‘পারস্য থেকে তোমার আব্বাজানের কপর্দকশূন্য অবস্থায় মোগল দরবারে আগমন করাটা ছিল একটা অসাধারণ ঘটনা, মেহেরুন্নিসার দেয়া রূপার তবকযুক্ত খুবানির তশতরী থেকে একটা তুলে নেয়ার সময় যোধা বাঈ তাঁর বৃত্তাকার মুখে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে রেখে কথাটা বলে।
‘আমার আব্বাজান ছিলেন একজন অভিজাত ব্যক্তি যার নিজের দেশে অদৃষ্ট কখনও তার উপরে সদয় হয় নি। তিনি ভাগ্যবান মৃত সম্রাটের অনুগ্রহ তিনি লাভ করেছিলেন।
বস্তুতপক্ষে, তোমাদের পুরো পরিবারটাই ভাগ্যবান বলতেই হবে। যোধা বাঈয়ের মুখের হাসি একটু যেন টানটান হয়ে উঠে।
‘সেটা সত্যি কথা, অবশ্য এসব কিছুই আল্লাহতা’লার মেহেরবানি, মানুষের এতে কোনো হাত নেই, মেহেরুন্নিসা প্রত্যুত্তরে বলে এবং খুররমের সুন্দর চেহারার প্রশংসা করে আলোচনার মোড় খুররমের দিকে ঘুরিয়ে দেয়।
যোধা বাঈ, একজন মমতাময়ী আর সন্তানগর্বে গর্বিত মা হবার কারণে খানিকটা নমনীয় হন, কিন্তু তারপরেই সরাসরি মেহেরুন্নিসার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেন, এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ যে আমার সন্তান যেন ভালো কোনো বংশে বিয়ে করে। তার ধমনীতে একই সাথে মোগল রাজবংশ আর ক্ষমতাবান রাজপুত গোত্রের রক্ত বইছে।
মেহেরুন্নিসা শিষ্টাচার বজায় রেখে সম্মতি জানায় কিন্তু সে ঠিকই বুঝতে পারে যোধা বাঈ আসলে কি বোঝাতে চেয়েছে–আরজুমান্দকে বিয়ের ব্যাপারে খুররমের আকাঙ্খ সে সমর্থন করে না। সে এখন বিয়েটাকে পরিণতির দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য আরো অনেক বেশি সংকল্পবদ্ধ।
পারভেজের আম্মিজান তুলনামূলকভাবে মৃদুভাষী। সাহিব জামালের ঘন পাপড়িযুক্ত কালো চোখের মণিতে মেহেরুন্নিসা এক ধরনের উদ্ধত কৌতূহল লক্ষ্য করে, যদিও সে অনেক কম প্রশ্ন করে। সে কেবল নিজের আর নিজের পরিবার সম্পর্কে তাঁর পূর্বপুরুষেরা কীভাবে বাবরের সাথে তাঁর হিন্দুস্তান অভিযানে অংশ নিয়েছিল–কেবল সেই কথাই বয়ান করে। সে একটা বিষয় পরিষ্কার বুঝিয়ে দেয় যে মেহেরুন্নিসা তাঁর কাছ থেকে সামান্যতম ঘনিষ্ঠতা প্রত্যাশা না করলেই ভালো। আমি নিরূপদ্রব, নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করি, সাহিব জামাল বিড়বিড় করে বলে। আমার স্বাস্থ্য খুবই নাজুক আর সঙ্গত কারণেই আমার বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা খুবই সীমিত।
তাদের এই বিদ্বেষের কিছুটা অবশ্য অল্পবয়স্কা, সুন্দর মুখশ্রীর অধিকারী প্রতিপক্ষের প্রতি যৌবনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া দু’জন রমণীর স্বাভাবিক ঈর্ষা। মেহেরুন্নিসা নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে নিজেই হেসে ফেলে। সে জুই ফুলের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছে…সে কোনোমতেই তাদের বৈরীতাকে দ্বারা নিজেকে প্রভাবিত হতে দেবে না এবং সে ইতিমধ্যে ইয়াসমিনার, জাহাঙ্গীরের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সন্তান শাহরিয়ারের উপপত্নী মাতা, সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপন করেছে। সে ছেলেটাকে যতটুকু দেখেছে তাতে তাঁর মনে হয়েছে দেখতে অস্বাভাবিক রকমের সুদর্শন হলেও, অতিরিক্ত প্রশ্রয়ের কারণে ছিচকাদুনে হয়ে উঠেছে এবং যখনই কোনো কিছু তার মনঃপুত হবে সে সোজা দৌড়ে গিয়ে মায়ের কাছে নালিশ জানাবে–যদি তাঁর শিক্ষকদের কথা বিশ্বাস করতে হয় এবং সেইসাথে পড়ালেখায় ভীষণ দুর্বল। তাকে হেরেম থেকে সরিয়ে নিয়ে এবার আলাদা থাকবার বন্দোবস্ত করতে হবে। কিন্তু ইয়াসমিনাকে সে এসব কিছুই বলেনি, স্পষ্টতই ছেলের প্রতি তাঁর প্রবল ভালোবাসা।
সাল্লা তার চুল বাঁধা শেষ করতে, মেহেরুন্নিসা তার আলখাল্লার নিচে লাল মখমলের ময়ানে আবদ্ধ ইস্পাতের হালকা খঞ্জরটার অস্তিত্ব অনুভব করে যা সে পোষাকে নিচে লুকিয়ে রেখেছে। ফাতিমা বেগমের সাথে অবস্থান করার সময় সে নাদিয়ার কাছে হেরেমের অনেক ঝগড়া আর ঈর্ষার কাহিনী শুনেছে। এক অল্পবয়স্ক সুশ্রী রক্ষিতাকে নিয়ে একটা গল্প রয়েছে যাকে তাঁর প্রতিপক্ষ এক খোঁজাকে উৎকোচ দিয়ে পাথুরে বারান্দা থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। আকবরের এক অল্পবয়স্কা স্ত্রীকে নিয়ে অন্য আরেকটা গল্প প্রচলিত রয়েছে যার খাবারে তার এক শত্রু কাঁচের গুড়ো মিশিয়ে দেয়ায় যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে বেচারীর মৃত্যু হয়েছিল। না, খঞ্জর বহন করাকে কোনোভাবেই বাড়াবাড়ি বলা যাবে না বা বাস্তবিক পক্ষেই খাদ্য পরীক্ষক হিসাবে কাউকে নিয়োগ দেয়া যার কাজ হবে বিয়ের উপহার হিসাবে প্রাপ্ত মিষ্টান্ন আর ফলমূল পরীক্ষা করা যা এখনও প্রতিদিন অজস্র পরিমাণে আসছে। অবশ্য সে যখন জাহাঙ্গীরের সাথে আহার করে তখন সে নিরাপদ। সম্রাটের খাদ্য প্রস্তুতকে কেন্দ্র করে বিশদ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে, যার ভিতরে রয়েছে বাদশাহী রাধুনিদের পরিহিত বিশেষ ধরনের খাটো হাতার আলখাল্লা থাকে যাতে করে সবসময়ে তাঁদের হাত দৃশ্যমান থাকে যাতে করে জাহাঙ্গীরের টেবিলে খাবারের পাত্রগুলো বয়ে নিয়ে যাবার আগে রসুইখানায় খাবারের পাত্র বহনকারীদের চোখের সামনে ময়দার লেই দিয়ে সেগুলোর মুখ বন্ধ করার সময় তারা খাবারে বিষের গুড়ো মিশিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে না পারে। সে যখন একা থাকবে বিপদের সম্ভাবনা তখনই আর তাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
