বিশ্বাসঘাতকতা পুরষ্কার সম্বন্ধে সবার সম্যক ধারণা থাকা উচিত বিবেচনা করে আমি তৃণভূমি এলাকায় প্রচলিত প্রাচীন মোগল শাস্তির একটা তাকে দেই, গোয়ালিওর দূর্গের নিচে অবস্থিত বিশাল কুচকাওয়াজ ময়দানে আমি সেনাছাউনি আর শহরের লোকদের সমবেত হবার আদেশ দেই। তোরণগৃহ থেকে দামামার বাদ্যের সাথে আমি সাদ আজিজের চার হাত পায়ের সাথে শক্ত করে বুনো স্ট্যালিয়ন বাঁধার আদেশ দেই। প্রহরীরা ঘোড়ার লাগাম ছেড়ে দেয় এবং চাবুকের আঘাতের বল্পা চালে ঘোড়াগুলোকে ছুটতে বাধ্য করে যাতে করে সাদ আজিজের চার হাত পা তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসে। আমি তাঁর চার হাত পা দূর্গের চারটা প্রবেশ পথের প্রতিটায় একটা করে স্থাপন করি আর তার দেহ আর মস্তক বাজারে প্রদর্শন করার জন্য রাখা হয়।
ইয়ার মোহাম্মদের বাম গালের সীসা-রঙের ভয়ঙ্কর ক্ষতচিহ্ন বিশিষ্ট সরু মুখটা ভাবলেশহীন দেখায় যখন সে তার কার্যবিবরণী পেশ করে। জাহাঙ্গীর এক মুহূর্তের জন্য তাঁর নিযুক্ত শাসনকর্তার নিষ্ঠুরতার বিষয়ে নিজের কাছেই প্রশ্ন করে কিন্তু সে যা করেছে সেটা করার এক্তিয়ার তার রয়েছে। সাদ আজিজকে দোষ স্বীকার করার যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তার যন্ত্রণাদায়ক আর লজ্জাজনক মৃত্যু দেখে যদি অন্যরা বিদ্রোহের ভাবনা থেকে নিজেদের বিরত রাখে তাহলে কাজটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে। বস্তুত পক্ষে একটা বিষয় জেনে তাঁর ভালো লাগে যে মাত্র তিনমাসের ভিতরে সে তার সন্তানের বিদ্রোহ প্রচেষ্টা পুরোপুরি নস্যাৎ করতে সক্ষম হয়েছে। এরপরেও অবশ্য পরবর্তী প্রশ্ন জিজ্ঞেস করাটা তার জন্য খুব কঠিন হয়।
“আর যুবরাজ খসরু?
‘আপনি ঠিক যেমন আদেশ দিয়েছিলেন ঠিক সেভাবেই শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে। আপনার প্রেরিত হেকিম, যিনি বাস্তবিকই এসব বিষয়ে ভীষণ দক্ষ, প্রথমেই যন্ত্রণা লাঘব করার জন্য তাকে আফিম দিয়েছিল। তারপরে আমার চারজন শক্তিশালী সৈন্য তাকে মাটিতে চেপে ধরে এবং পঞ্চমজন তাঁর মাথাটা শক্ত করে ধরে রাখে যাতে নড়াচড়া করতে না পারে যখন হেকিম রেশমের মজবুত সুতো দিয়ে তার চোখের পাতা একসাথে শক্ত করে সেলাই করে দেয়। যুবরাজ তার চারপাশের পৃথিবীর কিছুই দেখতে পাবেন না এবং জাহাপনা আপনার আর আপনার সাম্রাজ্যের শান্তির জন্য তিনি এখন আর কোনো হুমকি নন।
জাহাঙ্গীরের কাছে ভাবতে খারাপই লাগে যে তাঁর সুদর্শন আর প্রাণবন্ত ছেলেটার এমন পরিণতি হয়েছে কিন্তু সে নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেয় যে সে নিজেই এই পরিণতি ডেকে এনেছে। অন্ধ করে দেয়াটা মোগলদের আরেকটা ঐতিহ্যবাহী শাস্তি দেয়ার পদ্ধতি যা তাদের সাথেই মধ্য এশিয়া থেকে হিন্দুস্তানে এসেছে। একজন শাসক এই পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে নিজের পরিবারের অবাধ্য সদস্যদের হত্যা না করে তাদের নিষ্ক্রিয় করতে পারেন। তাঁর উজির মজিদ খান তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল যে এভাবেই তার দাদাজান হুমায়ুন নিজের সৎ-ভাইদের ভিতরে সবচেয়ে দুর্দমনীয়, কামরানের সমস্যার সমাধান করেছিল। জাহাঙ্গীর বিষয়টা নিয়ে যতই চিন্তা করেছে ততই তাঁর কাছে মনে হয়েছে এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত শাস্তি হতে পারে। কামরানের ক্ষেত্রে তার চোখের মণিতে সুই দিয়ে এঁফোড় ওফোঁড় করার পরে তাতে লবণ আর লেবু ঘষে দিয়ে চিরতরে তাঁর দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। খসরুর চোখের পাতা কেবল সেলাই করে দেয়া হয়েছে, তার সন্তান যদি কোনোদিন সত্যিই নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয় সে তখন তাহলে হেকিমকে আবার তাঁর চোখের পাতা খুলে দেয়ার আদেশ দিবে।
জাহাঙ্গীর সহসা একটা শব্দ শুনে ঘুরে দাঁড়িয়ে কক্ষের প্রবেশ পথে সন্ত্রস্ত দর্শণ এক কর্চিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে।
‘জাহাপনা-’ সে বলতে শুরু করে, কিন্তু মাঝপথেই থেমে যায়।
‘আমি আদেশ দিয়েছিলাম যে আমাকে যেন কোনোভাবেই বিরক্ত করা না হয়, আমি ইয়ার মোহাম্মদের সাথে একা আলাপ করতে চাই।’ জাহাঙ্গীর ক্রুদ্ধ চোখে অল্পবয়সী ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘আমি হেরেম থেকে একটা জরুরি সংবাদ নিয়ে এসেছি।’
‘সেটা কি?’ জাহাঙ্গীর ভাবতে গিয়ে সহসাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে, মেহেরুন্নিসার কি কিছু হয়েছে।
‘মহামান্য সম্রাজ্ঞী, মান বাঈ। তাঁর পরিচারিকা তাকে তার বিয়ের পোষাকে নিজের শয্যায় শায়িত অবস্থায় খুঁজে পেয়েছে। তাঁর শয্যার পাশে আফিম মিশ্রিত পানির একটা বোতল পড়ে ছিল। তাঁদের ধারণা তিনি মাত্রাতিরিক্ত সেবন করেছেন–বোতলে কেবল তলানি পড়ে ছিল।
জাহাঙ্গীরের মনটা করুণার সাথে সাথে বিরক্তিতে ছেয়ে যায়। মান বাঈ সবসময়েই অস্থিরপ্রকৃতির কখনও কখনও উন্মত্ত, এবং তার প্রথম স্ত্রী হবার কারণে একটা সময়ে সে পরবর্তীতে যাদের বিয়ে করেছে তাদের পাগলের মত ঈর্ষা করতো। সে একাধিকবার নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করে তার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছে। সে নিশ্চয়ই তার সন্তান খসরুর অন্ধত্বের কথা শুনেছে। গোয়ালিওর থেকে ইয়ার মোহাম্মদের সাথে আগত পরিচারিকাদের একজন নিশ্চয়ই শাস্তির কথা আলোচনা করেছে এবং খবর দ্রুত দেখা যাচ্ছে বেশ তড়িৎ গতিতে ছড়িয়েছে। নিজের সন্তানের প্রতি মান বাঈয়ের অন্ধ স্নেহের কারণে তিনি সবসময়ে ছেলের অপরাধের গুরুত্ব অস্বীকার করেছেন। তিনি সবসময়ে তাকে অবাধ্য, একটু বেশিমাত্রায় প্রাণবন্ত হিসাবেই দেখেছেন। খসরুর উচ্চাশার রক্তলোলুপ গভীরতা এবং সেটা অর্জন করার জন্য সে কত কিছু করতে পারে, তিনি কখনও বোঝার চেষ্টা করেন নি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনি জাহাঙ্গীরের কাছে বারবার অনুরোধ করেছেন খসরুকে ক্ষমা করতে, কখনও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন কখনওবা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। আফিম সেবন সম্ভবত সংবাদটা পাবার পরে তাঁর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া–শোক আর প্রতিবাদের অভিব্যক্তি। কিন্তু খসরুকে অন্ধ করে দিয়ে তিনি যেমন সন্তুষ্ট বোধ করেন নি তেমনি ব্যাপারটা নিয়ে তার ভিতরে কোনো ধরনের আক্ষেপও নেই। ষড়যন্ত্র দমনে শাস্তি প্রদান করা না হলে, বিশৃঙ্খলার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবে। ‘আমি এখনই যাচ্ছি। ইয়ার মোহাম্মদ আমায় মার্জনা করবেন, সে কথাটা বলেই দ্রুত কক্ষ থেকে বের হয়ে আসে।
