জাহাঙ্গীর উঠে বসে এবং কাঁধের উপর থেকে নিজের কালো চুল আঁকিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসে, তার নগ্ন অবয়বের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ হতে তাঁর মেজাজ আরো একবার হাল্কা হয়ে উঠে। এটা আমাদের বাসর রাতের শয্যা। আমি গম্ভীর বিষয় নিয়ে বড় বেশি কথা বলছি। আমরা এখন কেবল একজন নববিবাহিত পুরুষ আর নববধূ, আর আমি এখন কেবল তোমার সাথে আবারও মিলিত হতে চাই।
মেহেরুন্নিসা তাঁর দিকে দু’বাহু বাড়িয়ে দেয়।
*
সাল্লা চিরুনি দিয়ে তার লম্বা চুল আঁচড়ে দেবার সময় মেহেরুন্নিসা তাঁর চোখ বন্ধ করে রাখে। সে আর্মেনিয়ান মেয়েটাকে তাঁর সঙ্গিনী করতে সমর্থ হওয়ায় সে খুব খুশি হয়েছি কিন্তু মালার হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার চেয়ে সন্তুষ্টিজনক আর কিছুই হতে পারে না। তার বিয়ের তিন সপ্তাহ পরে যমুনা নদী দেখা যায় এমন একটা বুরুজে নিজের নতুন আর বিলাসবহুল আবাসন এলাকায়–যেখানে একসময় জাহাঙ্গীরের দাদিজান হামিদা বাস করতেন–সে খাজাসারাকে ডেকে পাঠায়।
‘তুমি যেভাবে রয়েছে ঠিক সেভাবেই বিদায় নেবে। সবকিছু রেখে যাবে, মেহেরুন্নিসা, মালা তাকে যা বলেছিল ঠিক সেই শব্দগুলোই পুনরাবৃত্তি করে, তাকে বলেছিল। খাজাসারা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
‘কিন্তু আপনি আমাকে বরখাস্ত করতে পারেন না। আমি আমার দায়িত্ব সততা আর বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে পালন করেছি।’
‘তুমি তোমার ক্ষমতা বড্ড বেশি উপভোগ করো।
খাজাসারার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে। সে প্রত্যুত্তরে কিছু একটা বলবে বলে মনে হয় কিন্তু বুঝতে পারে সেটা বলাটা মোটেই বুদ্ধিমানের মত কাজ হবে না এবং মাথা ঝাঁকিয়ে সে চলে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়।
‘তুমি কিছু একটা ভুলে যাচ্ছো।
মালা থমকে যায় এবং সে যখন তার মাথা ঘুরিয়ে পুনরায় মেহেরুন্নিসার দিকে তাকায় দেখে যে তার চোখ ক্রোধের অশ্রুতে চিকচিক করছে। ‘মহামান্য সম্রাজ্ঞী, সেটা কি?
“তোমার কর্তৃত্বের দণ্ড।
মেহেরুন্নিসা বিয়ের অনুষ্ঠানের সময় মেহেদি রঞ্জিত হাত বাড়িয়ে দেয়, এবং মালা অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাতির দাঁতের কারুকাজ করা দণ্ডটা তাঁর দিকে এগিয়ে দেয় তার স্পর্শের কারণে সেটা তখনও উষ্ণ হয়ে রয়েছে।
‘মালকিন–এই জুঁই ফুলগুলি আমি কি আপনার চুলে গেঁথে দেবো? সাল্লা তার আবলুস কাঠের তৈরি চিরুনি বাতাসে আন্দোলিত করে জানতে চায়।
মেহেরুন্নিসা মাথা নাড়ে। সাল্লার চপল আঙুলগুলো নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠতে সে আরো অনেক আনন্দময় স্মৃতির মাঝে নিজের মনকে হারিয়ে যেতে দেয়। জাহাঙ্গীরের সাথে তার বিয়ের রাতটা শের আফগানের সাথে তার যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল সেটা থেকে কতই না আলাদা প্রকৃতির। তাঁর তখন অনেক অল্প বয়স, অনেক অনভিজ্ঞ, বিশেষ করে পুরুষরা যা পছন্দ করে। শের আফগানের কাছে কেবল নিজের সন্তুষ্টিই মূখ্য ছিল। জাহাঙ্গীর একজন কুশলী প্রেমিক কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা সে তার প্রতিটা প্রণয়স্পর্শের মাঝে তার ভালোবাসার আবেগ অনুভব করতে পারে। সে প্রতিদিনই তাকে উপহার পাঠায় এবং তাকে বলে, তোমার যদি কিছু পছন্দ হয় তুমি কেবল মুখ ফুটে সেটা বলবে আর সেটা তোমার হবে। একজন সম্রাজ্ঞী হিসাবে, তার ভাবতে ভালোই লাগে, শ্রেষ্ঠ সবকিছু সে চাইলেই পেতে পারে। সে এই জাঁকালো দরবারে নিজের অবস্থানের যথাযথ প্রয়োগ করতে পারবে।
কিন্তু কি হবে সেই অবস্থান? জাহাঙ্গীর মনেপ্রাণে যা কামনা করে সেই আত্মার আত্মীয় সে কীভাবে হবে? সে হুমায়ুন আর হামিদার মাঝে বিদ্যমান আন্তরিক সম্পর্কের কথা বলেছে। তার কাছে হুমায়ুন আর হামিদা কেবল দুটি নাম, কিন্তু তাকে তাদের ব্যাপারে আরও অনেক কিছু জানতে হবে, জাহাঙ্গীর তাকে যেভাবে কামনা করে তাকে চেষ্টা করতে হবে সেভাবে নিজেকে পরিবর্তিত করতে আর তার মাঝে দিয়েই সে নিজের অস্থির আকাঙ্খা আর উচ্চাশাগুলো পূরণ করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা তাঁর প্রতি তাঁর ভালোবাসা যেন বজায় থাকে। সেটা ছাড়া আর কিছুরই কোনো মূল্য নেই…।
তার জন্য–এবং তাঁর পরিবারের জন্য এই মুহূর্তে সম্ভাবনাগুলো-অসীম বলে প্রতিয়মান হয়। জাহাঙ্গীর তার আব্বাজানকে রাজকীয় কোষাধ্যক্ষ হিসাবেই কেবল পূর্নবহাল করেন নি সেই সাথে নতুন অনেক খেতাবে তাকে ভূষিত করেছেন যার ভিতরে রয়েছে ইতিমাদ-উদ-দৌলা উপাধি, যার মানে সাম্রাজ্যের স্তম্ভ। খুররমের সাথে আরজুমান্দের বিয়ের ব্যাপারে সে অচিরেই উদ্যোগ নেবে কিন্তু কোনো তাড়াহুড়ো করতে যাবে না… কেউ যেন বলতে না পারে যে নতুন সম্রাজ্ঞী অধিষ্ঠিত হতে না হতেই তিনি নিজের পরিবারের সমৃদ্ধির জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। হেরেমে যদিও সবাই এখন তার সাথে শ্রদ্ধাপূর্ণ আচরণ করে, সে জানে জাহাঙ্গীরের সাথে তার বিয়ের ফলে নিশ্চিতভাবেই অনেকেই নারাজ হয়েছে। জাহাঙ্গীরের অন্যান্য স্ত্রীদের মত তার জন্ম কোনো অভিজাত বংশে হয় নি। খুররমের আম্মিজান, যোধা বাঈ, একজন রাজপুত রাজকুমারী, অন্যদিকে তাঁর বড়ভাই পারভেজের আম্মিজান, সাহিব জামালের জন্ম প্রাচীন এক মোগল অভিজাত বংশে। তাঁদের সাথে এখন পর্যন্ত তাঁর কেবল একবারই দেখা হয়েছে–উভয়েই তাঁর আবাসিক এলাকায় সৌজন্যমূলক দেখা করতে এসেছিল–সে তখন তাদের আনুষ্ঠানিক শিষ্টাচার আর রসিকতার নিচে চাপা তাচ্ছিল্য আর সতর্কতা আঁচ করতে পেরেছে।
