হেরেমে মান বাঈয়ের কক্ষের কাছাকাছি পৌঁছাতে, সহসা সে বিলাপধ্বনি শুনতে পায়। সে ভিতরে প্রবেশ করতে, একহাত প্রসারিত করে, ডিভানের উপর নিখুঁতভাবে শুয়ে থাকা একটা আকৃতির চারপাশে তার রাজপুত পরিচারিকাদের জটলা করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তাঁর প্রথম স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেছে এটা জানার জন্য জাহাঙ্গীরকে কারো সাথে কোনো কথা বলতে হয় না।
সে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তাঁর মনে সন্দেহ, মর্মপীড়া আর আত্মনিন্দার একটা ঝড় বইতে থাকে। সে তাকে প্রথমবার যখন দেখেছিল সেই মান বাঈয়ের স্মৃতি-তরুণী এবং তাকে তার অশুভ সত্ত্বা দখল করার আগে ভালোবাসা আর বেঁচে থাকার জন্য কাঙাল-হুহু করে তার চোখের সামনে ভেসে উঠে। সে একটা সময়ে তাকে পছন্দই করতে এবং কখনও তার ক্ষতি চায় নি, এমন নির্মম মৃত্যুর প্রশ্নই উঠে না। তাঁর চোখের কোণে অশ্রুবিন্দু টলটল করতে থাকে, কিন্তু সে চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার আত্মহত্যায় তাকে কোনোভাবেই দায়ী করা যাবে না। খসরু নিজের জীবনের সাথে সাথে আরও অনেকের জীবনই ধ্বংস করেছে, এবং সে, একমাত্র সেই নিজের হঠকারীতা আর স্বার্থপর উচ্চাশার দ্বারা নিজের মায়ের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। জাহাঙ্গীরের মুখের অভিব্যক্তি কঠোর হয়ে উঠে। সে আর কখনও নিজের পরিবারের কোনো সদস্যকে সুযোগ দেবে না তার রাজতুকে হুমকির সম্মুখীন করে বা তার সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
‘অন্তেষ্টিক্রিয়ার জন্য চিতা নির্মাণের আদেশ দাও। মান বাঈকে তাঁর হিন্দু ধর্ম অনুসারে দাহ করা হবে কিন্তু সেই সাথে সম্রাটের স্ত্রী হিসাবে তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেখান হবে, সে গম্ভীরভাবে বলে এবং তারপরে একটা কথা না বলে কামরা থেকে বের হয়ে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়।
১.০৮ ‘প্রাসাদের নূর’
জাহাঙ্গীর তাঁদের বিয়ের পরের দিন সকালে অলসভাবে আড়মোড়া ভাঙে তারপরে তার পাশে নিরাভরণ হয়ে শুয়ে থাকা মেহেরুন্নিসার দিকে মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। তাঁর ত্বকের মুক্তোর মত আভা দেখে তার দিকে আড়াআড়িভাবে ঘুরে থাকা তার কোমর স্পর্শ করতে তাঁর খুব ইচ্ছা হয় কিন্তু সে তার ঘুম ভাঙাতে চায় না। ঘুমন্ত অবস্থায় তাঁর নিটোল স্তনের উঠা নামা, পুরু ঐ ঠোঁট, ছোট খাড়া নাক আর চওড়া ভ্রু যুগল দেখতে তার ভালোই লাগে। সে নিশ্চিত, তার কমনীয় মুখশ্রী দেখতে তার ভিতরে কখনও বিরক্তি উদ্রেক হবে না। সে নিশ্চিত, দ্বিতীয়বারের মত খসরুর বিদ্রোহ প্রচেষ্টা দমন আর মান বাঈয়ের মৃত্যুর ঠিক পরপরই, তাদের বিয়েটা অবশ্যই তার জীবন আর তাঁর রাজত্বকালের একটা নতুন সূচনার স্মারক হয়ে থাকবে। সে তার নিজের এবং তাঁর সাম্রাজ্যের জন্য যত স্বপ্ন দেখেছে সবকিছু সে তাকে পাশে নিয়ে সফল করবে।
মেহেরুন্নিসা সহসাই তার বড় বড় চোখ দুটো খুলে সরাসরি তার দিকে তাকায়।
‘তোমার কাছে আমি একটা ওয়াদা করতে চাই,’ সে বলে।
‘সেটা কি?
‘সেটা হল যে আমি আর কখনও বিয়ে করবো না। আমার যদিও আরও অনেক স্ত্রী রয়েছে কিন্তু তুমিই হবে আমার শেষ স্ত্রী। মেহেরুন্নিসা তাকে চুম্বন করার জন্য সামনের দিকে ঝুঁকে আসে কিন্তু নিজের অভিপ্রায়ে সফল হবার আগে সে বলতেই থাকে, দাঁড়াও মেয়ে আমার আরও কিছু বলার আছে। আমাদের বিয়ে স্মরণীয় করতে দরবারে আজ থেকে সবাই তোমায় নূর মহল হিসাবে জানবে।’
মেহেরুন্নিসা উঠে বসে। নূর মহল মানে প্রাসাদের আলো। এটা একটা বিশাল সম্মানের…’
‘আমার রক্ষিতাদের মত কথা বলো না, যাদের মুখে মুখ আর অন্তরে অভিলাষ আর ছলনা। সে এমনভাবে তাকায় যেন সে ভেবেছিল তিনি তাঁর সাথে ঠাট্টা করছেন কিন্তু তিনি মোটেই ঠাট্টা করছেন না এবং বলতে থাকেন, তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর, তোমার কৃতজ্ঞতা আমি চাই না। এই উপাধিটা আমি পছন্দ করেছি কারণ তুমি আমার জীবনে আলোকচ্ছটা বয়ে এনেছো। তোমার জন্য দরবারের একজন অলঙ্কার প্রস্তুতকারী তোমার নতুন নামযুক্ত একটা সীলমোহর প্রস্তুত করছে–হাতির দাঁতের উপর পান্নাখচিত… এটা আমার হৃদয়ে এবং আমার দরবারে তুমি যে স্থান দখল করে রেখেছো সেটা প্রকাশ করবে। কিন্তু আমার কাছে তুমি সবসময়ে মেহেরুন্নিসাই থাকবে। আমার এখনও মনে আছে আমার মরহুম আব্বাজানের দর্শনার্থী কক্ষের একটা স্তম্ভের পেছনে দাঁড়িয়ে আমি তোমার আব্বাজানকে পারস্য থেকে তার যাত্রার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে শুনছি–কেমন করে, তুমি ভূমিষ্ঠ হবার প্রায় সাথে সাথে, তিনি এমন বেপরোয়া পরিস্থিতির ভিতরে ছিলেন যে তোমায় তিনি পরিত্যাগ করেছিলেন, এবং কীভাবে বৈরী আবহাওয়া আর নেকড়ের মুখে তোমায় ফেলে যাবার ভাবনা সহ্য করতে না পেরে তোমার জন্য আবার ফিরে এসেছিলেন… আমার কাছে তখন মনে হয়েছিল যদিও আমি তখন কেবলই একজন বালক যে অদৃষ্ট তোমার জীবনে একটা ভূমিকা পালন করেছে। অদৃষ্ট আমার পরিবারেও ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করে। আমার প্রপিতামহ বিশ্বাস করতেন যে এখানে এই হিন্দুস্তানে একটা সাম্রাজ্যের সন্ধান পাওয়া তাঁর অদৃষ্টে রয়েছে। আমার আর আমার সন্তানদের অদৃষ্ট উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সেই সাম্রাজ্যের উন্নতি বিধান করা।
‘আমি আপনাকে সাহায্য করবো, মেহেরুন্নিসা বলে, প্রতিটা শব্দ সে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে। নিয়তি তাকে প্রভাব আর প্রতিপত্তি লাভের একটা সুযোগ দান করেছে তার মত খুব মেয়েই যা লাভ করে এবং সে সুযোগটা হাতছাড়া করবে না।
