‘হ্যাঁ।
মেহেরুন্নিসা নিজের সাবলীল পা দুটো এক ঝটকায় শয্যার উপর দিয়ে ঘুরিয়ে আনে এবং ঝুঁকে নিজের হলুদ রঙের আলখাল্লাটা তুলে নেয়। জাহাঙ্গীর তার পেছনে এসে দাঁড়ায়। সে স্তনবৃন্তে তার হাতের আর ঘাড়ের কাছে তার ঠোঁটের উপস্থিতি অনুভব করে। সে তারপরে তাকে এক ঝটকায় তুলে নেয় এবং তাকে ঘুরিয়ে নিয়ে তার মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য করে।
‘তুমি কিছুই বুঝতে পার নি, সে বলে, আর আমি নিজেও ঠিক নিশ্চিত নই যে আমিও পুরোপুরি বুঝেছি…’
‘জাহাপনা?’
‘গত রাতে তোমায় এখানে ডেকে পাঠানোটা কিন্তু আমার খেয়াল ছিল না। কাবুলে তোমায় প্রথম দেখার মুহূর্ত থেকেই আমি তোমায় কামনা করেছি এবং তোমায় নিয়ে আমার ভাবনা কখনও থেমে থাকেনি। আমি যখন জানতে পারলাম আমার বিরুদ্ধে একটা ষড়যন্ত্রে তোমার পরিবারকে মিথ্যা জড়ানো হয়েছে আমি তখন ভয় পেয়েছিলাম ঘটনাটা হয়তো চিরতরে তোমায় আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেবে। একজন সম্রাট কখনও অসন্তোষ… রাজবৈরীতাকে প্রশ্রয় দিতে পারে না, উচিত নয়। তাঁর শক্তিশালী চোয়াল দৃঢ়ভাবে চেপে বসে। তুমি যখন আমার সাথে দেখা করার অনুমতির জন্য রীতিমত অনুনয় করেছিলে তখনও আমি জানতাম না তুমি আসলে ঠিক কি অনুরোধ করবে। গিয়াস বেগের ব্যাপারটা খুব একটা জটিল ছিল না। আমি তোমায় তখনই বলেছিলাম আমি ততক্ষণে বিশ্বাস করেছি যে তিনি নির্দোষ। সে যাই হোক, তুমি সাহসিকতার সাথে তাঁর পক্ষাবলম্বন করেছিলে যখন তুমি জানতে যে আমি তাকে ইতিমধ্যে দোষী সাব্যস্ত করেছি। কিন্তু তোমার ভাই মীর খানের বিষয়ে তোমার আচরণ আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল। আমি জানি পরিবারের ভিতরে একজন বিশ্বাসঘাতক থাকলে নিজের কাছে কেমন লাগে…’ তিনি কথাটা শেষ না করে খানিকটা নির্দয় ভঙ্গিতে হাসেন, ‘আমি জানি পরিবারের প্রতি ভালোবাসার টান প্রশমিত করাটা কত কঠিন। সেটা করবার মত সামর্থ্য তোমার রয়েছে–আমি তোমার ভাইয়ের প্রাণদণ্ড কার্যকর করছি তুমি প্রত্যক্ষ করেছে যাতে করে তোমার পরিবারের বাকি সমস্যরা বাঁচবার একটা সুযোগ পায়।
তিনি তাঁর থুতনি উপরের দিকে কাত করে তার মুখের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকালে মেহেরুন্নিসার চোখের কোণে কান্নার রেশ জমতে শুরু করে।
‘আমার দাদাজান হুমায়ুন নিজের জীবনসঙ্গিনী হামিদার মাঝে আত্মার আত্মীয়কে খুঁজে পেয়েছিলেন। আমার মনে হয় আমি তোমার মাঝেই যাকে খুঁজছি পেয়েছি। আমি তোমায় আমার সম্রাজ্ঞী করতে চাই এবং আমার সব স্ত্রীদের প্রধান। আমার বিরুদ্ধে নিজ পুত্রের বিদ্রোহ দমন করা শেষ হলেই আমরা বিয়ে করবো_যদি তুমি আমায় গ্রহণ করতে সম্মত হও।
‘আমি অন্য কারো কথা চিন্তাই করতে পারি না। সে টের পায় তিনি পরম মমতায় তাঁর অশ্রু মুছিয়ে দিচ্ছেন।
কিন্তু আমি তোমায় আরো একটা কথা বলতে চাই। আমি যদি কথাটা না বলি তাহলে আমি নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাব। তোমার স্বামী শের আফগানকে আমার নির্দেশেই হত্যা করা হয়েছিল। আমিই আগ্রা থেকে গৌড়ে একজন আততায়ী প্রেরণ করেছিলাম তাকে হত্যা করতে।’
মেহেরুন্নিসা চমকে উঠে, সে আরো একবার সেই ধুসর নীল চোখ দুটো নিজের মানস পটে ভেসে উঠতে দেখে। খুনী কি একজন ফিরিঙ্গি ছিল?
‘হা। তার নাম বার্থোলোমিউ হকিন্স। সে এখন আমার দেহরক্ষীদের একজন। আমি তাকে হত্যা করার পরেই কেবল জানতে পেরেছি যে তোমার স্বামী অসংখ্য অপরাধে অপরাধী ছিল–উৎকোচ গ্রহণ, নিষ্ঠুরতা, হুমকি প্রদর্শন করে অর্থ আদায়–কিন্তু তাকে হত্যা করার সময়ে আমি এসব কিছুই জানতাম না। আমি তাকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলাম কারণ সে আমার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। মেহেরুন্নিসা… তুমি কি পারবে আমায় ক্ষমা করতে?
মেহেরুন্নিসা তাঁর আঙুলের অগ্রভাগ জাহাঙ্গীরের ঠোঁটে পরম আবেগে স্থাপন করে। কোনো কিছু বলার কোনো দরকার নেই আর আমার ক্ষমা করার প্রশ্নই উঠে না। আমি শের আফগানকে ঘৃণা করতাম। সে আমার সাথে ভীষণ নিষ্ঠুর আচরণ করতো। আমি তার হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছি বলে আমি কৃতজ্ঞ।
‘তাহলে আমাদের মিলনের মাঝে আর কোনো বাঁধাই রইল না। জাহাঙ্গীর মাথা নুইয়ে এনে মেহেরুন্নিসাকে লম্বা আর আবেগঘন একটা চুম্বন দেয়।
*
পরিচারকের দল তাঁর ব্যক্তিগত দর্শনার্থী কক্ষে তাঁর প্রবেশের জন্য প্রবেশ পথের পর্দা দুপাশে সরিয়ে ধরতে, জাহাঙ্গীর ইয়ার মোহাম্মদের চওড়া কাঠামোটা দেখতে পায়, তাঁর সদ্য নিযুক্ত গোয়ালিওরের শাসনকর্তা। ইয়ার মোহাম্মদ, জাহাঙ্গীরকে দেখা মাত্র, মধ্য এশিয়ায় অবস্থিত নিজ মাতৃভূমিতে প্রচলিত অভিবাদন জানাবার ঐতিহ্যবাহী রীতি অনুসারে নিজেকে সামনের দিকে নিক্ষেপ করে, শ্ৰদ্ধাপ্রকাশের জন্য হাত শরীরের দু’পাশে প্রসারিত করে অধোমুখে মাটিতে প্রণত হয়।
‘ইয়ার মোহাম্মদ, ওঠো। আমার বিরুদ্ধে আমার বিশ্বাসঘাতক ছেলের সাথে মিলিত হয়ে যারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল তুমি কি তাদের হাত থেকে পৃথিবীকে মুক্তি দিয়েছো?
‘জাঁহাপনা, আমি বিশ্বাস করি, আমি তাঁদের সবাইকে সনাক্ত করতে আর তাদের সবার সাথে হিসাব চূড়ান্ত করতে সক্ষম হয়েছি। আপনার আদেশ অনুসারে, যারা অপরাধ স্বীকার করেছিল জল্লাদের তরবারির নিচে আমি তাদের দ্রুত আর সহজ মৃত্যু দান করেছি। সাদ আজিজ নামে একজনই কেবল তপ্ত লাল লোহার দ্বারা নির্যাতন করার পরেও নিজের দোষ স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিল। আমার মনে হয় তার ধারণা ছিল সে চালাকি করে আমাদের পরাস্ত করতে এবং বিচার এড়িয়ে যেতে পারবে কিন্তু অন্য একজন ষড়যন্ত্রকারীকে যখন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন সে সাদ আজিজের লেখা একটা চিঠি আমাকে দেখিয়েছিল– আমার মনে হয় মৃত্যুর পূর্বে সে নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকতে চেয়েছে। সাদ আজিজ সেই চিঠিতে যুবরাজ খসরুকে সমর্থন করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। আমি যখন চিঠিটা নিয়ে তার মুখোমুখি হয় সে ঔদ্ধত্যের চরমে পৌঁছে দাবি করে যে চিঠিটা জাল।
