*
মেহেরুন্নিসা, আধঘন্টা পরে উঁচু-চূড়াযুক্ত একটা রূপালী হাওদায় উপবিষ্ট অবস্থায় আগ্রা দূর্গের ঢালু পথ দিয়ে নিচে নেমে আসবার সময়, উত্তেজনা আর গভীর সন্তুষ্টির একটা যুগপত অনুভূতিতে জারিত হয়। বাঘ শিকারে জাহাঙ্গীরের সাথে যোগ দেয়ার জন্য সে যখন প্রথমবার প্রস্তাব করেছিল, জাহাঙ্গীরের চোখে মুখে নিখাদ বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠেছিল। কোনো রাজকীয় মোগল রমণী এমন কিছু আগে কখনও করে নি, সে কোনোমতে তাকে বলে।
‘কিন্তু কেন নয়? আমি কেন প্রথম হতে পারি না? আমার পক্ষে যতখানি সম্ভব আমি আপনার সঙ্গী হতে এবং আপনার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে চাই। আর তাছাড়া, ব্যাপারটা আমার কাছে দারুণ উত্তেজক বলে মনে হয়েছে।’
‘আমি বিষয়টা ভেবে দেখবো, তিনি তাকে বলেন, কিন্তু সে নিশ্চিত বুঝতে পারে তার অনুরোধ তাকে কৌতূহলী করে তুলেছে। জাহাঙ্গীর পরের দিন তাকে হাতির দাঁতের আর আবলুস কাঠের কারুকাজ করা বাটযুক্ত অবিকল দেখতে একজোড়া মাস্কেট উপহার দেয় এবং তাকে বলে যে সে তার শিকারের জন্য এই বিশেষ হাওদা নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। হাওদাটার চারদিকে প্রশস্ত খোলা জায়গা রয়েছে এবং তাকে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে রাখতে যদিও পাতলা কাপড়ের পর্দার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে পর্দাগুলো বড় বড় পিতলের আংটা থেকে ঝোলানো হয়েছে এবং শিকারের সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তে তাকে তার অস্ত্র তাক করার সুযোগ দিতে সেগুলোকে দ্রুত একপাশে টেনে সরিয়ে দেয়া সম্ভব।
মেহেরুন্নিসা বন্দুক ছোঁড়া মকশো করার সময় জাহাঙ্গীর তার প্রশিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তিনি শিকারের সময় নিজের হাতির পিঠে সওয়ার হয়ে পর্দা ঘেরা হাওদায় তার সাথে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়ায় বিষয়টা তার আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের পেছনে হেরেমের দু’জন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত খোঁজা বসে রয়েছে যারা যত দ্রুত সম্ভব তাদের শিকারের মাস্কেট গুলি ভর্তি করতে সক্ষম।
‘তোমায় উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। জাহাঙ্গীরের ঠোঁট তার গলার পাশে আলতো করে ছোঁয়া দিয়ে যায়।
‘আমি আসলেই খুশি। আজ আমি জীবনের প্রথম শিকার করতে সংকল্পবদ্ধ।
‘আমাদের ভাগ্য হয়ত প্রসন্ন নাও হতে পারে। আজ সকালে আমার শিকারীরা বাঘের যে দলটাকে দেখেছিল তারা হয়ত ইতিমধ্যে অন্যত্র সরে গিয়েছে।
প্রথমে মনে হতে থাকে যে জাহাঙ্গীরের কথাই বোধ হয় ফলতে চলেছে। তাঁদের সামনে দুলকি চালে ছুটতে থাকা শিকারীর দল বাঘের দলটার কোনো নিশানাই খুঁজে পায় না। আগ্রা ত্যাগ করার প্রায় তিনঘন্টা পরে জাহাঙ্গীর হয়তো ফিরে যাবার আদেশ দিতো কিন্তু মেহেরুন্নিসা ব্যাকুল কণ্ঠে অনুরোধ করে, আরেকটু। অনুগ্রহ করে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে দেখি। দেখেন, আজ সকালে যে পাহাড়ের কাছে বাঘের দলটা দেখা গিয়েছিল আমরা প্রায় তার কাছে পৌঁছে গিয়েছি…’
জাহাঙ্গীর তার ব্যগ্রতা দেখে মুচকি হাসে। বেশ, দেখা যাক।
প্রথম দর্শনে গুটিকয়েক কণ্টকযুক্ত ঝোঁপ বিশিষ্ট বালিয়াড়ি-সদৃশ্য প্রান্তর দেখে খুব একটা সম্ভাবনাময় বলে মনে হয় না। বাঘের জন্য এখানে পর্যাপ্ত আড়াল নেই। কিন্তু তারপরেই হঠাৎ পায়ের নিচের মাটি কয়েকটা বিশাল ধুসর রঙের পাথরের দিকে উঠতে শুরু করেছে যার মাঝে তেঁতুল গাছ জন্মায়। তাঁদের বহনকারী হাতিটা সহসাই দাঁড়িয়ে পড়ে এবং জাহাঙ্গীর শিকারীর কথা শোনার জন্য হাওদা থেকে নিচে ঝুঁকে আসে।
‘তাঁরা তাজা পায়ের ছাপ খুঁজে পেয়েছে। তাঁরা সাথে করে নিয়ে আসা ছাগলের একটা মৃতদেহ পাথরের কাছে রাখতে চলেছে, জাহাঙ্গীর কিছুক্ষণ পরে ফিসফিস করে বলে। আমরা এখানে বাতাসের স্রোতের দিকে অপেক্ষা করবো।’
সময় অতিবাহিত হবার সাথে সাথে বাতাসের মৃদুমন্দ প্রবাহ তেঁতুল গাছের মাঝে একটা আলোড়ন সৃষ্টি করে কিন্তু আর কোথাও কোনো শব্দ বা নড়াচড়া দৃষ্টিগোচর হয় না। মেহেরুন্নিসা এরপরেই একটা তীব্র, কস্তরীবৎ গন্ধ পায় এবং জাহাঙ্গীর আরও একবার ফিসফিস করে বলে, তারা আসছেন… চেয়ে দেখো… দু’জন, পাথরের ভিতরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মাস্কেটগুলো আমাদের হাতে দাও এবং মোম লাগানো সুতোয় আগুন জ্বেলে প্রস্তুত রাখো, সে খোঁজা দু’জনকে আদেশ দেয় এবং এক ঝটকায় হাওদার পর্দা সরিয়ে দেয়। মেহেরুন্নিসা দ্রুত ভারসাম্যের জন্য হাওদার প্রান্তে নিজের অস্ত্রের কারুকাজ করা লম্বা ইস্পাতের ব্যারেল আলম্বিত করে এবং পলিতার পাতলা ক্ষুদ্র দৈর্ঘ্য পরীক্ষা করে। তারপরে, জাহাঙ্গীর তাকে যেভাবে শিখিয়েছে সেভাবে সামনের দিকে অবনত হয়ে, সে ব্যারেল বরাবর তির্যকদৃষ্টিতে তাকায়। পাথরের আড়াল থেকে নিশ্চিতভাবেই এইমাত্র দুটো কালো আর কমলা রঙের আকৃতি বের হয়ে এসেছে। বাঘ দুটো, নিজেদের পিঠের অতিকায় চেটালো অস্থির মাঝে মাথা নিচু করে রেখে, ধীরে এবং সতর্কতার সাথে মৃত ছাগলটার দিকে এগিয়ে আসছে। সে জ্বলন্ত মোমের সুতার জন্য পেছনের দিকে হাত বাড়াতে যাবে তখনই জাহাঙ্গীর বলে, না, এখন নয়। তুমি যদি তাড়াহুড়ো করো তাহলে তুমি হয়তো তাদের ভয় পাইয়ে দেবে।
নিজের কানের ভেতর রক্তের দবদব শব্দ শুনতে শুনতে অপেক্ষা করাটা রীতিমত অত্যাচার মনে হয়। বাঘ দুটো ইতিমধ্যে ছাগলের মৃতদেহটার কাছে পৌঁছে গিয়েছে এবং তারা মাংসের ভিতরে নিজেদের দাঁত বসাবার সাথে সাথে সে টের পায় তাঁদের সতর্কতায় একটা ঢিলেমী এসেছে।
