপাল্টি ঘরে হচ্ছে না কিন্তু তার সংকল্প লক্ষ্য করে সে তার বেশি কিছু বলেনি।
