‘সোনা অপেক্ষা করো, সে ফিসফিস করে মেহেরুন্নিসার কানে কানে বলে। সে তাকে বিছানার কাছে নিয়ে এসে তাকে সেখানে শুইয়ে দিয়ে আপাতনের ছন্দপতন না ঘটিয়ে তার উপরে টানটান হয়ে শুয়ে পড়ে। তাঁর মুখ এখন তাঁর ডান স্তনবৃন্তে, তাঁর জীহ্বা সেটাকে উত্তেজিত করে আর তাঁর দাঁত এর চারপাশের নরম জায়গাগুলো ঠোকরাতে থাকে। তাদের দুজনের শ্বাসপ্রশ্বাসের বেশ জোরালো হয়। সে টের পায় জাহাঙ্গীরের পিঠ টানটান হয়ে উঠেছে। সে শীর্ষানুভূতির চূড়ায় পৌঁছে গিয়েছে কিন্তু কোনমতে নিজেকে প্রশমিত করে, অপেক্ষা করে সঙ্গীর সহচর্যের। সে শেষ একটা প্রবল অভিঘাতে মেহেরুন্নিসাকেও সেখানে উঠিয়ে আনে। মেহেরুন্নিসা তাঁদের দুজনের সম্মিলিত শীৎকারের শব্দ শুনতে পায় যখন তাঁর ঘামে ভেজা দেহটা ভগ্নস্তূপের মত তার উপরে নেমে আসে আর তারা দুজন পরস্পরকে জড়িয়ে শুয়ে থাকে, হৃৎপিণ্ডে ঝড়ের মাতম। তাকে আপুত করে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়া অনুভূতি ধীরে ধীরে প্রশমিত হতে শুরু করতে সে নিজের আরুক্তম মুখ দিয়ে তার বুকে ঘষতে থাকলে জাহাঙ্গীরের আঙুল তার লম্বা চুল নিয়ে খেলতে থাকে।
*
মেহেরুন্নিসা ছয় ঘন্টা পরে নিদ্রালু ভঙ্গিতে তার চোখের পাতা মেলে এবং আধ-খোলা গবাক্ষ দিয়ে ভোরের ধুসর আলো বর্শার মত নেমে আসতে দেখে। সে সেই সাথে আরও দেখে কেন তাঁর নিদ্রাভঙ্গ হয়েছে। আশা তাঁর শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মেহেরুন্নিসা এস্ত ভঙ্গিতে নিজের নগ্ন দেহ রেশমের চাদরের একপাশ টেনে নিয়ে ঢাকতে চেষ্টা করে।
‘জাহাপনা,’ আশা পিঠের উপর ভর দিয়ে, একহাত বুকের উপরে রাখা আর অন্যহাত নিজের মাথার উপর প্রসারিত করে, তখনও গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন জাহাঙ্গীরের দিতে তাকিয়ে কথাটা বলে। অনুগ্রহ করে উঠেন, জাহাঙ্গীর চোখ খুলে তাকায়। জাহাপনা, ঝরোকা বারান্দায় আপনার উপস্থিতির সময় হয়েছে।’
জাহাঙ্গীর সাথে সাথে শয্যা থেকে উঠে পড়ে এবং আশা ইতিমধ্যে তার জন্য নিজের হাতে যে রেশমের আলখাল্লাটা ধরে রয়েছে সেটার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। সে মাথা নিচু করে তাকে সুযোগ করে দেয় রেশমের একটা সবুজ পাগড়ি মাথায় পরিয়ে দিতে যেটায় লম্বা একটা সারসের পালক হীরক খচিত ব্রোচ দিয়ে আটকানো রয়েছে। তারপরে, তার দিকে আশার বাড়িয়ে রাখা ব্রোঞ্জের আয়নায় নিজের উপস্থিতি দ্রুত একবার পর্যবেক্ষণ করে, সে রেশমের উড়তে থাকা সবুজ পর্দা সরিয়ে বাইরে অবস্থিত ঝরোকা-ই-দর্শনের, উপস্থিতির বারান্দা যেখান থেকে দিকে যমুনা নদী দেখা যায় সেদিকে, এগিয়ে যায়।
মেহেরুন্নিসা শয্যা ত্যাগ করে, কক্ষের ভিতর দিয়ে নগ্নভাবেই নেমে এসে পর্দার আড়াল থেকে দেখার জন্য এগিয়ে যায়। জাহাঙ্গীর সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেমনটা সে প্রতিদিন সকালেই করে নিজের লোকদের কাছে প্রমাণ করতে যে মোগল সম্রাট এখনও জীবিত রয়েছেন। তোরণগৃহে রক্ষিত অতিকায় দুষ্টুভি ঢাকের বোলের তালে সে তার হাত উঁচু করে। দূর্গের নিচে নদীর তীরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা জনতার অনুকূল গর্জন শোনার সময় মেহেরুন্নিসাও সেই উত্তেজনায় জারিত হয়। এটাই হল আসল ক্ষমতা যখন একজনের বেঁচে থাকা বা মারা যাওয়া নিয়ে লক্ষ কোটি মানুষ চিন্তিত। দূর্গপ্রাকার থেকে এবার তূর্যধ্বনি ভেসে আসে–সবকিছুই সম্রাটের প্রাত্যহিক কৃত্যানুষ্ঠানের অংশ।
মহান সম্রাট… মেহেরুন্নিসার সহসাই শীত শীত অনুভূত হওয়ায় সে শয্যায় ফিরে আসে এবং তাঁদের দেহের ওমে তখনও উষ্ণ রেশমের চাদরটা দিয়ে নিজের দেহ আবৃত করে। গত রাতে সে মুহূর্তের জন্য ইতস্তত না করে রক্ত মাংসের তৈরি একজন মানুষের কাছে নিজেকে এমন আবেগের সাথে সমর্পিত করেছিল যে সে নিজেই জানতো না তার মাঝে এমন আবেগ রয়েছে। তারা তিনবার দৈহিকভাবে মিলিত হয়েছিল, প্রতিবারই আবেগের প্রচণ্ডতা পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। কিন্তু এখন দিনের আলোয় চারপাশ অভিষিক্ত এবং তাঁর প্রেমিক মোটেই কোনো সাধারণ লোক নয় বরং একজন সম্রাট যার নিজের পছন্দের কোনো শয্যাসঙ্গিনী থাকা খুবই সম্ভব। তিনি কেন তাকে ডেকে পাঠালেন? কাবুলে তাকে প্রথমবার দেখার পর থেকে কাটার মত তাকে বিব্রত করতে থাকা একটা বাসনাকে প্রশমিত করতে? কেবলই কৌতূহল?
তাঁর কি আশা করা উচিত? মাঝে মাঝে সম্রাটের শয্যাসঙ্গিণী হবার নিয়তি মেনে নেয়া? তার উপপত্নীর মর্যাদা লাভ করা? তিনি সম্ভবত বাসনা চরিতার্থ করার পরে তার সম্পর্কে আর আগ্রহ প্রদর্শন করবেন না। তার চেয়ে দশ বছরের ছোট কোনো মেয়েকে তিনি অনায়াসে শয্যাসঙ্গিনী করতে পারেন… আধঘন্টা পরে জাহাঙ্গীর যখন ফিরে আসে তখনও সে এই বিষয়টা নিয়েই আকাশ কুসুম ভেবে চলেছে। তিনি ইতিমধ্যেই গোসল করে নিয়েছেন–তাঁর মুখের চারপাশে ভেজা চুলের কালো গোছ ঝুলে আছে। সে আগেই যেমন লক্ষ্য করেছে তার অভিব্যক্তি আন্দাজ করা খুবই কঠিন।
‘সম্রাট, আমি কি এবার হেরেমে ফিরে যাবো? সে জানতে চায়, রাতের অন্ধকারে যে লোকটার বাহুলগ্না হয়ে তার সম্পূর্ণভাবে নিজেকে যার সমকক্ষ মনে হয়েছে তাঁর কাছ থেকে চলে যাবার আদেশ শোনবার চেয়ে প্রশ্নটা সে ইচ্ছে করে নিজেই করে।
